'বিশ সাল বাদ' নয়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কোন ছবি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন মহানায়ক?
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কাজের প্রস্তাব ফিরিয়েছেন উত্তম কুমার। পরে সেই ছবির অফার নাকি যায় বিশ্বজিতের কাছে। মহানায়কের জন্মশতবর্ষে আসল সত্যিটা জানালেন বিশ্বজিৎ। শুনলেন নবনীতা দত্তগুপ্ত ।

By ETV Bharat Entertainment Team
Published : September 2, 2026 at 4:56 PM IST
কলকাতা, 2 সেপ্টেম্বর: হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (Hemanta Mukhopadhyay) প্রযোজিত বীরেন নাগ পরিচালিত সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার 'বিশ সাল বাদ' (Bees Saal Baad) ছবিতে কুমার বিজয় সিং-এর চরিত্রটি নাকি প্রথমে করার কথা ছিল মহানায়ক উত্তম কুমারের (Uttam Kumar)। মহানায়ক হেমন্ত কুমার (মুখোপাধ্যায়)-কে ফিরিয়ে দেওয়ার পরই নাকি সেই ছবির অফার যায় আরেক বঙ্গতনয় বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের (Biswajit Chatterjee) কাছে। এরপর তিনিই চরিত্রটি করেন এবং ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এমন কথা লোকমুখে প্রচারিত। কথাগুলো কানে গিয়েছে খোদ বিশ্বজিতেরও। লোকমুখে প্রচারিত সেই কথা ইটিভি ভারতের তরফে তাঁর কাছে প্রশ্ন হিসেবে তোলা হলে তিনি বলেন, "এই তথ্য সম্পূর্ণ ভুল।"
তিনি বলেন, "বিশ সাল বাদ-এর জন্য হেমন্ত মুখোপাধ্যায় শুরু থেকে এই বিশ্বজিৎকে চট্টোপাধ্যায়কেই ভেবেছিলেন। বরং 'শর্মিলি' ছবির জন্য প্রথম অফার যায় মহানায়কের কাছে। তিনি সেটা ফিরিয়ে দেন। এরপর এই নিয়ে বেশ মনোমালিন্য হয় হেমন্ত দা এবং উত্তম দা'র মধ্যে। বিশ সাল বাদ নিয়ে বহু লোকের মনের মধ্যে এই একটা ভুল ধারণা বসে আছে। অনেকে মনে করেন, উত্তম দা 'বিশ সাল বাদ' করতে রাজি না হওয়ার জন্য আমি ছবিটা করি। এটা একদমই সত্যি নয়। একদিন হেমন্ত দা রংমহলে এসে আমাকে ব্যাকস্টেজে নিয়ে গিয়ে বলেন, বিশ্বজিৎ তোমাকে বম্বে যেতে হবে। আমি তোমাকে হিরো হিসেবে চাই এই ছবিতে। এরপর কাজটা আমি করি সবাই জানেন। আমার 'বিশ সাল বাদ' সাফল্য পাওয়ার পরে হেমন্ত দা উত্তম কুমারকে নিয়ে অন্য একটা ছবির প্ল্যান করেছিলেন। সেটা হল 'শর্মিলি'।"
অভিনেতা আরও বলেন, "ওয়াহিদা রহমানের বিপরীতে অভিনয় করতে হত উত্তম দা'কে। সেটা নিয়েও উত্তম দা'র সঙ্গে হেমন্ত দা'র মনোমালিন্য হয়। হেমন্ত দা বারবার বলা সত্ত্বেও উত্তম দা সেই ছবি করেননি। বড় ভুল করেছিলেন সেদিন। 2 বছর ধরে লেখা হয়েছিল ছবিটার স্ক্রিপ্ট। কী বিউটিফুল স্ক্রিপ্ট ছিল। একটি ইংরেজি ছবির দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল সেই ছবি। এমনকী রাজ কাপুরের 'সঙ্গম' ছবির অফারও ফিরিয়ে দেন উত্তম দা। বদলে করেন নায়িকাপ্রধান একটা ছবি বৈজয়ন্তিমালার সঙ্গে। ওই। ছবিটার জন্য ওনার হার্ট অ্যাটাকও হয়। অত প্রেশার নিতে পারেননি দাদা। নানা কারণে শরীরের অবহেলা করেন তখন। বিছানাতে শুয়েও অনিয়ম কমাননি শরীরের। এসব না হলে হয়তো উত্তম দা'কে এত তাড়াতাড়ি হারাতাম না আমরা। আমি একে আত্মহত্যাই বলব।"
বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, "মুম্বইয়ের এসব অফার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আমার সঙ্গেও মনোমালিন্য হয়েছে ওনার। একবার ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে আমি মুখের উপর এই নিয়ে দাদাকে অনেক কড়া কড়া কথা বকেছিলাম। কেননা ছোট ভাই হিসেবে আমার সেই অধিকার ছিল বলেই আমি জানতাম। সেদিন বেণু (সুপ্রিয়া চৌধুরী) আমাকে বলেছিল, 'বিশু তুই ছাড়া এই কথাগুলো কেউ বলতে পারত না তোদের দাদাকে।' দাদা সেদিন চুপ ছিলেন। একটা কথাও বলেননি। আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো ভালোবাসতেন উত্তম দা। দাদাকে মন থেকে ভালোবাসি বলেই বলেছিলাম সেদিন কথাগুলো। দাদার ভালো চাইতাম। দাদার ভালো হওয়ার মানে ছিল সারা বাংলার ভালো হওয়া।" অভিনেতা জানান, "উনি চিরকালের নায়ক। চির নতুন। উত্তম কুমার অমর, চিরসবুজ। উনি যা যা করে গেছেন তা আর কেউ পারবেন না। উনি ক্ষণজন্মা। ওনার আর জন্ম হয়েছে বলে মনে হয় না।"
স্মৃতির সরণী বেয়ে বিশ্বজিৎ বলতে থাকেন, "3 সেপ্টেম্বর দাদার জন্মশতবর্ষ। আমার ভীষণ মনে পড়ছে ওনার কথা। উনি আমার দাদার মতো ছিলেন। ওনাকে কী করে ভুলি। আজ সারা বাংলা জুড়ে ওনার জন্মশতবর্ষ পালিত হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও আর্টিস্ট ফোরাম দারুণ সব উদ্যোগ নিয়েছে জানতে পারলাম। দাদার জন্য আমি গর্বিত। ওনার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সবারই জানা। সেই নিয়ে আর নতুন কিছু বলতে চাইছি না। আমার ফিল্মি কেরিয়ারে আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন, গাইড করেছেন উনি। বহু সময় অনেক অপ্রিয় কথাও আমি মুখের উপর বলে ফেলেছি। মনে করতাম এই অধিকারটা আমার আছে। উনি চুপ করে মেনে নিতেন। কেননা আমাকে ছোট ভাই হিসবেই দেখতেন। বুড়ো (তরুণ কুমার) আর পেন্টু (বরুণ কুমার)-র থেকে আলাদা চোখে আমাকে দেখেননি কখনও। নানা সময়ে অনেক অনুরোধ করেছি, না করেননি। ওনার বাবা-মা সবাই আমাকে ভালোবাসতেন। আমার খবর নিতেন। বরুণ ফিল্মের লোক দেখলেই পালিয়ে যেত। আর তরুণ কুমার ছিল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।"
মনে করিয়ে দিই, 'বিশ সাল বাদ' বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায় অভিনীত প্রথম হিন্দি ছবি। এই ছবির পর থেকেই মুম্বইতে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করে নিয়েছিলেন তিনি। আজ মহানায়কের জন্মশতবর্ষের প্রাক্কালে সেই ছবি নিয়ে মানুষের মনে লালিত হওয়া সেই ভুলভ্রান্তি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করলেন বিশ্বজিৎ স্বয়ং।

