ETV Bharat / bharat

মাত্র 30 সেকেন্ড ! আকাশ থেকে আছড়ে পড়ল বিভীষিকা, ফিরে দেখা আমেদাবাদ বিমান-দুর্ঘটনা

আকাশে ওড়ার মাত্র 30 সেকেন্ডের মধ্যে ভয়াবহ বিপর্যয় ৷ আমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনার নানদিক খতিয়ে দেখল ইটিভি ভারত ৷

Etv Bharat
Etv Bharat (Etv Bharat)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : December 31, 2025 at 7:00 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

আমেদাবাদে জুন মাসের 12 তারিখের দুপুরটা শুরু হয়েছিল আর পাঁচটা দিনের মতোই, একেবারেই সাধারণভাবে। রোদে ঝলমলে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিবার-পরিজনের ভিড়, শেষ মুহূর্তের আলিঙ্গন, মোবাইলে সেলফি- সবই চেনা দৃশ্য। বিমান ধরার আগের নিতান্তই পরিচিত স্বাভাবিক ঘটনাক্রম। কেউ বিলেত যাচ্ছেন পড়াশোনার জন্যে ৷ কেউ যাচ্ছেন কাজের সূত্রে ৷ কেউ বা নতুন জীবনের শুরু করতে। কিন্তু, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই বিদায়ের স্বাভাবিক ছবি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। টানা বেজে চলা ফোনের ঘণ্টা, ভেসে আসা খবর, আর এক নিমেষে উল্টেপাল্টে যাওয়া বহু জীবন- সবমিলিয়ে এক দুঃস্বপ্ন, যার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই !

2025 সালের 12 জুন, দুপুর 1টা 38 মিনিটে এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং 787 ড্রিমলাইনার, ফ্লাইট নম্বর AI171, আহমেদাবাদ থেকে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। রানওয়ের উপর দিয়ে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে গিয়ে টেকঅফের পর আকাশে ওড়ার মাত্র 30 সেকেন্ডের মধ্যে সেই পাল্টে যায় এক ভয়াবহ বিপর্যয়ে।

ahmedabad plane crash
ভয়াবহ বিপর্যয়ের নানা মুহূর্ত (ফাইল চিত্র)

প্রত্যক্ষদর্শীরা পরে জানিয়েছিলেন, রানওয়ে ছেড়ে বিমানটি আকাশে ওড়ার পরই হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে আসে ৷ তারপরই একটা ভয়ালো আগুনের গোলা দেখা যায় আকাশে। বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে এলাকা। ততক্ষণে ফ্লাইট AI171 মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়ার বদলে আছড়ে পড়েছে বিমানবন্দরের পাশে মেঘানি নগরের বিজে মেডিক্যাল কলেজের হস্টেল ব্লকে। কলেজে তখন বিরতির সময়, হোস্টেলের ছাত্রছাত্রীরা দুপুরের খাবারের জন্যে হস্টেলের ডাইনিং হলে জড়ো হয়েছিলেন।

বিমানে থাকা 242 জনের মধ্যে 241 জনেরই মৃত্যু হয়। অলৌকিক ভাবে বেঁচে যান একজন। নিচে, যেখানে বিমানটি আছড়ে পরে, সেখানে থাকা আরও 19 জন প্রাণ হারান। মুহূর্তে কংক্রিট, লোহার টুকরো, পোড়া প্লাষ্টিক আর জ্বালানির কটু গন্ধে ঢেকে যায় এলাকা। উদ্ধারকর্মীদের জন্যেও বাতাস ভারী হয়ে ওঠে ওই গন্ধে। আর স্বজনহারা পরিবারগুলোর কাছে, সেই সময়টা ভয়ের, আতঙ্কেরস অবিশ্বাসের অন্তহীন অধ্যায় ৷

ahmedabad plane crash
চলছে আগুন নৈভানোর কাজ (ফাইল চিত্র)

রাখে হরি মারে কে !

দুর্ঘটনার পরের মুহূর্তগুলো ছিল বিশৃঙ্খল-ভয়ঙ্কর। স্থানীয় পুলিশ, কলেজের ছাত্রছাত্রী-কর্মী, বিমানবন্দরের জরুরি পরিষেবার কাজে থাকা আধিকারিক এবং স্বেচ্ছাসেবীরা ছুটে আসেন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের তাপমাত্রা ছিল হাজার ডিগ্রিরও বেশি, যা উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তোলে। তড়িঘড়ি নিয়ে আসা হয় ক্রেন, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে প্রাণের আশায় কাজে লাগানো হয় স্নিফার ডগ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আহমেদাবাদের একাধিক হাসপাতালে মৃত ও আহতদের নিয়ে আসতে থাকে পরের পর অ্যাম্বুলেন্স।

এই বিভীষিকার আবহেই লেখা হয় জীবনের এক অসম্ভব জয়গাঁধা ৷ 40 বছরের ব্রিটিশ নাগরিক বিশ্বাস কুমার রমেশ ৷ বিমানের 11A আসনের যাত্রী ৷ আহত হলেও বেঁচে বেরিয়ে আসেন। বিমানের একটি অংশ ভেঙে হস্টেলের নিচতলার করিডরে পড়েছিল। ওই অংশেই ছিল একটি আপৎকালীন দরজা ৷ সেটা ভেঙে যাওয়ায়, ধোঁয়া আর আগুনের হল্কার মাঝে রমেশ কোনক্রমে বাইরে বেরোতে সক্ষম হন রমেশ।

ahmedabad plane crash
বিমান দুর্ঘটনা সবমিলিয়ে এক দুঃস্বপ্ন, যার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই (ফাইল চিত্র)

মানুষ যখন শুধুই সংখ্যা !

পরবর্তী দিনগুলোয় সংখ্যাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বাস্তব ঠিক কতটা নির্মম মোট 260 জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেন তদন্তকারীরা ৷ বিমানের 241 জনের পাশাপাশি মাটিতে থাকা 19 জনও প্রয়াত হন। আগুনে এমনভাবে পুড়ে গিয়েছিল শরীরগুলি যা দেখে চিহ্নিত করার কাজ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যে নমুনা দিতে পরিবারগুলিকে ডাকা হয় অস্থায়ী ফরেনসিক কেন্দ্রে। লাইনে দাঁড়িয়ে, ফর্ম হাতে বিশেষজ্ঞদের হাতে তুলে দিতে হয় নিজের সন্তানের শেষ পরিচয়ের সূত্র।

হাসপাতালের করিডরে অপেক্ষরত বাবা-মা থেকে অন্য আত্মীয় স্বজন এবং পরিচিতরা ৷ তাঁদের ছায়ার সঙ্গে মিশে গিয়েছে হতাশা আর বিষাদ ৷ এক হাতে প্রিয়জনের ছবি ৷ অন্য হাতে পরিচয় লেখা এক টুকরো কাগজ ৷ এই খণ্ড চিত্রই দুর্ঘটনার দুর্ঘটনার প্রতীক। প্রায় এক মাস পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে অধিকাংশের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয় ৷ এরপর প্রয়াতদের শেষ বিদায় জানান আত্মীয়-স্বজনরা ৷ নীরব যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে শেষ হয় সেই পর্ব।

দুর্ঘটনার তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

শোকের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নও উঠতে থাকে। বিমানের 'ব্ল্যাক বক্স' উদ্ধার করে তদন্ত শুরু করে ভারতের এয়ারক্রাফ্ট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (AAIB)। প্রাথমিক রিপোর্টে উঠে আসে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। তার মধ্যে অন্যতম ছিল ওড়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিমানের দুই ইঞ্জিনের ফুয়েল কন্ট্রোল সুইচ ‘RUN’ থেকে ‘CUTOFF’-এ চলে যাওয়ার বিষয়টি ৷ ফলে হঠাৎই শক্তি হারিয়ে বিমান নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে আকাশ থেকে দ্রুত মাটিতে নেমে আসে। ককপিটের ভয়েস রেকর্ডেও ধরা পড়ে বিভ্রান্তি, এক পাইলট অন্যজনকে জিজ্ঞেস করছেন তিনি কেন জ্বালানি বন্ধ করা হল, আর অন্যজন তা অস্বীকার করছেন। তবে এই সুইচ কীভাবে সরে গেল, মানুষের ভুলে, যান্ত্রিক ত্রুটির জন্যে না কি অন্য কোনও কারণে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তদন্ত চলছে।

ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা ঘিরে জল্পনা, অভিযোগ, দায় চাপানোর চেষ্টাও কম হয়নি। পাইলটদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, ৷ আবার পাইলটদের সংগঠন সতর্ক করে বলেছে, চটজলদি কোনও সিদ্ধান্তে না আসতে। আন্তর্জাতিক স্তরেও শুরু হয় তদন্ত ৷ কারণ বোয়িং 787 ড্রিমলাইনারের আহমেদাবাদের ক্র্যাশই প্রথম এমন দুর্ঘটনা যাতে মানুষের প্রাণ চলে গিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড, বোয়িং এবং জিই, সব পক্ষই তদন্তে যুক্ত হয়।

ahmedabad plane crash
দুর্ঘটনাস্থল ঘুরে দেখছেন প্রধানমন্ত্রী (ফাইল চিত্র)

এয়ার ইন্ডিয়া দুর্ঘটনার পর দ্রুত একাধিক 787 উড়ান বাতিল করে ৷ অতিরিক্ত পরীক্ষা শুরু হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে দেওয়া হয় আর্থিক সাহায্যও। থেকে যায় একটা মানুষের গল্প যাঁর চওড়া কপাল তাঁকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল এক নিশ্চিত মৃত্যর হাত থেকে ৷ হস্টেলে আটকে পড়া ছাত্রছাত্রীদের সাহস, নির্দেশের অপেক্ষা না করে আহতদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া স্বেচ্ছাসেবীরা, কিংবা আগুনের মাঝে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়া হস্টেলের রাঁধুুনির কথা ভোলা যাবে না সহজে ।

না-ফেরার দেশে !

বছর শেষ ৷ তবু এই দুর্ঘটনাকে ঘিরে এখনও বহু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। তদন্ত চলছে এখনও ৷ কিছু কিছুু অজানা জিনিসের উত্তরও হয়তো জানা যাবে অচিরেই ৷ কিন্তু, যা থেকে যাবে তা হল এক ভয়ঙ্কর-মর্মান্তিক স্মৃতি। থেকে যাবে অনেকগুলো মানুষের ছবি ৷ নামের তালিকা, হাসপাতালের করিডর, ভেঙে পড়া ক্লাসরুম, নিঃশব্দ ক্যান্টিন; সব মিলিয়ে আকাশ থেকে আছড়ে পড়া এক ট্র্যাজেডি যা বহু বছর পরেও মুছে ফেলা যাবে না।