SPECIAL: আমরা 'হ্যান্ডস'ই রয়ে গেলাম, 'মিউজিশিয়ান' হলাম না...
মঞ্চে শিল্পীকে সঙ্গত করতে মিউজিশিয়ানদের অক্লান্ত পরিশ্রম দর্শক-শ্রোতা নিজের চোখেই দেখতে পায়। একজন কণ্ঠ শিল্পীর থেকে তাঁদের পরিশ্রম কোনও অংশে কম না।

By ETV Bharat Entertainment Team
Published : December 14, 2025 at 9:02 AM IST
কলকাতা, 14 ডিসেম্বর: প্রত্যেক সঙ্গীত শিল্পীর সাফল্যের নেপথ্যে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেন তাঁর সঙ্গে সঙ্গতে থাকা বাদ্যযন্ত্রী বা মিউজিশিয়ানরা। আমজনতার চলতি কথায় 'হ্যান্ডস'রা। মঞ্চে শিল্পীকে সঙ্গত করতে তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম দর্শক-শ্রোতা নিজের চোখেই দেখতে পায়। একজন কণ্ঠ শিল্পীর থেকে তাঁদের পরিশ্রম কোনও অংশে কম না। কিন্তু সেই অনুযায়ী পারিশ্রমিক কি পান তাঁরা? আর যথাযোগ্য সম্মান? এই পেশায় আসতে গিয়ে পরিবারের সমর্থন ছিল তাঁদের? সরেজমিনে খোঁজ নিল ইটিভি ভারত। উঠে এলো মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
রকেট মণ্ডল (গিটারিস্ট, সঙ্গীত পরিচালক)
এই প্রসঙ্গে কথা হয়, প্রখ্যাত বাদ্যযন্ত্রী রকেট মণ্ডলের সঙ্গে। সলিল চৌধুরী থেকে শুরু করে ভূপিন্দর সিং-এর মতো অগণিত তারকাদের সঙ্গে বাজিয়েছেন। তিনি এই প্রসঙ্গে বলেন, "মিউজিশিয়ানরা আজও সঙ্গীত শিল্পীর থেকে অনেক কম পারিশ্রমিক পান। শিল্পী 100 ভাগ পেলে আমরা সেখানে 20 ভাগ পেতাম। আজও তাই। আজও আমাদের কেউ 'মিউজিশিয়ান' বলেন না কোথাও গেলে। আমরা আজও ওই 'হ্যান্ডস' নামেই পরিচিত হই। কোথাও গেলে উদ্যোক্তাদের বলতে শুনি 'এই হ্যান্ডসগুলোকে গ্রিন রুমে বসাও তো... ।' এখানে আমার আপত্তি আছে। ক্ষোভের সঙ্গেই জানালাম। হোয়াট ইজ 'হ্যান্ডস'?"
উল্লেখ্য, তাঁর জীবনের এই সুরেলা সফরের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "মিউজিশিয়ান হতে গিয়ে পরিবারের দিক থেকে কোনও আপত্তি ছিল না কখনও। কেননা আমি ওই পরিবেশেই বড় হয়েছি। পাঁচ বছর বয়স থেকে আমি গানবাজনা করি। 'লিটল বিটলস অর্কেস্ট্রা'র সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। তখন আমি অনেক ছোট। খুব জনপ্রিয় ছিল ওটা। কোনও বড় শিল্পী কোনও অনুষ্ঠানে গাওয়ার আগে 'লিটল বিটলস অর্কেস্ট্রা' উদ্বোধনী পারফর্ম করত। সেই সময়ে জনপ্রিয় ছিল 'রুমকি-ঝুমকি'র ডান্স পারফরম্যান্স। মানে দেবশ্রী রায় আর তাঁর দিদির পারফরম্যান্স। সুতরাং গানবাজনা নিয়ে থাকার দরুণ কোনও অসুবিধা বা লড়াই আমার জীবনে আসেনি। বরং পরিবারের পূর্ণ সমর্থন ছিল। সমস্যাটা হয়েছিল সামাজিক জায়গায়। আমার বিয়ের জন্য পাত্রী পাওয়া যাচ্ছিল না কিছুতেই। কারণ পাত্র যে মিউজিশিয়ান। কত আর রোজগার? যদিও তখন আমি সুরকার হয়ে গেছি। তাও ভরসা করতে পারছিলেন না মেয়ের বাবারা।"
রুদ্রনীল চৌধুরী (গিটারিস্ট, ভোকাল আর্টিস্ট)
'মিসিং লিঙ্ক' ব্যান্ডের অন্যতম সদস্য এবং 'ব্যান্ডেমাতরম' বিজয়ী আরেক বাদ্যযন্ত্রী রুদ্রনীল চৌধুরী। তিনি দেবজ্যোতি মিশ্র, বিক্রম ঘোষের সঙ্গে সঙ্গত করেন। রোজগারের প্রসঙ্গ তুললে রুদ্রনীল বলেন, "একটা সময় এমন ছিল যে তখন ভোকালিস্ট হিসেবে যাঁরা একটু নাম করে যেতেন তাঁদের রাজত্ব ছিল সবথেকে বেশি। তাঁরাই বেশি টাকা পেতেন। বাদ্যযন্ত্রীরা সেভাবে আহামরি কিছু পেতেন না। নিয়মিত কাজ থাকলে ভালো রোজগার হত, না হলে নয়। কিন্তু এখন চিত্রটা আলাদা। এমন অনেক বাদ্যযন্ত্রী উঠে এসেছেন যাঁরা প্রায় ইন্ডাস্ট্রি লিড করছেন। এক্ষুণি নাম বলতে পারি মোহিনী দে'র। একজন মেয়ে বেস বাজিয়ে লক্ষ কোটি টাকা উপার্জন করতে পারে ভাবা যায় না। আছেন রিদম সাউ। তিনি দুরন্ত গিটারিস্ট। নীলাঞ্জনা এ আর রহমানের সঙ্গে কাজ করেন। তাঁর রোজগারের কথা না-ই বা বললাম। ওঁরা যে টাকাটা পান তা অনেক ভোকালিস্ট পান না।"
উল্লেখ্য, রুদ্রনীল মিউজিক অ্যারেঞ্জ করেছেন 'মিও আমোরে' জিঙ্গলস-এরও। 2010 সাল থেকে ফিল্মের সঙ্গে যুক্ত তিনি। তাঁর প্রথম ব্রেক 'অলীক সুখ।' তিনি ডেবিউ করেন মিউজিক কম্পোজার, প্রোডিউসার, অ্যারেঞ্জার, অডিও প্রোগ্রামার হিসেবে। অনিন্দ্য চ্যাটার্জির সব ছবিতেই বাজনায় বা ভোকালে কোনও না কোনওভাবে যুক্ত আছেন তিনি। । 2015-16-তে 'অ্যামাজন অভিযান'-এর সময় থেকে তিনি দেবজ্যোতি মিশ্রকে অ্যাসিস্ট করা শুরু করেন। সম্প্রতি বিক্রম ঘোষের সঙেও কাজ শুরু করেছেন রুদ্রনীল। উল্লেখ্য, 'মিও আমোরে'র সেই বিখ্যাত জিঙ্গলস-এর অ্যারেঞ্জার তিনিই।
তাঁর কথায়, "আমাকে স্রোতের বিপরীতে হাঁটতে হয়েছিল। মধ্য নব্বইয়ের দশকে আমি ব্যান্ড নিয়ে কাজ শুরু করি। আমি একা নয় অনেকেরই ওই সময়ে শুরু। আমরা যে সময়ে শুরু করেছি তখন বিষয়টা অত সহজভাবে নিতেন না বাবা-মায়েরা। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। ব্যান্ড নিয়ে কাজ শুরু করলে একটা বিরোধ তো তৈরি হয়েছিলই আমার সঙ্গে বাবা- মায়ের। কেননা আমাদের পরিবারে সবাই বেশ শিক্ষিত আর ভালো ভালো জায়গায় চাকরি করেন। আমার বাবাও তাই। ফলে, আমি কেন এই গানবাজনা নিয়েই থাকব তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল বৈকি। তবে গান গাওয়া নিয়ে কোনও আপত্তি ছিল না তাঁদের। কিন্তু মিউজিককে পেশা বানানোতে আপত্তি ছিল ঘোর। এই অবস্থাটার পরিবর্তন তখন হল যখন 2006- এ মিসিং লিঙ্ক 'ব্যান্ডেমাতরম' জিতল। আমার বাবা তখন বুঝলেন আমার ছেলে এতদিন ভুল কিছু করেনি।"
রণদীপ মুখোপাধ্যায় (কি-বোর্ডিস্ট)
কি-বোর্ডিস্ট রণদীপ মুখোপাধ্যায় (মানু) বলেন, "আমরা কোনওকালের শ্রম অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাই না। দিন দিন যেন আরও কমে যাচ্ছে সেই অঙ্কটা। একজন মুম্বই থেকে সিঙ্গার বা মিউজিশিয়ান যা পান তারও অনেক কম পারিবারিকে আমাদের কাজ করতে হয়। একজন কি-বোর্ডিস্ট হিসেবে বলব এই কমার্শিয়াল ইন্ডাস্ট্রিতে সবার থেকে বেশি কাজের চাপ আমাদেরই থাকে। সবটা উদ্ধার করে দেওয়া যাকে বলে। আমাদের খাটুনির অনুপাতে টাকা পাঁচ শতাংশ পাই। দিন দিন তা আরও কমছে। আমি না করলে এরকম অন্য কেউ আছে যে আরও কমে করে দেবে। আর সত্যি কথা বলতে কি এখন তো কোয়ালিটির বেসিক এথিক্সটাই তো আর নেই। চলে গেলেই হল- এই কনসেপ্টই চলছে।" উল্লেখ্য, তাঁর এই মিউজিক্যাল জার্নিতে কতটা পাশে ছিল তাঁর পরিবার? শিল্পী বলেন, "আমি ধন্য। আমার পরিবারের পূর্ণ সমর্থন ছিল এই ব্যাপারে। বিশেষ করে আমার বাবা রাজীব মুখোপাধ্যায়ের সাপোর্ট ছিল সবথেকে বেশি। "
অমিতাভ ঘোষ, অর্কেস্ট্রা
তিনি বলেন, "আমাদের ইন্ডিয়ান ক্লাসিকাল বা কমার্শিয়াল মিউজিকে আমাদের ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিকের জন্য খুব বেশি কিছু করা হয়নি। যাঁরা গান করেন আমরা তাঁদের পিছনে বসে বাজাই। বলতে এতটুকু দ্বিধা নেই আমার যে শিল্পীর থেকেও অনেক বেশি পরিশ্রম থাকে আমাদের। একজন সঙ্গীত শিল্পীর পক্ষে জানা সম্ভব না গিটারে কোন কোন কর্ড ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ আমরা সম্মান বা পারিশ্রমিক যথাযথভাবে পাই না। আবার অনেক শিল্পীও আছেন যাঁরা আমাদের কৃতিত্ব মেনে নিতে চান না কখনও।"
তিনি আরও বলেন, "পৃথিবীর কোনও দেশে মিউজিশিয়ানকে 'হ্যান্ডস' বলে সম্বোধন করা হয় না। 'হ্যান্ডস' মানে কী আবার? আমরা তো মিউজিশিয়ান। আমার প্রথম স্টেজ পারফরম্যান্স ভি. বালসারার সঙ্গে। উনি আমাকে স্টেট মিউজিক অ্যাকাডেমির প্রতিযোগিতায় বাঁজাতে দেখেন। আমি ফার্স্ট হয়েছিলাম। উনি আমাকে দেখা করতে বলেন। বলেন, ওনার সঙ্গে অর্কেস্ট্রা বাজাতে। সেদিন যেন হাতে স্বর্গ পেয়েছিলাম আমি। আমি কলকাতা, মুম্বই সব জায়গাতেই সফর করি। এখন স্বাধীনভাবে একটা অর্কেস্ট্রা গ্রুপ করেছি। যদিও আমাদের এখানে অর্কেস্ট্রেশন বলে কিছু নেই। সঙ্ঘবদ্ধ হতে দেওয়া হয় না। তবু চেষ্টা চালাচ্ছি।"
তাঁর কথায়, "আজ অবশ্য মিউজিশিয়ানদের জন্য সরকারি ইনস্যুরেন্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটা সময়ে তো পেমেন্টই পেত না অনেকে। তবুও বলব, আমাদের অবস্থা অনেকটা পিছিয়েই আজও। একদিন বাড়ির অমতে এই জগতে পাড়ি দিই। আমি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছি। পড়া শেষ করার আগেই ইন্টার্নশিপের সুযোগ পাই। কিন্তু কাজে মন লাগত না। মন পড়ে থাকত সুরে। তাই সব ছেড়ে দিয়ে নাম লেখাই সুরের দুনিয়ায়। বাড়ির সমর্থন ছিল না। এই দুনিয়ায় লড়াই করে যাচ্ছি আজও।..."

