ETV Bharat / entertainment

EXPLAINER: তারকা মানেই সহজলভ্য ! যা খুশি বলা যায়... ? সোশাল মিডিয়ার যুগে কোথায় দাঁড়িয়ে সেলেব-সাধারণের সেতু?

তারকাদের ছুঁতে চাওয়া কি সহজ হয়ে গিয়েছে ? ট্রোলিংয়ে সাধারণের কাছে কেন তাঁরাই সফট টার্গেট ? কী মত বিশেষজ্ঞ-অভিনেতাদের? খোঁজ নিলেন নবনীতা দত্তগুপ্ত ৷

explainer-celebs-and-experts-weigh-in-on-whether-social-media-connectivity-brought-us-closer-or-exposed-new-social-fractures
সোশাল মিডিয়ার যুগে কোথায় দাঁড়িয়ে সেলেব-সাধারণের সেতু? (ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Entertainment Team

Published : December 12, 2025 at 2:35 PM IST

8 Min Read
Choose ETV Bharat

সোশাল মিডিয়ার ব্যবহারে ক্রমশ বেড়েই চলেছে 'ট্রোলিং', 'বুলিং'-এর মতো ঘটনা। কারওর পোস্ট করা কোনওকিছু পছন্দের না হলেই নানারকমের কু-মন্তব্য ছুঁড়ে দিতে দু'বার ভাবছেন না কেউ। সোশাল মিডিয়ার যুগে মানব সভ্যতার গতি বেড়েছে ঠিকই, নিত্য চাওয়া-পাওয়ার তালিকাও যত সহজ হচ্ছে ততটাই কঠিন হচ্ছে বেঁচে থাকার লড়াই ৷ এই জাতীয় কাজকর্মের জন্য ট্রোলাররা বেছে নিচ্ছে তারকাদেরই। তাঁরাই ওদের সফট টার্গেট।

ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়কে বডিশেমিং করা থেকে শুরু করে নচিকেতা চক্রবর্তীর মৃত্যুকামনা- বাদ নেই কোনওকিছুই। ভুলে গেলে চলবে না, তারকা মহলও নিজেদের যাবতীয় কথা, সিদ্ধান্ত সামাজিক মাধ্যমেই আনেন সবার আগে ৷ একসময়ে যাঁরা ছিলেন সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে আজ তাঁরা অনেকটাই সহজলভ্য। কেন তারকারাই বারবার টার্গেট হন, ট্রোলিং বা সমালোচনার মুখে পড়েন ? এই প্রবৃত্তিকে ঠিক কী বলে আসলে? খেলা, নেশা নাকি টাইম পাস? নাকি অন্যকে ভালো দেখলে মনের মধ্যে ঈর্ষা কাজ করে, কোনটা ? খোঁজ নিল ইটিভি ভারত।

ব্যক্তিত্বহীনতায় ভোগা মানুষগুলোই এই কাজ করছে...

সমাজত্ত্ববিদ, অধ্যাপক ড. অনিরুদ্ধ চৌধুরীর সঙ্গে বলেন, "আগে তারারা তারাই ছিলেন। ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। এই সময়টা দ্রুত পরিবর্তনশীল। ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি আসায় পৃথিবীটা এখন আর শুধু বোকাবাক্সতে নয়, বন্দি হয়েছে মুঠোফোনে। তারারা অনেক কাছে চলে এসেছেন। তাঁদের চাইলেই ধরে ফেলা যায় এখন। মাধ্যম সোশাল মিডিয়া। সবাই ট্রোল করছে তা নয়। কেউ কেউ সেলেবদের নানা কাজের প্রশংসাও করছে। অনেক ফ্যান ক্লাব আছে। তারা মুক্তকণ্ঠে পছন্দের অভিনেতার প্রশংসা করছে।"

explainer-celebs-and-experts-weigh-in-on-whether-social-media-connectivity-brought-us-closer-or-exposed-new-social-fractures
কী বলছেন সমাজতত্ত্ববিদ ? (ইটিভি ভারত)

এখন মারাত্মক কম্পিটিশনের যুগ। টিকে থাকার লড়াইয়ে সবাই সামিল। নিজের চাহিদা বাড়ানোর জন্য তাঁরা বেছে নিচ্ছেন সমাজ মাধ্যম। সমাজতত্ত্ববিদের কথা, "এখন বিনোদনের নানা প্ল্যাটফর্ম হওয়ায় তারার সংখ্যা এত বেশি যে একটা গ্যালাক্সিতে তা হবে না। এর সঙ্গে আবার 'ভাইরাল সেলেবরা'ও আছেন। রানু মণ্ডল, বাদাম কাকুর মতো সেলেবদের কথা বলছি। সবাই নিজেকে মেলে ধরার জন্য বেছে নিচ্ছেন সংবাদ মাধ্যম। নিমেষে বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে তা পৌঁছে যাচ্ছে। অনেকে আবার নানারকম প্রতিবাদী কথাও বলছেন। সেখানে ট্রোল হলে রেগে উত্তর দিচ্ছেন। বিপদটা ওখানেই হচ্ছে। কোথায় থামা দরকার সেটা জানা উচিত। নাহলে 'আমিও সেলেবের থেকে কম না' এটা প্রমাণ করতে অনেকে এসে তাঁকে যা নয় তাই বলে চলে যাবে, যাচ্ছেও। কেউ সেই কথায় বাধা দিলে বাকিরা তাদের নিয়ে পড়ে যাবে। এটাই এই সময়কার চিত্র।"

আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যও নষ্ট হয়....

আরজি কর কাণ্ডের সময়ে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর শঙ্খবাদন নিয়ে তাঁকে নানাভাবে কটাক্ষ করা হয়েছে। মমতা শঙ্কর মেয়েদের শাড়ি পরার কায়দা নিয়ে নিজের মন্তব্য পেশ করায় তাঁকে কোণঠাসা করার চেষ্টাও কম করা হয়নি। একইভাবে ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়কে সাম্প্রতিককালে তাঁর নাচের দক্ষতা, ক্ষমতা এবং চেহারা নিয়ে কুমন্তব্য করার ঘটনাও কারোর অজানা নয়।

অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তকে এই নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, "মহানায়ক উত্তম কুমার একসময় বলেছিলেন যে আমরা ছায়ার জগতের মানুষ, আমাদের তাই ছায়ার জগতেই থাকা উচিত। সেটা আমিও বিশ্বাস করি। আমজনতা আমাদের মতো মানুষদের পেয়েও পাচ্ছে না এই ব্যাপারটাই ভালো ছিল। এরকম হলেই ভালো হত। কিন্তু সোশাল মিডিয়া এতটাই আমাদের জীবনের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে যে আমরা সেটাকে এড়িয়েও চলতে পারছি না। সবাই এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।বেরোতে পারছে না। ট্রোলারদের হাতে আমরা অনেককিছু তুলে দিচ্ছি, সেই সুযোগটা নিচ্ছে ওরা। সেই সুযোগটা সোশাল মিডিয়াই করে দিয়েছে। কোথাও গিয়ে একটা নিয়ম তৈরি হওয়া উচিত যে যাকে যা খুশি বলা যায় না। কোথাও একটা লাগামের দরকার আছে। কাউকে খারাপ কথা ওপেন ফোরামে বলা ঠিক না, কেউ সেই এক্তিয়ার দেয়নি এটা বুঝতে হবে সবাইকে। আমরা যারা সেলেব হিসেবে পরিচিত তারাও মানুষ, তাদেরও ভুল হয়। আমরা তো মেশিন বা এআই নই। আমাদেরও পার্সোনাল লাইফ আছে। এই সব দিনের পর দিন চলতে থাকায় আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যও নষ্ট হয়।"

আসলে যারা ধরাছোঁয়ার বাইরে, যাঁদের সাফল্যের এক কণাও অর্জন করা সম্ভব নয়, তাঁদেরকেই সমাজ মাধ্যমে এসে বাক্যবাণে বিদ্ধ করে শান্তি বা আরাম পায় এক শ্রেণীর মানুষ। সেলেবদের কমেন্ট বক্সে পাঁচ কথা বললে তার নামটাও পৌঁছয় সেই সেলেবের কাছে। কেউ একে উপেক্ষা করেন, কেউ উত্তর দেন, কেউ ব্লক করে রিপোর্ট করেন কেউ বা ছোটেন পুলিশের কাছে। উত্তরোত্তর বাড়ছে এই ঘটনা।

অভিনেতা গৌরব রায়চৌধুরীর কথায়, "আমি নিজে কীভাবে এগুলোকে সামলাই শুধু সেটুকুই বলব। সামাজিক মাধ্যমের এই রমরমা শুরু হওয়ার প্রথম দিন থেকেই আমি নিজের ব্যক্তিগত কোনওকিছু সকলের সামনে আনি না। আমার কাজের জন্য যতটুকু জানানোর বা করার আমি সেটুকুই করি। আজ আমি যতটুকু তা দর্শকের ভালোবাসায়। একইভাবে আমি অভিনেতা। আমি ক্রিয়েটর নই। তাই অভিনয়ের কারণে বা কাজের প্রোমোশনের জন্য যতটুকু দর্শককে জানানোর দরকার ততটুকুই আমি তুলে ধরি সোশাল মিডিয়ায়। বাড়াবাড়ি করি না কোনওকিছু নিয়ে।"

গৌরব আরও বলেন, "আগে মানুষ কোনও সেলেব্রিটির কাজ ভালো না লাগলে ঘরে বসেই সমালোচনা করত। এখন গোটা বিষয়টা খোলা পাতার মতো হয়ে গেছে। সবাই ওপেন ফোরামে এসে রাগ উগড়ে দিচ্ছে, বুলি করে চলে যাচ্ছে। কেন না সুযোগটা সোশাল মিডিয়া করে দিয়েছে। আমাদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের সব কথা মেলে ধরছি। সেটা কেউ পছন্দ করছে, কেউ করছে না। সবাই নেগেটিভ কথা বলছে তা নয়। কিছু পজিটিভ কথাও বলছে। আর এই পজিটিভ রি- অ্যাকশন পেয়েই সেলেবরা সোশাল মিডিয়ায় নিজেদের প্রায় সব কথা জানাচ্ছেন বা জানাতে ভরসা পাচ্ছেন। আমি বলব নেগেটিভ এবং পজিটিভ সব রকমের কথাই ছুঁড়ে দেওয়া হয় সেলেবদের দিকে। কে, কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন সেটা তাঁর নিজস্ব ব্যাপার।"

এই ক্ষেত্রে সমাজত্ত্ববিদ, অধ্যাপক ড. অনিরুদ্ধ চৌধুরী বেশ কিছু পয়েন্ট উল্লেখ করেছেন ৷

* কেউ দুর্দান্ত অভিনেতা, প্রথিতযশা নৃত্যশিল্পী, অসম্ভব গুণী সঙ্গীত শিল্পী হতেই পারেন। তা বলে তিনি সব ব্যাপারে সব জানেন, সব বিষয়ে মন্তব্য করবেন সেটা কিন্তু নয়।

* সব ব্যাপারে কথা বলার দরকার নেই । মধ্যযুগের চোখ দিয়ে আজকের দুনিয়াকে দেখলে চলবে না। যুগটা পাল্টে গিয়েছে।

* নিজের প্রতিবাদী সত্ত্বা দেখাতে ইচ্ছা হলে, পরে কী হতে পারে সেটার জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে।

* এই সমাজটাকে 'পোস্ট ট্রুথ সোসাইটি' বলা হয় । প্রত্যেকটা সময়ে সত্য নির্মাণ হচ্ছে। এক একজন এক এক রকম সত্য মেনে চলছে। তোমার কাছে যেটা সত্য আমার কাছে নাও হতে পারে। সেলেবদের দায়িত্ব অনেক বেশি। কোথায় কতটুকু বলতে হবে সেটা জানতে হবে।

* ফ্যান ক্লাবে সবাই আসল 'ফ্যান' নয় কিন্তু। কেউ কেউ বিরোধীও বটে। তারা চুপ করে বসে আছে বিরোধিতা করতে ।

একদিকে কাজের ব্যস্ততা, অন্যদিকে বাড়িতে দুই মেয়েকে সামলানো, একা হাতে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন প্রযোজক নীলাঞ্জনা শর্মা ৷ ট্রোলিংকে হ্যান্ডেল করার জন্য মেয়েদের কীভাবে শিক্ষা দিচ্ছেন তিনি ? নীলাঞ্জনা বলেন, "আমি আমার মেয়ে সারাকে বলি, ট্রোলারদের কথায় পাত্তাই দিও না। যারা ট্রোলিং করছে তাদের কাছে হয়ত ফ্রি ডাটা বা অন্য কোনও সুবিধা আছে তাই সেটাকে কাজে লাগাতে এই সব করছে। ট্রোলারের উপরে যদি কোনও শিল্পীর সাফল্য আর ব্যর্থতা নির্ভর করে তা হলে সোশাল মিডিয়া আসার আগে কী হত? কীভাবে শিল্পীরা সফল বা ব্যর্থ হতেন?"

একনজরে দেখে নেওয়া যাক এই বছর সামাজিক মাধ্যমে কোন-কোন ব্যক্তি বা ঘটনা নিয়ে হয়েছে কাদা ছোঁড়াছুড়ি ...

explainer-celebs-and-experts-weigh-in-on-whether-social-media-connectivity-brought-us-closer-or-exposed-new-social-fractures
বিতর্কে ডোনা (ইটিভি ভারত/এএনআই)
explainer-celebs-and-experts-weigh-in-on-whether-social-media-connectivity-brought-us-closer-or-exposed-new-social-fractures
ঋজুর মন্তব্য ঘিরে ঝড় ওঠে সামাজিক মাধ্যমে (ইটিভি ভারত)
explainer-celebs-and-experts-weigh-in-on-whether-social-media-connectivity-brought-us-closer-or-exposed-new-social-fractures
বিতর্কের জালে জড়ায় ঈশিতও (ইটিভি ভারত/এক্স হ্যান্ডেল)


এই ব্যাপারে ফেডারেশন সভাপতির মত, "সামাজিক মাধ্যমে কেন, যে কোনও সময়ে, যেখানেই হোক কাউকে অপমানজনক কথা বললে বা আজকের ভাষায় ট্রোল করলে সেটা যে ভাইসি ভার্সাও হতে পারে মানে তার কাছেও সেটা ফিরে আসতে পারে সেটাও মনে রাখতে হবে।"

নিজেকে ভালোবাসো তুমি এবার...

অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা হোক বা অভিনেতা ঋজু বিশ্বাস প্রত্যেকে ট্রোলিংয়ের পাশাপাশি একটা বিষয় নিয়ে সচেতনতা প্রকাশ করেছেন ৷ আর তা হল মানসিক স্বাস্থ্য ৷ প্রতিনিয়ত সোশাল মিডিয়ায় পাতায় যদি আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে মন ভালো থাকে কী করে ৷ আবার এই সোশাল মিডিয়াতেই এমন অনেকে আছেন, যারা পজিটিভ থাকারও বার্তা দেন ৷ এক্ষেত্রে একজন তারকার সোশাল মিডিয়ায় কীভাবে নিযুক্ত রাখা উচিত ? এই বিষয়ে পথ দেখিয়েছেন অভিনেত্রী, নৃত্যশিল্পী তথা মনোবিদ সন্দীপ্তা সেন ৷ তিনি ইটিভি ভারতকে বলেন, "এখন সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ। মানুষ নিজের কাজ সামনে আনে সবার। এই ট্রেন্ড বন্ধ করা খুব কঠিন। আর এরই সঙ্গে ট্রোলিং কালচারও বন্ধ করা কঠিন। যারা করার তারা করবেই। তাই কে কী বলছে সেদিকে পাত্তা না দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। অন্যকে বডি শেমিং করা একটা বড় রোগ মানুষের । এদের তাই ইগনোর করাই ভালো । যারা এগুলো করে তারা আসলে নিজেদের ইগো বুস্ট করে, আর কিছুই না।"