আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই - ধর্মীয় নেতা থেকে ইরানের শেষ কথা
নানা সংগ্রাম এবং ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে অবশেষে রানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হয়ে উঠেছিলেন খামেনেই ৷

Published : March 1, 2026 at 11:12 AM IST
তেহরান, 1 মার্চ : আমেরিকা বা ইজরায়েলের সামরিক হানায় তাঁর জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে ৷ সে কথা অনেক আগেই বুঝেছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই ৷ আশঙ্কা যাতে কখনও দিনের আলো না দেখে তা নিশ্চিত করতে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়েছিলেন ৷
বিশেষ করে ইরানকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন ৷ সেই আশা পূরণ হয়নি তাঁর ৷ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সৌজন্য শেষরক্ষা করতে পারলেন না ৷ তেহরানে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক হানায় প্রাণ হারালেন সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের 'শেষ কথা' খামেনেই ৷

ইসলাম ধর্মের সামান্য একজন ধর্মীয় নেতা হিসেবে জীবন শুরু করা খামেনেইয়ের পক্ষে ক্ষমতার শীর্ষে ওঠা মোটেই সহজ কথা ছিল না ৷ প্রথম দিকে নানা সংগ্রাম এবং ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে গিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে অবশেষে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হয়ে উঠেছিলেন ৷
দশকের পর দশক ক্ষমতায় থাকাকালীন দেশের নাগরিকদের উপর একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন তিনি ৷ দেশের আর্থিক প্রগতির সুফলও সকলে সমানভাবে উপভোগ করতে পারছিলেন না ৷ বাড়ছিল দুর্নীতি ৷ আর তার সুবাদে তেহরানের প্রাসাদোপম অট্টালিকায় থাকা খামেনেই বুঝতে পারেননি পায়ের তলার মাটি সরছিল একটু একটু করে ৷
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের কয়েকদিন আগে থেকে ইরানে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয় ৷ মূল্যবৃদ্ধিতে নাজেহাল সাধারণ মানুষ সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার সমালোচনা করতেও পিছপা হননি ৷ খামেনেই অশনি সংকেত বুঝতে পেরেছিলেন ৷ যেনতেন প্রকারেণ ঠেকাতেও চেয়েছিলেন ৷ রাষ্ট্রযন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে পুলিশ ও সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে পরিস্থিতি শান্ত করতে চেয়েছিলেন ৷ নিরস্ত্র করতে চেয়েছিলেন আন্দোলনকারীদের ৷ গায়ের জোর আন্দোলন দমন করার সিদ্ধান্ত নেন ৷ দায়িত্ব নেন পুলিশ ও সামরিক বাহিনীকে ৷ তাঁর আমলে রাষ্ট্র নিজের নাগরিকদের সঙ্গে এত নির্মম ব্যবহার আগে কখনও করেনি ৷ তবে আন্দোলন দমানো যায়নি ৷

সংঘাতের এমনই আবহে ইজরায়েল ও আমেরিকা হানা দেয় ইরানে ৷ স্বাগত জানিয়ে খামেনেইয়ের মৃত্যু কামনা ইরানের নাগরিকদের একটা বড় অংশ ৷ গত কয়েকদিন ধরে দেশের প্রায় সর্বত্র খামেনেই মৃত্যু চেয়ে পথে নেমেছিল জনতা ৷ এবার সেটাই হল ৷ সংবাদসংস্থা এপির সঙ্গে কথা বলেছেন তেহরানের কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা ৷ তাঁদের বেশিরভাগই প্রকাশ্যে দাবি করেছেন খামেনেইয়ের মৃত্যু তাঁদের স্বস্তি দিয়েছে ৷ তবে পতনের শুরুটা হয়েছিল আরও বেশ কিছুদিন আগে থেকে ৷ গতবছরও ইরানে যৌথ হামলা চালিয়েছিল আমেরিকা এবং ইজরায়েল ৷ তাতে ব্যাপক ধাক্কা খায় ইরানের পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে ওঠার স্বপ্ন ৷ এরপর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ইরান ৷
শুরুর সেদিন
1989 সালে প্রথমবার ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতা হাতে আসে খামেনির ৷ তার আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন এক সামান্য ধর্মীয় নেতা ৷ স্বভাবতই দেশের সমস্ত অংশের মানুষের মধ্যে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে তাঁকে সমস্য়ার মুখে পড়তে হয় ৷ তাঁর আগে ক্ষমতা ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহউল্লা খামেনেই ৷ দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে তিনি নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে পেরেছিলেন ৷ সেই জায়গায় যেতে অনেকটাই সময় লেগে যায় খামেনেইয়ের ৷

নিজের কর্মকালে মৌলবিদের কাজের পরিধি অনেকটা বাড়িয়েছিলেন ৷ অসামরিক সরকার এবং সামরিক প্রশাসন মৌলবিদের কাজে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে সেটাও নতুন করে ঠিক করেন খামেনেই ৷ তাছাড়া সমস্ত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকে নিয়ে এসেছিলেন ৷ এসব দেখে অনেকেই মনে করেন এক ঈশ্বর ছাড়া তাঁর চেয়ে অধিক শক্তিধর আরও কারও অস্তিত্ব নেই ৷ ইরানের এলিট সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ডও তাঁর আমলেই তৈরি ৷

অভ্যন্তরীণ সমস্য়া ও ঘরোয়া সমীকরণ
খামেনেই সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে কাজ শুরু করার মাত্র কয়েকদিন পর এক সামাজিক আন্দোলন শুরু হয় ইরানে ৷ আন্দোলনকারীদের দাবি, নির্বাচিত সরকারের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা দিতে হবে ৷ এই দাবিকে সামনে রেখে সংসদীয় নির্বাচন হয় ৷ জয় পান আন্দোলনকারীরা ৷ পরের ধাক্কাটা আসে 2009 সালে ৷ অভিযোগ ওঠে খামেনেই ঘণিষ্ঠরা নির্বাচনে ব্যাপর কারচুপি করেছে ৷ এরপর 2017 সাল এবং 2022 সালেও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্নে ইরানে আন্দোলন শুর হয় ৷ প্রতিবারই গায়ের জোরে আন্দোলন দমন করেছিলেন ৷ এবার আর শেষরক্ষা হল না ৷

