'কোন ধর্মে বলা আছে অন্য ধর্মের মানুষকে মারলে'- স্পষ্ট বার্তা আরমানের
আরমানের কথায়, "আমার এক সঙ্গী সিরাজ, ভারতীয় হয়ে ওকে বলতে হয়েছে সে বাংলাদেশি। নিজের পরিচয় লুকিয়ে ফিরতে হচ্ছে ওখান থেকে! এর থেকে লজ্জার কী আছে?"

By ETV Bharat Entertainment Team
Published : December 27, 2025 at 12:32 PM IST
কলকাতা, 27 ডিসেম্বর: বাংলাদেশে আর কখনও গান গাইতে যাবেন না উস্তাদ রশিদ খানের পুত্র তথা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পী আরমান খান (Armaan Khan)। এই সিদ্ধান্তে তিনি চিরকাল অনড় থাকবেন। জীবনে কখনও যদি শো নাও থাকে তা হলেও যাবেন না বাংলাদেশ। ইটিভি ভারতের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে দাবি আরমানের।
9 দিনের সফরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে গানের তিনটি অনুষ্ঠান করার কথা ছিল তাঁর। কট্টর মৌলবাদের জেরে পদ্মার ওপারে মানবতা থেকে শিল্প-সংস্কৃতি-সঙ্গীত যেভাবে আক্রান্ত হচ্ছে, তাতে ওই দেশে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আরমান। জীবনে কোনওদিন একটি টাকাও ওই দেশ থেকে রোজগার করবেন না তিনি। বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলায় তাঁকে সেখানকার মুসলিমরা ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করার হুমকি দিচ্ছে, মা এবং দিদিদেরও কটাক্ষ করতে ছাড়ছে না সোশালে- জানালেন আরমান।
তিনি বলেন, "আমি এই মুহূর্তে আমার দেশে নিরাপদ। আমার এক সঙ্গী সিরাজ কীভাবে বাংলাদেশ থেকে ফিরে এসেছে তা সে-ই জানে। ভারতীয় হয়ে ওকে বলতে হয়েছে সে বাংলাদেশি। নিজের পরিচয় লুকিয়ে ফিরতে হচ্ছে ওখান থেকে! এর থেকে লজ্জার কী আছে আর? আমি বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলেছি বলে আমাকে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করতে বলছে ওই দেশের মুসলিম ভাইয়েরা। কেন করব? বাবা, দাদুর পদবী, ধর্ম কেন আমি ত্যাগ করব? আমি কয়েকজন মুসলিম ভাইয়ের জন্য সব মুসলিম ভাইকে খারাপের দলে ঠেলে দেব না কখনও।"
বাংলাদেশের এহেন পরিস্থিতির কারণ একমাত্র রাজনৈতিক বলে মনে করেন আরমান। তাঁর মতে, "কিছু মানুষ রাজনীতিকদের দ্বারা প্রভাবিত। তারাই এগুলো ঘটাচ্ছে। যারা এই ধংসলীলা চালাচ্ছে তারা আসল মুসলমাম নয়। কোরানে মানুষকে মারতে বলা হয়নি। একইভাবে গীতাতেও বলা নেই মানুষকে মারো। কোন ধর্মে বলা আছে যে অন্য ধর্মের মানুষকে মারলে তোমার ধর্ম উঁচুতে থাকবে?" প্রশ্ন তোলেন আরমান।
তাঁর প্রশ্ন, "যারা এই মারণলীলায় মেতেছে তারা কি টাকা পাচ্ছে এর জন্য? কেউ কি বাংলাদেশের আম্বানি হয়ে গিয়েছে এই হিংসা ছড়িয়ে? আমার জানতে ইচ্ছে করে খুব। আমেরিকাতে পবিত্র কোরানের উপরে শূকরের মাথা কেটে রাখা হল। কই প্রতিবাদ হল না তো? শূকড় তো মুসলমানের কাছে 'হারাম'। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানের কোনও মুসলমান তো সেদিন গর্জে উঠল না?"
আরমান কতটা বিরক্ত তা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট। এ দেশের নানা হিংসার কথাও বলতে ভোলেন না তিনি। বলেন, "ওড়িশাতে কিছু মানুষ সান্তার টুপি বিক্রি করছিল। তাদের মারা হল, দোকান জ্বালিয়ে দেওয়া হল। কেন? ওরা তো রোজগারের জন্য করছিল বিক্রি। এতে ধর্ম সংকট কোথায় আসছে? কোন ধর্মে বলা আছে অন্য ধর্মকে অপমান করলে নিজের ধর্ম শিখরে।থাকবে?" আরমান আরও স্মৃতি উসকে দিয়ে বলেন, "দিল্লিতে কেন রেস্টলারদের মারা হল? ওরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলে? যারা দেশকে এগিয়ে দিচ্ছে তাদের মারা হচ্ছে আমাদের দেশে, আর যারা দেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে তাদের মাথায় তুলে রাখা হচ্ছে। বাঃ!"
আরমানকে খানিক শান্ত করে তাঁর প্রথম মঞ্চে গান গাওয়ার স্মৃতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, "তখন আমার বয়স দুই কি তিন। জোর করে বাবার সঙ্গে মঞ্চে উঠে যাই গান গাইব। একা একাই মাইকে সা... বলে সুর ধরি। এরপর বাবা যখন গান শুরু করে আমি বাবার পিঠে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ওটাই আমার প্রথম স্টেজ শো। (সহাস্যে) আর বাবা তান ধরলেই আমি কাঁদতাম। নজরুল মঞ্চের একটা অনুষ্ঠানে গাইতে গিয়ে বাবা তান ধরেছিল, আর আমি কেঁদে যে কাণ্ডটা ঘটাই আজও ভাবলে...। মা সবার কাছে ক্ষমা চেয়েছিল সেদিন।"
আরমান বলেন, "বাবা সবসময় বলত, নিজের মাটিকে ভুলো না কোনওদিন। আর গানবাজনাকে ধোকা দিও না। গানবাজনা আমাদের কাছে পুজো। তাকে ধোকা দিলে সে তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে। আর বাংলাদেশে বাদ্যযন্ত্রকে মাটিতে ফেলে আছড়ে ভেঙে ফেলা হল, ছায়ানটকে পুড়িয়ে দেওয়া হল। বাদ্যযন্ত্র দেবী সরস্বতীর জিনিস। তাকে অপমান করার অধিকার কারওর নেই।" অনেক কম বয়স থেকেই সঙ্গীত সাধনা করেন আরমান। কিন্তু মঞ্চে গান গাওয়ার জন্য বাবা উস্তাদ রশিদ খানের কাছ থেকে অনুমতি মিলেছে আঠেরো পেরনোর পর। আরমান বলেন, "বাবার কাছে তাঁর শিষ্যরা আগে। তাঁরা আমার অনেক আগে থেকে তালিম নিয়েছেন বাবার কাছে।"
সাক্ষাৎকারে নিজের দেশের পিছিয়ে পড়ার প্রসঙ্গও তোলেন আরমান। রাজনৈতিক দলাদলিতে পিছিয়ে যাচ্ছে রাজ্য তথা দেশ। বাংলার সংস্কৃতিও আজ বিপদে। বিভিন্ন জায়গায় শিল্পীরা আক্রান্ত। তাঁদের 'সেকুলার' গাইতে বলা হচ্ছে। দুঃখ প্রকাশ করে আরমান বলেন, "আমি সব শিল্পীদের পাশে আছি। আজকাল কেউ উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শুনতে চায় না। বিলিতি গানের ভক্ত। আচ্ছা, বিলিতি গানে সাধনা নেই? সুর নেই?" কথা প্রসঙ্গে ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত, দেবজ্যোতি মিশ্র, সঞ্জয় লীলা বনশালী, বিশাল মিশ্র, প্রীতম, অরিজিৎ সিংয়ের প্রতি অনুরাগের কথা জানান তিনি। এঁদের সাধনার তারিফ করেন আরমান।

