ETV Bharat / health

শিশুর কিডনিতে পাথর ! কোন কোন লক্ষণ দেখে বুঝবেন ?

শিশুদের কিডনিতে পাথর হলে কী কী লক্ষণ দেখা দেয়? বিশেষজ্ঞরা কী কী সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন, তার সম্পূর্ণ তথ্য রইল এই প্রতিবেদনে ৷

kidney stones in children
শিশুদের কিডনিতে পাথর থাকলে শরীরে লক্ষণগুলো জেনে নিন (ছবি সূত্র- গেটি ইমেজেস)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : August 3, 2026 at 11:55 AM IST

|

Updated : August 4, 2026 at 1:07 PM IST

6 Min Read
Choose ETV Bharat

বর্তমানে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক, উভয়ই কিডনিতে পাথর বা পাথরজনিত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে । জন্মগত ত্রুটি, বংশগত কারণ, পরিবর্তনশীল জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, ভিটামিনের ঘাটতি এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে । যদিও শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে কিডনির পাথর মূলত একই ধরনের হয়, তবুও বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে শিশুদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা চিহ করা কিছুটা কঠিন হতে পারে । তাঁদের মতে, শিশুরা বেশিরভাগ সময় ব্যথার সঠিক অবস্থান ও কারণ বর্ণনা করতে পারে না । তাহলে, শিশুদের ক্ষেত্রে কিডনিতে পাথর হওয়ার লক্ষণগুলো কী এবং এর ফলে কী কী জটিলতা দেখা দিতে পারে? আসুন জেনে নেওয়া যাক ৷

শিশুদের কিডনিতে পাথরের লক্ষণসমূহ

  • পিঠ, তলপেট বা কোমরের কাছে তীব্র ব্যথা
  • প্রস্রাবে গোলাপি, লাল বা বাদামি রঙের রক্ত ​​থাকা (যাকে হেমাচুরিয়াও বলা হয়)
  • ঘন ঘন প্রস্রাব পাওয়া
  • প্রস্রাবের সময় ব্যথা
  • প্রস্রাব করতে না পারা বা খুব সামান্য পরিমাণে প্রস্রাব হওয়া
  • ঘোলাটে বা দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব হওয়া
  • খিটখিটে মেজাজ, বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে

ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশনের মতে, এই লক্ষণগুলির কোনোটি দেখা দিলে শিশুটিকে অবিলম্বে একজন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত । কিডনিতে পাথর বা অন্য কোনও গুরুতর শারীরিক সমস্যার কারণে এই লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে । কিডনিতে পাথরের কারণে সৃষ্ট ব্যথা স্বল্প বা দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হতে পারে, কিংবা তা মাঝে মাঝে হতে পারে । ব্যথার পাশাপাশি শিশুটির আরও কিছু সমস্যাও দেখা দিতে পারে ৷

  • বমি বমি ভাব
  • বমি
  • অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে রয়েছে
  • জ্বর
  • ঠান্ডা লাগছে

শারীরিক জটিলতা: বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনিতে পাথর থাকার ফলে অন্যান্য জটিলতাও দেখা দিতে পারে । 'মেডলাইন প্লাস' (Medline Plus)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই পাথর মূত্রনালিতে বা মূত্রপথে বাধার সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে প্রস্রাব উল্টো দিকে প্রবাহিত হতে পারে এবং 'হাইড্রোনফ্রোসিস' বা কিডনি ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে । এই অবস্থা শেষ পর্যন্ত কিডনির ক্ষতি করতে পারে ।

বিশেষজ্ঞরা আরও জানান যে, মূত্রথলিতে দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্রাব জমে থাকলে 'সিস্টাইটিস' (এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ) হতে পারে । এছাড়া, মূত্রনালি সরু হয়ে যাওয়ার ফলে শরীরের অন্যান্য অঙ্গের সঙ্গে সংযোগকারী 'ফিস্টুলা' (fistula) বা অস্বাভাবিক নালি তৈরি হতে পারে বলেও তাঁরা উল্লেখ করেন ।

কিডনিতে পাথর হওয়ার কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন কারণে কিডনিতে পাথর হতে পারে ৷ যেমন-জন্মগত কিডনির সমস্যা, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাস এবং ভিটামিনের ঘাটতি । আরও জানুন ৷

  • জিনগত: বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে জিনগত কারণে প্রস্রাবে সিস্টিনের মাত্রা বেড়ে যায়, যার ফলে পাথর তৈরি হতে পারে ।
  • প্রস্রাব আটকে রাখা: বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘক্ষণ টিভি দেখা, মোবাইল ফোন ব্যবহার বা গেম খেলার সময় অনেকে দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখে । এভাবে প্রস্রাব আটকে রাখার ফলে সংক্রমণ হতে পারে । চিকিৎসকরা আরও সতর্ক করেন যে, এই অভ্যাসের কারণে শরীরে লবণ জমা হতে পারে । এই দুটি বিষয়ই কিডনিতে পাথর তৈরির কারণ হতে পারে ।
  • শরীরে জলের ঘাটতি: শিশুরা প্রায়শই নিজেদের কাজে এতটাই মগ্ন থাকে যে তারা জল পান করার কথা ভুলে যায় । এর ফলে শরীরে জেলর ঘাটতি দেখা দিতে পারে এবং প্রস্রাব ঘন হয়ে যেতে পারে, যা কিডনিতে পাথর তৈরির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় ।
  • ইউরিক অ্যাসিড বৃদ্ধি: বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণিজ প্রোটিন-বিশেষ করে রেড মিট (লাল মাংস), অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাংস (যেমন কলিজা বা কিডনি) এবং সামুদ্রিক খাবার-পিউরিন-সমৃদ্ধ । এই উপাদানটি ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং প্রস্রাবকে অধিক অম্লীয় করে তোলে । এমন অম্লীয় পরিবেশে ইউরিক অ্যাসিড দ্রবীভূত হতে পারে না ৷ বরং তা কেলাসিত হয়ে বেদনাদায়ক পাথর তৈরি করতে পারে ।
  • অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ: বর্তমানে জাঙ্ক ফুড বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোতে প্রায়শই আচার খাওয়া হয়ে থাকে । বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলোতে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রায় সোডিয়াম (লবণ) থাকে । সোডিয়াম প্রস্রাবে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা কিডনিতে পাথর তৈরির কারণ হতে পারে ।
  • মূত্রনালির সংকোচন: বিশেষজ্ঞদের মতে, কারও কারও ক্ষেত্রে জন্মগতভাবেই মূত্রনালি সরু হয়ে থাকে । আবার অনেকের ক্ষেত্রে কিডনি ও মূত্রনালির সংযোগস্থলে কোনও প্রতিবন্ধকতা বা বাধা সৃষ্টি হতে পারে । এর ফলে প্রস্রাবের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রস্রাব জমতে থাকে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় ৷ এর ফলে কিডনিতে পাথরও তৈরি হতে পারে ।
  • স্থূলতা: বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থূলতা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের কারণ হয়ে দাঁড়ায় । এছাড়া এটি প্রস্রাবে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় ।
  • ওষুধপত্র: পূর্ববর্তী কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে গ্লুকোকর্টিকয়েড, অ্যান্টাসিড এবং অ্যাসিটাজোলামাইডের মতো ওষুধগুলোও কিডনিতে পাথর তৈরির কারণ হতে পারে । এ-ও লক্ষ্য করা গিয়েছে যে, মৃগী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় অতিরিক্ত মাত্রায় ওষুধ সেবন করে থাকেন ।
  • মেরুদণ্ড-সংক্রান্ত সমস্যা: বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের যদি জন্মগতভাবে মেরুদণ্ড-সংক্রান্ত কোনও সমস্যা (যেমন-স্পাইনা বাইফিডা বা স্পাইনাল ডিসরাফিজম) থাকে, তবে মূত্রথলি নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুগুলো সঠিকভাবে কাজ করে না । এর ফলে মূত্রথলি পুরোপুরি খালি হতে পারে না এবং ভেতরে মূত্র জমে থাকে, যা থেকে পাথর তৈরি হতে পারে ।
  • বাসস্থান: যেসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ জল লবণাক্ত বা 'হার্ড' (খনিজ উপাদানসমৃদ্ধ), সেখানকার বাসিন্দাদের কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে । অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং অপর্যাপ্ত পুষ্টির কারণেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে ।
  • ভিটামিন 'এ'-র ঘাটতি: ভিটামিন 'এ'-র ঘাটতিজনিত কারণে মূত্রথলিতে পাথর তৈরির প্রক্রিয়াটিকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় 'ইউরোলিথিয়াসিস' (urolithiasis) বলা হয় । বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থায় মূত্রথলির ভেতরের আবরণটি পাতলা হয়ে যায় । এই আবরণের কোনও ক্ষুদ্র অংশ যদি কোথাও আটকে যায়, তবে তার চারপাশে বর্জ্য পদার্থ জমতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে পাথরে পরিণত হয় ।
  • খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন: 'হার্ভার্ড হেলথ জার্নাল'-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল ও তরল পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে । বিশেষজ্ঞরা ঠান্ডা পানীয় পান না করার পরামর্শ দেন । তাঁরা লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবারের পরিমাণ কমানোর কথা বলেন এবং যাদের কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বেশি, সেইসব শিশুকে লেটুস পাতা, বাঁধাকপি ও টমেটোর মতো খাবার কম খাওয়ার পরামর্শ দেন ।

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: এখানে প্রদত্ত স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত তথ্য ও পরামর্শ শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে । বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সমীক্ষা এবং চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের উপর ভিত্তি করে এই তথ্য প্রদান করা হয়েছে । এই পরামর্শগুলো অনুসরণ করার আগে আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা জরুরি ।)

বর্ষাকালে বাড়ে বদহজম-পেটের সমস্যা, প্রতিরোধের উপায় জানালেন বিশেষজ্ঞরা

গ্যাস্ট্রাইটিস কি বারবার ফিরে আসছে? জীবনযাত্রার এই অভ্যাসে প্রাকৃতিকভাবে হবে নিরাময়

বর্ষায় মারাত্মক রোগ ডেকে আনে স্ট্রিট ফুড ! সাবধান করলেন পুষ্টিবিদরা

Last Updated : August 4, 2026 at 1:07 PM IST