অসুস্থ মানসিকতার লোকেদের পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই ! ডোনার পাশে বাংলার শিল্পীমহল
ট্রোলিংয়ের বিরুদ্ধে ডোনা গঙ্গোপাধ্যায় ইতিমধ্যে অভিযোগ করেছেন ৷ তার তদন্ত শুরু করেছে ঠাকুরপুকুর থানার পুলিশ ।

By ETV Bharat Entertainment Team
Published : November 30, 2025 at 6:22 PM IST
কলকাতা, 30 নভেম্বর: ওরা অসুস্থ মানসিকতার, ওরা নিজেদের ইগো বুস্ট করতে আসে । পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই । ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়কে ট্রোলিং-এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন বাংলার শিল্পীমহল ।
কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের প্রথম ও শেষদিনে নৃত্য পরিবেশন করেছিলেন ডোনা গঙ্গোপাধ্যায় এবং তাঁর নৃত্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান 'দীক্ষামঞ্জরী'র ছাত্রছাত্রীরা । মঞ্চে সকলের মন কেড়ে নেয় সেই পারফরম্যান্স । কিন্তু সোশাল মিডিয়ার নাগরিকরা তো কোনও বিষয়ে চুপটি করে বসে থাকার নয় । বাক স্বাধীনতা সকলের আছে ৷ তাই সেই অধিকারকে কাজে লাগিয়ে ভালো-মন্দ দুই ধরনের বক্তব্য পেশ করতে বিলম্ব নেই তাদের । বলা ভালো, প্রশংসার থেকে নিন্দা করতেই তারা বেশি অভ্যস্ত । আর সেই অভ্যাসমতোই মঞ্চে ডোনার পারফরম্যান্স নিয়ে কটূক্তি শুরু হয় তাদের ।

ডোনার বডিশেমিং
ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়কে বডিশেমিং করতে দেখা গিয়েছে কয়েকজনকে । অনেকে তো এমনও লিখেছে যে, 'ওড়িশি নাচের নাম করে লোক ঠকাচ্ছেন ডোনা' । তাঁর নাচের ধরন, কোরিওগ্রাফি, শরীরের গড়ন-সব কিছু নিয়েই শুরু হয় ট্রোলিং । ট্রোলিং রুখতে এরপর পুলিশের দ্বারস্থ হন সৌরভ-জায়া ডোনা । এফআইআরও করেন । জানা গিয়েছে, ইতিমধ্যেই তদন্তে নেমেছে ঠাকুরপুকুর থানার পুলিশ ।

ডোনার অভিযোগ অনুযায়ী, গত 45 বছর ধরে তিনি ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্য অভ্যাস ও অনুষ্ঠান করছেন । নাচ তাঁর আবেগের জায়গা । তারপর সেটা পেশা । সারা বিশ্বজুড়ে ওড়িশি নৃত্যের অনুষ্ঠান করেন তিনি । দেশে-বিদেশে নানা বয়সের প্রচুর ছাত্রছাত্রীও আছে তাঁর । এই ধরনের বিদ্রুপে তাঁর সম্মানহানি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ডোনা । আর ডোনার এহেন সম্মানহানি ভালো চোখে দেখছেন না বাংলার অন্যান্য নৃত্যশিল্পীরাও ।

ডোনার পাশে নৃত্যশিল্পীরা
নৃত্যশিল্পী তথা অভিনেত্রী ইন্দ্রাণী দত্ত ইটিভি ভারতকে বলেন, "যাঁরা ওপারে বসে লেখে, তারা লিখেই দেয় আর কী । সেটা কারওকে কতটা দুঃখ দেয় সেটাও ভাবে না । অবশ্য তারা এটাও বলে যে তা হলে কী আমাদের কোনও বাক স্বাধীনতা থাকবে না ? বলার মধ্যেও যদি একটু আব্রু থাকে তা হলে সেটা ভালো হয় । আমরা অনেক সময় অনেক কিছু খারাপ লাগলেও কি মুখের উপর বলতে পারি ? সেটা বলার মধ্যেও তো একটা শালীনতা থাকবে ? আমি শুনছি ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়কে কটাক্ষ করা হচ্ছে । এই বিষয়গুলো নিয়ে জানতেও ইচ্ছা করে না । কারণ এই কোপ আমার উপরেও আসতে পারে যখন তখন । সাবধানতা, সততা, মানুষের যাতে ভালো লাগাকে মাথায় রেখে কাজ করি । মানুষের কথাকেও স্পোর্টিংলি নেওয়ার অভ্যাস আছে, কিন্তু কেউ যদি খারাপভাবে লেখে তাতে তো খারাপ লাগেই ।"

কী বলছেন মনোবিদ
অভিনেত্রী, নৃত্যশিল্পী তথা মনোবিদ সন্দীপ্তা সেনের মতামত জানতে চায় ইটিভি ভারত । তিনি বলেন, "সামাজিক মাধ্যমের যুগে এই কালচার বন্ধ করা খুব কঠিন । তাই পাত্তা না দেওয়াই শ্রেয় বলে মনে হয় আমার । বডি শেমিং করা একটা বড় রোগ মানুষের । রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে মানুষের । এই রোগ তাড়ানো সম্ভব না । তাই ইগনোর করাই ভালো। উনি এফআইআর করে ভালোই করেছেন । যারা এগুলো করে তারা আসলে নিজেদের ইগো বুস্ট করে, আর কিছুই না ।"

তিনি আরও বলেন, "একজন ক্লাসিকাল ডান্সারকেও বাদ দিচ্ছে না ওরা । ভাবা যায়? সোশাল মিডিয়াতে নৃত্যশৈলি দেখাতে এসে কটাক্ষের শিকার হওয়া তো প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। কোনও বাজে কথা বলতেও ছাড়ছে না । সোশাল মিডিয়ার এটা ট্রেন্ড এখন, যাকে যা পারবে বলে দাও । সেই আগেকার পাড়া কালচার মনে পড়ে? জিনস পরে বেরোলেও মাকে শুনতে হত । আমি পাড়ায় ক্রিকেট ফুটবল সব খেলেছি ছেলেদের সঙ্গে । তা নিয়েও আমার মাকে কম শুনতে হয়েছে কথা ! কিন্তু মা বলত যে, যত বলবে তত ওটাই করবি । মা-বাবা এত সাপোর্ট করত আমায় তাতে আমার আরও মজা হত ।"
বয়স বাধা নয়
নৃত্যশিল্পী তথা অভিনেত্রী সায়ন্তনী মল্লিক বলেন, "কেউ মোটা হয়েও যদি নিজের ফিটনেস ধরে রেখে পারফর্ম করে তাতে কার কী ? কেউ আশি বছরের বৃদ্ধা হয়েও যদি স্টেপ আর মুদ্রা সঠিকভাবে তুলে ধরেন তাতে কার কী অসুবিধা? এখানে বয়স আর চেহারার থেকেও অনেক বেশি জরুরি একজন শিল্পীর নৃত্যশৈলি ।"

সায়ন্তনী নিজের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে বলেন, "আমার নিশ্চয়ই দেড়শো বছর বয়স নয় । কিন্তু আমাকে মানুষ সেরকমই ভাবে । কেন না শেষ কাজটা যেটা করলাম, অর্থাৎ 'অনুরাগের ছোঁয়া' ধারাবাহিকটা যেহেতু চার বছর ধরে চলেছে তাতে আমার অনেকগুলো বয়স দেখানো হয়েছে । গল্পের নিয়ম অনুসারে আমাকে ঠাকুমা হিসেবেও দেখানো হয়েছে । এর পাশাপাশি আমি যখনই নাচের রিল পোস্ট করেছি আমাকে শুনতে হয়েছে, এই বুড়িটা এখনও নেচে বেড়াচ্ছে, এই বুড়িটার ন্যাকামোর শেষ নেই ।"

তাঁর কথায়, "এমনও লেখা হয়েছে যে, এই তো দু'দিন আগে মরতে বসেছিল, আর এখন আবার ধেই ধেই করে নাচছে । আরে আমার যদি একশো বছরও বয়স হয়, আমি যদি ফিট থাকি আমি কেন নাচব না? কোথায় লেখা আছে যে 16 বছর বয়সের পর আর নাচা যাবে না? চান্দ্রেয়ী ঘোষের মা এই বয়সেও কী সুন্দর নাচেন ! এ কথা কারওর অজানা নয় । আমার ওনাকে শতকোটি বার প্রণাম করতে ইচ্ছা করে । এই বয়সেও যে উনি এটা করতে পারছেন তার জন্য ওনাকে হ্যাটস অফ । ওনার ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাওয়া উচিত ।"

সায়ন্তনী আরও বলেন, "যাদের কমেন্ট আসে তাদের বেশিরভাগেরই ফেক প্রোফাইল । আমার মনে হয় ডোনা দি'র এদের পাত্তা দেওয়া উচিত না । এরা অসুস্থ মানসিকতার । এদের পাত্তা দেওয়াই উচিত না । এটা ভেবেই এদের ক্ষমা করে দেওয়া উচিত । আমি ডোনা দি'র নাচ যতবার দেখেছি আমার অসাধারণ লেগেছে । তবে হ্যাঁ, একটা কথাও, ঠিক নতুন প্রজন্মকে অবশ্যই তৈরি করা উচিত । কিন্তু কেউ বয়স বাড়লেও যদি পারেন তা হলে কেন নাচবেন না তিনি? এতে কার কী? অনেককে অবশ্য এমনও দেখেছি টানতে পারছেন না তাও ছাড়ছেন না । কিন্তু ডোনা দি'র ক্ষেত্রে তো তেমনটা নয় । উনি দিব্যি সৌকর্যের সঙ্গে নাচ চালিয়ে যাচ্ছেন আজও । রইল পড়ে ফিগার । বডি শেমিং-এক বড় অপরাধ । কোন আইনে লেখা আছে ওজন বাড়লে নাচা যায় না?"

