পাঠ আর পাঠাভিনয়ে এক মঞ্চে রবীন্দ্রনাথ থেকে শেক্সপিয়ার
'বিদুষক', বনফুলের 'বিধাতা', শেক্সপিয়রের 'ওথেলো ও দেসদিমোনা', মহাভারতের 'কর্ণ ও দ্রৌপদী' ও আধুনিক যুগের ভাস্কর ও তুলিকা একসূত্রে বাঁধা পড়লেন 'শ্রাব্য গাথা' শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে।

By ETV Bharat Entertainment Team
Published : November 3, 2025 at 12:44 PM IST
কলকাতা, 3 নভেম্বর: পুজোর পরে শীত শুরুর আগে যখন দিকে দিকে নাচ, গানের আয়োজন তখন গোটা একটা সন্ধ্যা বাচিক শিল্প চর্চায় মাতলেন শহরের একঝাঁক গুণী শিল্পী। 'শ্রাব্য গাথা' শীর্ষক অনুষ্ঠানে মঞ্চস্থ হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'বিদূষক' (পাঠে শ্রীপর্ণা সেন রায়), বনফুলের 'বিধাতা' (পাঠে ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়), 'এক্সকার্পটস' (পাঠে সুজয় প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়), পাঠাভিনয়- পার্থপ্রতিম মিত্রর 'ফিরে এসো গান্ধর্বী' (অভিনয়ে ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায় ও সুজয় প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়), পাঠাভিনয়- বুদ্ধদেব বসু'র 'প্রথম পার্থ'র 'কর্ণ ও দ্রৌপদী'। অভিনয়ে শ্রীপর্ণা সেন রায় ও সুজয় প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।
অর্থাৎ 'বিদুষক', বনফুলের 'বিধাতা', শেক্সপিয়রের 'ওথেলো ও দেসদিমোনা', মহাভারতের 'কর্ণ ও দ্রৌপদী' ও আধুনিক যুগের ভাস্কর ও তুলিকা একসূত্রে বাঁধা পড়লেন 'শ্রাব্য গাথা' শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে। ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়, শ্রীপর্ণা সেন রায় ও সুজয় প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের উদ্যোগে রঙ্গকর্মীর মঞ্চে, এদিনের সন্ধ্যা ছিল মনে রাখার মতো। শুরুতে শ্রীপর্ণার উপস্থাপনা, রবীন্দ্রনাথের 'বিদুষক', যা কিনা আজও প্রাসঙ্গিক, যথাযথ। ইন্দ্রাণীর 'বিধাতা'র একক পাঠে প্রতিটি 'আচ্ছা' স্বতন্ত্রভাবে উচ্চারিত। সুজয়ের কণ্ঠে দেসদিমোনার মৃত্যু দৃশ্যের অংশটুকুতে একই সঙ্গে ওথেলোর ঔদ্ধত্য এবং আবেগ, আবার দেসদিমোনার আর্তি ও অসহায়তা এক অন্য মাত্রা পায়।
দু'টি যুগলবন্দীর মধ্যে প্রথমটিতে সুজয় ও ইন্দ্রাণী পাঠাভিনয় করলেন পার্থপ্রতিম মিত্রর 'ফিরে এসো গান্ধর্বী'। এখানে তুলিকা মডেল, সে তার শরীর ছুরি, কাঁচি, সিলিকনের সাহায্যে নিখুঁতভাবে গড়ে তোলে, প্রতিযোগিতায় সফলও হয় কিন্তু হারিয়ে ফেলে তার স্বাভাবিক লালিত্য, যা ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে চায় আদ্যন্ত শিল্পী ভাস্কর। শেষে দুজনেই পরাজিত, ভাস্কর তার প্রিয় সৃষ্টি বিক্রি করতে বাধ্য হয়, তুলিকা মারণরোগে আক্রান্ত, ভাস্করের কাছে ফিরে যায়, যদিও ভাস্কর তাকে গতানুগতিক ভালোবাসা দিতে পারে না। এই দুটি চরিত্র ও আধুনিক জীবনের কৃত্রিমতা অসামান্য দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন দুই শিল্পী।
এরপর শ্রীপর্ণা ও সুজয় পাঠ করেন বুদ্ধদেব বসুর 'প্রথম পার্থ'। কর্ণ ও দ্রৌপদী (যাকে দ্রুপদকন্যা বলে সম্বোধন করা হয়েছে একাধিকবার) দুটি চরিত্রই বহুস্তরীয়, তাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও অনুভূতি শুধুমাত্র কণ্ঠাভিনয় দিয়ে প্রকাশ করা কঠিন। এই কাজে শ্রীপর্ণা ও সুজয়ের আন্তরিক প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। সবশেষে সুজয়ের পক্ষ থেকে পরবর্তী প্রজন্মকে বই পড়ার উৎসাহ যোগান দেবার পরামর্শটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ । সমগ্র অনুষ্ঠানটি সুন্দরভাবে সঞ্চালনা করেন তন্দ্রিমা বন্দ্যোপাধ্যায়।
জনৈক দর্শক বলেন, "শ্রাব্য গাথা একটি উজ্জ্বল এবং শক্তিশালী প্রযোজনা ছিল। আমি টক থিয়েটারের (শ্রুতিনাটক) একজন বড় অনুরাগী এবং আমি পাঠ্যের বৈচিত্র্যময় নির্বাচন পছন্দ করি, যা আবেগকে চিত্রিত করে। " সামাজিক মাধ্যমে এই অনুষ্ঠান ঘিরে বহু মানুষ নিজেদের ভালো লাগার কথা লিখেছেন। তার মধ্যে অন্যতম একটি। জনৈক ব্যক্তি লিখেছেন, "অবসর জীবনের অফুরন্ত অলস সময়ের মধ্যে দিয়ে চলার সময় শ্রাব্যগাথার নিবেদন আমার মনটাকে নানাভাবে ছুঁয়ে গেল। শিল্পীরা এখানে সবাই স্বমহিমায় অনুষ্ঠানটি উজ্জ্বল করেছেন। তবে সবথেকে ভালো লেগেছে যে শিল্পীরা বর্তমান সমাজকে তাঁদের কিছু নাট্যরূপের মধ্যে দিয়ে সচেতনতার বার্তা দিয়েছেন। সেইসব বার্তাবাহকদের আমার অভিনন্দন জানাই।
জনৈক দর্শক আরও লেখেন, "সুজয় প্রসাদ, ইন্দ্রাণী ও শ্রীপর্ণা - তোমাদের প্রত্যেকেরই পাঠ অসাধারণ। সূত্রকথনে তন্দ্রিমা ও সুন্দর ভাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন ও সুরজিতের সহযোগিতা এতটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল যে কখনোই অতিরিক্ত মনে হয়নি। আলোর ব্যবহার অন্য মাত্রা যোগ করেছে। মঞ্চ সজ্জাতে কোনও বাড়াবাড়ি নেই, কিন্তু পারফেক্ট।" এহেন অনুষ্ঠান আরও দেখার আর্জি জানিয়েছেন অনেকেই ।

