নেপালের উদ্ধারকাজে নতুন শঙ্কা, ফের বৃষ্টির ভ্রুকুটি ! মৃত 650 ছাড়াল, নিখোঁজ 2400
এই পরিস্থিতিতে সরকার দেশজুড়ে 'হাই অ্যালার্ট' জারি রেখেছে । নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে ।

By PTI
Published : August 29, 2026 at 7:59 PM IST
কাঠমান্ডু, 29 অগস্ট: চারদিন আগের ভয়াবহ হড়পা বান ও ধসের ধাক্কা এখনও সামলে উঠতে পারেনি নেপাল । ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনও নিখোঁজদের খোঁজ চলছে । নদীর তীর, ভেঙে পড়া রাস্তা, ধসে যাওয়া বসতি- সর্বত্র চলছে তল্লাশি । এরই মধ্যে ফের বৃষ্টি এবং বজ্রবিদ্যুতের পূর্বাভাসে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে । আবহাওয়া দফতরের সতর্কতা, পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টি হলে শুধু উদ্ধারকাজই ব্যাহত হবে না, নদীর জলস্তর বেড়ে গিয়ে নতুন করে হড়পা বান বা বন্যার পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে । শনিবার পর্যন্ত বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা 650 ছাড়িয়েছে, নিখোঁজ রয়েছেন 2400 জনের বেশি ৷ ফলে স্বজনহারাদের উৎকণ্ঠার মধ্যেই আরও এক দফা দুর্যোগের আশঙ্কা নেপাল জুড়ে ।
বুধবার নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় আচমকাই নেমে এসেছিল জল, কাদা, পাথর এবং ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত । কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় একের পর এক জনপদের ছবি । ঘরবাড়ি ভেসে যায়, রাস্তাঘাট নিশ্চিহ্ন হয়, সেতু ভেঙে পড়ে । বহু গাড়ি তলিয়ে যায় কাদার নীচে । ক্ষতিগ্রস্ত হয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও । কোশি নদী-সহ একাধিক নদীতে জলস্ফীতির জেরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে ।
বিপর্যয়ের পর থেকেই নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছে নেপাল সেনা, পুলিশ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যেরা । 15 হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী উদ্ধার ও ত্রাণকাজে নামানো হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর । কোথাও ভারী যন্ত্র দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানো হচ্ছে, কোথাও নদীর তীরে চলছে তল্লাশি । দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় স্থলপথে পৌঁছনো সম্ভব না হওয়ায় হেলিকপ্টারের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে । কিন্তু উদ্ধারকারীদের সামনে এখন নতুন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আবহাওয়া ।
নেপালের আবহাওয়া দফতর শনিবার জানিয়েছে, দেশের বেশ কিছু পাহাড়ি ও পার্বত্য এলাকায় নতুন করে বৃষ্টি হতে পারে । কোশি, বাগমতী এবং গান্ডাকি প্রদেশের পাহাড়ি ও পার্বত্য অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে । কার্নালির পাহাড়ি এলাকা এবং লুম্বিনী ও সুদূর পশ্চিম প্রদেশের তরাই অঞ্চলেও বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে । কোথাও কোথাও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি হতে পারে । পার্বত্য অঞ্চলের কিছু জায়গায় তুষারপাতের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর ।
বিশেষ নজরে রয়েছে রসুয়া জেলার কোশি এলাকা । আবহাওয়াবিদ হরি প্রসাদ দাহাল জানিয়েছেন, শনিবার ওই এলাকায় অধিকাংশ জায়গায় মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে । দু'একটি জায়গায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে । ফলে ইতিমধ্যেই বিপর্যস্ত এলাকায় নতুন করে নদীর জল বাড়লে উদ্ধারকাজে সমস্যা তৈরি হতে পারে । ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তল্লাশি চালানো দলগুলির জন্য পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা ।
প্রশাসনের উদ্বেগের আর একটি কারণ কোশি নদীর জলস্তর । উদ্ধারকাজ চলার মধ্যেই নদীতে জল বাড়তে শুরু করায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে । নদীর গতিপথের আশপাশে থাকা দুর্গত এলাকা এবং উদ্ধারকারী দলগুলিকে সতর্ক রাখা হয়েছে ।
এর সঙ্গে জুড়েছে চিন সীমান্তের আর একটি উদ্বেগ । নদীর উৎসের কাছাকাছি তিব্বত এলাকায় নতুন একটি 'ব্যারিয়ার লেক' বা প্রাকৃতিক জলাধার তৈরি হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে । পাহাড় ধসে নদীর জল আটকে গেলে এ ধরনের জলাধার তৈরি হয় । সেই জলাধারের বাঁধ ভেঙে গেলে আচমকা বিপুল পরিমাণ জল নীচের দিকে নেমে আসতে পারে । সে ক্ষেত্রে নেপালের নদী অববাহিকায় নতুন করে বিপদের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে ।
চিনা কর্তৃপক্ষও পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে । নতুন জলাধারটির জলস্তর এবং আয়তনের উপর নজরদারি চালানো হচ্ছে । তা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা নিয়ে সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে । ফলে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং নদীর জলস্তর, দু'দিকই এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নেপালের প্রশাসনের কাছে ।
এই পরিস্থিতিতে সরকার দেশ জুড়ে 'হাই অ্যালার্ট' জারি রেখেছে । নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে । উদ্ধার ও ত্রাণকাজ যাতে কোনও ভাবেই বন্ধ না হয়, সেই চেষ্টা চালানো হচ্ছে । তবে আবহাওয়ার পরিস্থিতির উপর নির্ভর করেই দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযানের গতি ঠিক করতে হবে ।
ইতিমধ্যেই বহু মানুষকে দুর্গত এলাকা থেকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে । জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ এবং অন্যান্য বিপজ্জনক এলাকা থেকেও শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্ধারের কাজ চলছে । কিন্তু বিপুল সংখ্যক মানুষ এখনও নিখোঁজ । তাঁদের পরিবারের কাছে প্রতিটি ঘণ্টা যেন অনন্ত অপেক্ষা ।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা, ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা মানুষদের সন্ধান পাওয়ার সময় যত গড়াবে, তাঁদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনাও কমবে । সেই কারণেই আবহাওয়ার প্রতিটি পূর্বাভাস এখন উদ্ধারকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ।
একদিকে কাদা সরিয়ে প্রিয়জনের সন্ধান, অন্যদিকে মাথার উপর ফের কালো মেঘ । নদীর জল বাড়ার আশঙ্কা, পাহাড়ি এলাকায় নতুন বৃষ্টির পূর্বাভাস এবং সীমান্তের কাছে তৈরি হওয়া জলাধার- সব মিলিয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের পরেও নেপালের সামনে বিপদ কাটছে না । একটি দুর্যোগের ধ্বংসস্তূপ সরানোর আগেই প্রকৃতি যেন আরও একটি পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে হিমালয়ের দেশটিকে ।

