ETV Bharat / international

বৃষ্টি বা মেঘভাঙা নয়, নেপালে বিধ্বংসী হড়পা বানের কারণ বিশালাকার হিমবাহে ধস; রইল বিশ্লেষণ

বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর হিমবাহ-মাটি-সহ জমাট বাঁধা অংশের তাপমাত্রার পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুত ৷ চোখের নিমেষে গলছে বরফ, যার ফল এই কাদা-মাটির হড়পা বান ৷

Nepal Flash Flood Disaster
কাদা-মাটির হড়পা বানে বিপর্যস্ত নেপাল (ছবি: এপি)
author img

By Nisar Ahmad Dharma

Published : August 28, 2026 at 2:06 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

কাঠমাণ্ডু, 27 অগস্ট: সমুদ্রে সুনামির বিশাল ঢেউ দেখেছে মানুষ ৷ কিন্তু পাহাড় থেকে হুড়মুড়িয়ে নেমে আসা কাদা-মাটির বিধ্বংসী এই স্রোত শেষ কবে দেখা গিয়েছে, মনে করা অত্যন্ত দুষ্কর ৷ বুধবার সকাল 8.30টার সময় নেপাল-তিব্বত সীমান্তে পাহাড় থেকে সমভূমিতে নেমে এল এমনই সুনামি ৷ ভোটেকোশী ও ত্রিশূলি নদীর স্রোতে রসুয়া, নুয়াকোট, ঢাডিং এবং গোর্খায় ভেসে গিয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা ৷

এখনও পর্যন্ত অন্তত 469 জনের মৃত্যু নিশ্চিত জানা গিয়েছে ৷ নিখোঁজ 1 হাজার 300 জনেরও বেশি ৷ মৃত ও নিখোঁজের মধ্যে রয়েছেন ভারতীয়রাও ৷ তাঁদের অনেকেই কৈলাস মানস সরোবর তীর্থে যাচ্ছিলেন ৷ সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে নুয়াকোট এবং রসুয়া জেলায় ৷ চিনের সরকারি সিসিটিভি রিপোর্টে জানিয়েছে, শুধু তিব্বতেই নিখোঁজ 558 জন ৷ তাঁদের মধ্যে অনেকে বিদেশি ৷

নেপালে হুড়মুড়িয়ে নেমে আসছে কাদা-মাটির প্রবল স্রোত (ইটিভি ভারত)

প্রবল বৃষ্টি নয়, মেঘ ভাঙা বৃষ্টিও নয়, তাহলে কাদা-মাটির এই দানবীয় হড়পা বানের নেপথ্যে কারণ কী ? প্রাথমিক তদন্তে নেপাল জানিয়েছে, কাদা-মাটির প্রবল স্রোতের আগে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল ৷ যদিও আমেরিকার জিওলজিক্যাল সার্ভে এই দাবি খারিজ করে দিয়েছে ৷ ইউএসজিএস-এর দাবি, ধসের ফলে উৎপন্ন কম্পন অনুভূত হয়েছে ৷ নিজস্ব ওয়েবসাইটে ইউএসজিএস জানিয়েছে, বিশাল হিমবাহ ধস এবং কাদা-মাটির স্রোতের ফলে যে শক্তি উৎপন্ন হয়েছিল, তাতেই 5.2 কম্পন অনুভূত হয় ৷

মনে করা হচ্ছে, বিশাল আকারের হিমবাহ ধসের কারণে বিপুল জল ও কাদা উৎপন্ন হয়ে লেন্দে খোলা নদী (ভোটেকোশীর উপনদী) দিয়ে হুড়মুড়িয়ে নেমে আসে ৷ এই নদীটি উচ্চ তিব্বত থেকে উৎপন্ন হওয়ার পর দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে নেপালে প্রবেশ করেছে ৷

ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি)-র সদর দফতর নেপালের কাঠমাণ্ডুতে ৷ এই সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল 9টা নাগাদ ভোটেকোশী নদীতে জলস্তর বাড়তে শুরু করে ৷ জল উপচে দু'দিকের পার ভাসিয়ে দেয় ৷ ভোটেকোশীর কাদা-মাটির স্রোত নেমে আসে ত্রিশূলি নদীতে ৷ এর আগে 2015 সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল নেপাল ৷

হিমালয়ের আটটি দেশের আন্তঃসরকারি সংগঠন আইসিআইএমওডি-র বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিক উচ্চতায় কোনও বিশালাকার হিমবাহ থেকেই এই হড়পা বান হয়েছে ৷ বুধবারই আইসিআইএমওডি একটি বিবৃতি জারি করে জানায়, ক্রায়োস্ফিয়ারে দুর্ঘটনার হার বেড়ে চলেছে ৷

Nepal Flash Flood
ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে এক সারমেয় ও সেনা (ছবি: এপি)

হিমবাহ, মাটি-সহ পৃথিবীর হিমায়িত অংশকে ক্রায়োস্ফিয়ার বলা হয় ৷ এই জমাট বেঁধে থাকা অংশে দু'বছর বা তার বেশি সময় ধরে তাপমাত্রা 0 ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নীচে থাকে ৷ এদিকে বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে হিমায়িত অঞ্চলের তাপমাত্রা খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে ৷ এই ঘটনাকে 'ক্রায়োস্ফেরিক হ্যাজার্ড' বলা হয় ৷ বুধবারের বিপর্যয় এরকমই একটি ঘটনা ৷ উষ্ণায়নের ফলে হিমালয়ের বিভিন্ন অংশে 'ক্রায়োস্ফেরিক হ্যাজার্ড' ঘটছে এবং হিমবাহের কাঠামো ভেঙে পড়ছে ৷ যে বিশাল হিমবাহ-পাথর পর্বতগুলিকে ধরে রাখে, সেগুলিই গলে যাচ্ছে ৷ কোনও কিছু বোঝার আগে বা সতর্কতা জারির সময়টুকুও দিচ্ছে না ৷

আইসিআইএমওডি-র সিনিয়র ক্রায়োস্ফিয়ার বিশেষজ্ঞ মহম্মদ ফারুক আজম বলেন, "'ক্রায়োস্ফেরিক হ্যাজার্ড'-এর মতো ঘটনা ঘনঘন ঘটছে, যা আগে কখনও হয়নি ৷" লেন্দে খোলার বিপর্যয় নিয়ে তিনি বলেন, "এর মোকাবিলায় আরও জোরালো আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজন ৷"

কানাডার কালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওমর্ফোলজি'র অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ড্যানিয়ের শুগার জানান, একটি হিমবাহ 5 হাজার 200 মিটার উঁচু পাহাড় থেকে গড়িয়ে নীচে পড়ার কারণে এই হড়পা বান হয়েছে ৷ তিনি বলেন, "গতকাল এবং আজকের স্যাটেলাইটে তোলা ছবি মিলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে, গত 24 ঘণ্টায় হিমবাহের বরফ কতটা গলে গিয়েছে ৷ আমার অনুমান, বরফ এবং তার সঙ্গে হিমবাহও গলে গিয়েছে ৷ এর ফলে বিপুল পরিমাণে জল উৎপন্ন হয়ে নীচে নেমে এসেছে ৷"

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পাওয়া ভিডিয়ো ফুটেজ ও তথ্যের উপর ভিত্তি করে আইসিআইএমওডি প্রাথমিক পর্যালোচনায় জানিয়েছে, বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথরের ধ্বংসাবশেষ লেন্ডে খোলা নদীতে এসে পড়েছিল ৷

সংস্থার বিশ্লেষণ, “জলবিজ্ঞান (হাইড্রোলজিক্যাল) সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণগুলি বন্যার ঢেউয়ের অস্বাভাবিক গতি ও তীব্রতার ইঙ্গিত দিয়েছে ৷ জানা গিয়েছে, গালছি (Galchchi) এলাকায় ত্রিশূলী নদীর জলের স্তর মাত্র 30 মিনিটের মধ্যে ন'মিটার পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল ৷ একই সময়ে মালেখু (Malekhu) এলাকায় জলের স্তর সাত মিটার বৃদ্ধি পায় ৷”

বিশেষজ্ঞরা খতিয়ে দেখছেন, নদীর কোনও সংকীর্ণ অংশে ধ্বংসাবশেষের কারণে সাময়িকভাবে কোনও প্রতিবন্ধকতা বা ‘ল্যান্ডস্লাইড ড্যাম’ (ভূমিধসজনিত বাঁধ) তৈরি হয়েছিল কি না ৷ এই ধরনের প্রতিবন্ধকতা বা বাঁধের কারণে আটকে থাকা জল হঠাৎ ছাড়া হলে তা থেকে পরবর্তী কোনও বিপদ তৈরি হতে পারে ৷

আইসিআইএমওডি-র জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান কিয়াংগং ঝাং (Qianggong Zhang) বলেন, "গত বছর রাসুয়া (Rasuwa) এলাকায় যে জায়গাটি বন্যায় বিধ্বস্ত হয়েছিল, সেটি আবারও ঝুঁকির মুখে পড়েছে ৷”

আইসিআইএমওডি তাদের বিবৃতিতে জানায়, “মনে করা হচ্ছে, লেন্দে খোলা এলাকায় বরফের ধস (ice avalanche) থেকেই এই ঘটনার সূত্রপাত, তবে, এর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি ৷ নেপাল-চিন সীমান্তের উজানে এখনও একটি প্রতিবন্ধকতা বা বাঁধ আটকে থাকায় কর্তৃপক্ষ দ্বিতীয় দফার বন্যার আশঙ্কা করছে এবং জিলং (Jilong) বন্দর এলাকা খালি করার নির্দেশ জারি করা হয়েছে ৷”

নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ডিজাস্টার স্টাডিজ’-এর পরিচালক বসন্ত রাজ অধিকারী বলেন, "হিমালয় অঞ্চলে নানাবিধ ঝুঁকির (multi-hazard risks) মাত্রা বেড়ে চলেছে এবং লেন্দে খোলার ঘটনাটি তার একটি উদাহরণ ৷"

তিনি বলেন, “নদীর ভাটির দিকের জনবসতিগুলির ক্ষেত্রে ঝুঁকির ধরন ও মাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন হচ্ছে ৷ যেহেতু এই জনবসতিগুলিই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে, তাই স্থানীয় প্রশাসনের কাছে তাৎক্ষণিক বা ‘রিয়েল-টাইম’ ঝুঁকির তথ্য পৌঁছানো এবং তার উপর ভিত্তি করে জীবন রক্ষাকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি ৷"