ETV Bharat / business

পণ্য রফতানিতে পূর্ব ভারতে শীর্ষে বাংলা, আমূল বদল রাজ্যের অর্থনীতিতে

রাজ্যের জন্য বড়সড় সুখবর নিয়ে এল খোদ কেন্দ্রীয় সরকারের একটি পরিসংখ্যান। গত এক বছরে বাংলার পণ্য পরিবহণ ও রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় 11 শতাংশ।

Bengal Exports
পণ্য রফতানিতে পূর্ব ভারতে শীর্ষে বাংলা (ছবি: আইএএনএস)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : March 4, 2026 at 5:18 PM IST

4 Min Read
Choose ETV Bharat

কলকাতা, 4 মার্চ: মাঝে আর মাত্র কয়েকটা দিন। তারপরেই রাজ্যে বেজে যাবে হাইভোল্টেজ বিধানসভা নির্বাচনের দামামা। আর এই মেগা ভোটের ঠিক মুখেই রাজ্যের শাসকদলের জন্য বড়সড় সুখবর নিয়ে এল খোদ কেন্দ্রীয় সরকারের একটি পরিসংখ্যান। 2024-25 অর্থবর্ষের (FY25) পণ্য রফতানি বা মার্চেন্ডাইজ এক্সপোর্টের নিরিখে পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে এক নম্বর স্থানে উঠে এল বাংলা। পূর্ব ভারতের অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্যে যেখানে পণ্য রফতানির গ্রাফ নিম্নমুখী, সেখানে গত এক বছরে বাংলার পণ্য পরিবহণ ও রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় 11 শতাংশ। এই প্রসঙ্গে রাজ্য সরকারের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে রাজ্যের অর্থনীতি সাম্প্রতিক সময় আমূল বদলে গিয়েছে।

কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের (Ministry of Commerce and Industry) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবর্ষে পূর্ব ভারত থেকে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলা অন্যান্য রাজ্যগুলিকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ থেকে মোট পণ্য রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে 1 লক্ষ 7 হাজার কোটি টাকা। ঠিক এর উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে পূর্ব ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলি। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বিজেপি শাসিত ওড়িশা এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে বিহার। আশ্চর্যের বিষয় হল, এই ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যগুলির পণ্য রফতানির পরিমাণ গতবারের তুলনায় বেশ খানিকটা কমে গিয়েছে, যা বিধানসভা ভোটের আগে বাংলার শাসকদলকে রাজনৈতিক প্রচারের ময়দানে বাড়তি সুবিধা করে দিচ্ছে।

​পরিসংখ্যানের দিকে আরও গভীরে নজর রাখলে দেখা যায়, খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ওড়িশার পণ্য রফতানির পরিমাণ বর্তমানে 85,000 কোটি টাকা। গতবারের তুলনায় তাদের সামগ্রিক রফতানি কমেছে প্রায় 13.5 শতাংশ। অন্যদিকে, বিহারের রফতানির পরিমাণ মাত্র 18,091 কোটি টাকা, যার গ্রাফ গতবারের চেয়ে 10 থেকে 11 শতাংশ নিম্নমুখী। তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে ঝাড়খণ্ড, যাদের মোট রফতানির পরিমাণ 16,357 কোটি টাকা। এই সামগ্রিক পরিস্থিতির নিরিখেই রাজ্যের ওই সরকারি আধিকারিক দাবি করেছেন যে, বিরোধীরা রাজ্যে শিল্প না থাকার যে অভিযোগ তোলেন, এই কেন্দ্রীয় তথ্য তাকে কার্যত নস্যাৎ করে দিয়ে প্রমাণ করছে যে রাজ্যের অর্থনীতি অনেকটাই মজবুত হয়েছে।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলার এই বিপুল সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে বৈচিত্র্যময় পণ্য সম্ভার। প্রতিবেশী রাজ্যগুলি মূলত কয়লা, লোহা বা মাইকার মতো খনিজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল হলেও, বাংলা একাধিক ক্ষেত্রে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছে। কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ক্ষেত্রে রাজ্য থেকে বিপুল পরিমাণে বাসমতি ও অ-বাসমতি চাল বাংলাদেশ, নেপাল, ভিয়েতনাম-সহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। এর পাশাপাশি, বিশ্ববন্দিত দার্জিলিং চা, সামুদ্রিক খাবার বা মেরিন প্রোডাক্টস, আম এবং লিচুর মতো ফল রফতানিতেও বাংলা শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এই বৈচিত্র্যই রাজ্যের অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছে।

​কৃষিজ পণ্যের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী শিল্প এবং হস্তশিল্পও রফতানি বৃদ্ধিতে বিশাল ভূমিকা নিয়েছে। জুট বা পাট শিল্প এবং চামড়াজাত পণ্য রফতানিতেও রাজ্যের অবদান অনস্বীকার্য। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব জুট ব্যাগ এবং বাংলার নিজস্ব সুতি ও সিল্কের তৈরি পোশাকের চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েই চলেছে। বাংলার হস্তশিল্প, বিশেষ করে বাঁকুড়ার টেরাকোটা, ডোকরা শিল্প, মাটির পাত্র এবং বেত ও বাঁশের তৈরি নানা ধরনের সামগ্রী বিদেশের বাজারে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এমনকি আয়ুর্বেদিক এবং ভেষজ সামগ্রীও এখন বাংলা থেকে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে বিপুল পরিমাণে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিধানসভা ভোটের আগে এই পরিসংখ্যান রাজ্যের শাসকদলের জন্য আক্ষরিক অর্থেই একটি তুরুপের তাস হিসেবে কাজ করতে পারে। বিরোধী শিবির গত কয়েক বছর ধরে বারবার অভিযোগ করে আসছে যে, রাজ্যে শিল্প নেই, বাণিজ্য নেই, এবং বিনিয়োগকারীরা বাংলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু খোদ কেন্দ্রীয় সরকারের নিজস্ব তথ্যই প্রমাণ করছে যে, পূর্ব ভারতের অন্যান্য বড় রাজ্যগুলির তুলনায় বাংলার বাণিজ্যিক পরিকাঠামো যথেষ্ট ঊর্ধ্বমুখী। আগামী দিনে ভোটের প্রচারে এই খতিয়ানকে হাতিয়ার করে শাসকদল যে বিরোধীদের আক্রমণ ভোঁতা করার চেষ্টা করবে এবং রাজ্যের অর্থনীতির 'আমূল বদল'-এর তত্ত্বকে মানুষের দরবারে তুলে ধরবে, তা এক প্রকার নিশ্চিত।