ঋতুপর্ণের জন্মদিনে আবেগঘন পোস্ট প্রসেনজিতের, কেমন ছিল তাঁদের বন্ধুত্বের রসায়ন
পরিচালক ও অভিনেতা হিসেবে তাঁদের রসায়ন যেমন বাংলা ছবিকে একাধিক স্মরণীয় কাজ উপহার দিয়েছে, তেমনই পর্দার বাইরে তাঁদের বন্ধুত্বও হয়ে উঠেছিল এক বিশেষ সম্পর্কের গল্প।

By ETV Bharat Entertainment Team
Published : August 31, 2026 at 1:47 PM IST
কলকাতা, 31 অগস্ট: "শুভ জন্মদিন ঋতু । তোকে ঘিরে থাকা স্মৃতিগুলো আজও ভীষণ আপন…৷" ঋতুপর্ণ ঘোষের জন্মদিনে আবেগঘন পোস্ট করলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় । প্রসেনজিৎ ও ঋতুপর্ণের বন্ধুত্বের হাত ধরেই বদলে গিয়েছিল বাংলা সিনেমা ৷ তারকা থেকে অভিনেতা - ঋতুপর্ণের ছবিতে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ।
বলতে দ্বিধা নেই, বাংলা সিনেমার ইতিহাসে কিছু জুটি শুধুই সাফল্যের কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকে না, তাঁদের সম্পর্কের গভীরতাও আলাদা করে জায়গা করে নেয় দর্শকের মনে । প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও ঋতুপর্ণ ঘোষের সম্পর্ক তেমনই এক অধ্যায় । পরিচালক ও অভিনেতা হিসেবে তাঁদের রসায়ন যেমন বাংলা ছবিকে একাধিক স্মরণীয় কাজ উপহার দিয়েছে, তেমনই পর্দার বাইরে তাঁদের বন্ধুত্বও হয়ে উঠেছিল এক বিশেষ সম্পর্কের গল্প ।
একদিকে তখন বাংলা বাণিজ্যিক ছবির অন্যতম জনপ্রিয় তারকা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় । অন্যদিকে বাংলা সিনেমায় অন্য ধরনের গল্প বলার ভাষা তৈরি করছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ । দুই ভিন্ন ধারার মানুষের সেই সাক্ষাৎই পরবর্তী সময়ে বদলে দেয় দু’জনের কাজের পরিসর । ঋতুপর্ণ খুব তাড়াতাড়িই বুঝেছিলেন, প্রসেনজিৎ শুধু জনপ্রিয় নায়ক নন, তাঁর মধ্যে রয়েছে একজন শক্তিশালী অভিনেতাও । সেই অভিনেতাকে সামনে আনার জন্যই যেন ঋতুপর্ণ বারবার প্রসেনজিতের পরিচিত ‘স্টার’ ইমেজকে ভেঙেছেন । আর প্রসেনজিৎও পরিচালকের সেই দৃষ্টিভঙ্গির উপর আস্থা রেখে নিজেকে নতুনভাবে মেলে ধরেছেন ।
‘চোখের বালি’, ‘দোসর’, ‘উৎসব’, ‘খেলা’-সহ একাধিক ছবিতে তাঁদের কাজ সেই সম্পর্কের সাক্ষ্য বহন করে । বিশেষ করে ‘চোখের বালি’ ও ‘দোসর’-এ প্রসেনজিতের অভিনয় দর্শককে তাঁর অন্য পরিচয়ের সঙ্গে পরিচিত করেছিল । জনপ্রিয় নায়ক থেকে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নিজের পরিসর আরও বিস্তৃত করেছিলেন তিনি ।
তবে এই সম্পর্কের সৌন্দর্য শুধু সিনেমার পর্দায় সীমাবদ্ধ ছিল না । সময়ের সঙ্গে পরিচালক-অভিনেতার পেশাগত সম্পর্ক গড়িয়ে যায় ব্যক্তিগত বন্ধুত্বে । তাঁদের মধ্যে হত দেদার আড্ডা, মতের অমিল, অভিমান - আবার সেই অভিমান ভুলে ফিরে আসা । প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় নিজেই এক সাক্ষাৎকারে ইটিভি ভারতের প্রতিনিধিকে জানান, "ঋতুপর্ণ ঘোষের উপরে বহুবার অভিমান হয়েছে । হয়তো দুই-আড়াই বছর কথাও হয়নি আমাদের মধ্যে । এমনও হয়েছে যে ও আমার বাড়িতে আসছে, থাকছে, লাঞ্চও করছে । ওদিকে আমি শুটিঙে বেরিয়ে যাচ্ছি । আমার সঙ্গে ওর কথা নেই কোনও । তারপর অভিমান ভাঙার পরই একটা 'চোখের বালি', একটা 'উৎসব' হয়ে গেছে।..."
তাঁকে স্মরণ করে প্রসেনজিৎ তাঁদের সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছিলেন ‘বন্ধুত্ব’, ‘অভিমান’ এবং ‘একসঙ্গে কাজ’-এর কথা । কয়েকটি শব্দেই যেন ধরা পড়েছিল তাঁদের দীর্ঘ সম্পর্কের নানা ওঠাপড়া । এই সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল পারস্পরিক বিশ্বাস । ঋতুপর্ণ বিশ্বাস করতেন, প্রসেনজিৎ তাঁর চরিত্রের গভীরে পৌঁছতে পারবেন । আর প্রসেনজিৎ বিশ্বাস করতেন, ঋতুপর্ণ তাঁকে এমন চরিত্র দিতে পারবেন যা তাঁর কেরিয়ারের নতুন দরজা খুলে দেবে ।
সেই বিশ্বাসই হয়তো প্রসেনজিতের অভিনয় জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কারণ । বাণিজ্যিক ছবির পরিচিত নায়ক-ইমেজের বাইরে গিয়ে তিনি যে ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করতে পারেন, ঋতুপর্ণের ছবিতে তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে । পরবর্তী সময়ে প্রসেনজিতের অভিনয়ের যে বহুমাত্রিকতা দর্শক দেখেছেন, তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এই সময়েই ।
2013 সালের 30 মে ঋতুপর্ণ ঘোষের আকস্মিক প্রয়াণে সেই বন্ধুত্বে চিরস্থায়ী ছেদ পড়ে । কিন্তু সম্পর্কটি শেষ হয়ে যায়নি । বরং সময় যত এগিয়েছে, প্রসেনজিতের স্মৃতিচারণে ততই ফিরে এসেছে ঋতুপর্ণের কথা । ঋতুপর্ণকে হারানোর পরও প্রসেনজিতের কাছে তিনি শুধু একজন প্রয়াত পরিচালক নন । তিনি সেই বন্ধু, যিনি তাঁর ভিতরের অভিনেতাকে চিনেছিলেন । যিনি তাঁকে নিজের পরিচিত গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসার সাহস দিয়েছিলেন । আর সেই কারণেই প্রসেনজিতের অভিনয় জীবনের গল্প বলতে গেলে ঋতুপর্ণের অধ্যায় কোনওভাবেই বাদ দেওয়া যায় না ।
আজ ঋতুপর্ণ নেই । কিন্তু তাঁর তৈরি ছবিগুলি রয়েছে । রয়েছে সেই চরিত্রগুলি, যেগুলির মধ্যে এখনও জীবন্ত হয়ে ওঠে তাঁর শিল্পভাবনা । আর রয়েছে প্রসেনজিতের অভিনয়—যার মধ্যে কোথাও না কোথাও মিশে আছে সেই বন্ধুর দেওয়া আস্থার ছাপ । তাঁদের সম্পর্ক তাই শুধু একজন পরিচালক ও অভিনেতার সাফল্যের গল্প নয় । এটি দুই শিল্পীর পারস্পরিক বিশ্বাসের গল্প । এমন এক বন্ধুত্বের গল্প, যা একজনের চলে যাওয়ার পরও অন্যজনের কাজ ও স্মৃতির মধ্যে বেঁচে রয়েছে ।

