নেই খোলা জায়গা, শহরের পার্ক হয়ে উঠেছে শৈশব-বার্ধক্যের শেষ আশ্রয়
ভারতের অন্য শহরের থেকে পুনের ছবি আলাদা ৷ এখানে পার্ক বাদ দিলে আর কোথাও ছোটদের খেলার সুযোগ নেই, প্রবীণ বা অন্যদের হাঁটার জায়াগা নেই ৷

Published : May 25, 2026 at 5:23 PM IST
|Updated : May 26, 2026 at 9:14 AM IST
ভারতের বিভিন্ন শহরের একাধিক পার্কে গিয়ে পরিকাঠামোর বেহাল দশা চোখে পড়েছে ৷ চোখে পড়েছে প্রশাসনের চরম উদাসীনতার মন খারাপ করে দেওয়া ছবি ৷ কোথাও দোলনা ভাঙা, কোথাও বসার জায়গা মোটেই নিরাপদ নয় ৷ কোথাও সবুজ ঘাসের উপর পড়ে রয়েছে অনেক দিনের ময়লা ৷ তবে এসবের থেকে পুনের ছবিটা একেবারেই আলাদা ৷ এই শহরে পার্ক বাদ দিলে আর কোথাও ছোটদের খেলার সুযোগ নেই, প্রবীণ বা অন্যদের হাঁটার জায়াগা নেই ৷
এখন গরমের ছুটি ৷ ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের অখণ্ড অবসর ৷ তারা এখন দৌড়নোর, খোলা ময়দানে শ্বাস নেওয়ার জায়গা চায় ৷ আর তাই শহরের প্রায় সব পার্কে শুধুই মানুষের মাথার দেখা মিলছে ৷ পার্কের হাঁটার জায়গার দখল প্রবীণদের হাতে, ছোটদের মন স্লিপে-দোলনায় ৷ প্রতিটি সকাল এখন সম্মিলিত কলতানে পরিপূর্ণ ৷ এর অন্যতম মূল কারণ শহরে খোলা ময়দানের সংখ্যা প্রতিদিনই কমছে ৷
পুনে পুরনিগম এলাকায় এখন 216টি পার্ক আছে ৷ তার মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় সরসবাগ, ছত্রপতি সম্ভাজি রাজে গার্ডেন, পেশওয়ে পার্ক, কাটরাজ চিড়িয়াখানা এবং পিএল দেশপান্ডে গার্ডেন । স্কুলে গরমের ছুটি পড়তে না পড়তেই প্রতিটি পার্ক যেন জনঅরণ্য ৷

দেশের অনেক শহরে পরিকাঠামোর অভাব চোখে পড়ার মতো ৷ এখানকার প্রশাসন অবশ্য পরিকাঠামো কবে ভেঙে পড়তে পারে সেই অপেক্ষায় না-থেকে আগে থেকেই কাজ শুরু করে দিয়েছে ৷ পার্কগুলির পরিকাঠামো মোটের উপর ভালো ৷ অবস্থা যাতে কোনওভাবে খারাপ না-হয় তার জন্য রক্ষণাবেক্ষণে জোর দেওয়া হয়েছে ৷ পাশাপাশি যেখানে যেখানে দরকার সেখানে মেরামতির কাজ ফেলে রাখে না পুরনিগম ৷ পার্কের নিকাশি ব্যবস্থার দিকে আলাদা নজর দেয় কর্তৃপক্ষ ৷ প্রতিটি উদ্যান যাতে মানুষের কাজে লাগে তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আগে থেকেই পালন করে রেখেছে পুরনিগম ৷
পুরনিগমের উদ্যান বিভাগের জুনিয়র ইঞ্জিনিয়র হরিশ্চন্দ্র রাউত জানালেন, স্কুলের ছুটি পড়ার পর থেকে ভিড় সামলাতে এখন পার্কের সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ৷ তাঁর কথায়, "প্রায় প্রতিটি পার্কে এখন খুব বেশি ভিড় হচ্ছে ৷ তাই সকলে যাতে পর্যাপ্ত সময় পার্কে থাকতে পারেন এবং নিজেদের ইচ্ছেমতো সময় কাটাতে পারেন তা নিশ্চিত করতে ভোর 6টা থেকে সকাল 11টা পর্যন্ত এবং বিকেল 4টে থেকে রাত 9টা পর্যন্ত পার্কগুলি খোলা রাখা হচ্ছে ৷ রাতে পার্ক বন্ধ হওয়ার পর সাফাইয়ের কাজ শুরু হয় ৷"
পার্কের সবুজ-সম্পদ যাতে সুরক্ষিত থাকে তার জন্য সেচের দিকেও আমরা নজর দিয়েছি ৷ একইসঙ্গে লন এবং গাছের রক্ষণাবেক্ষণও নির্দিষ্ট সময় করে হচ্ছে ৷ শিশুদের জন্য এই পার্কটাই তাদের দুনিয়া ৷ সেখানে তারা নিজেদের মতো আচরণ করতে পারে ৷ খেলায় মেতে উঠতে পারে ৷

শহরের প্রায় প্রতিটি খোলা ময়দান এখন কংক্রিটের জঙ্গল ৷ আর তাই পাড়ার পার্ক ছাড়া অন্য কোথাও খেলার উপায় নেই ছোটদের ৷ আগে বাড়ির কাছে খানিকটা ফাঁকা জায়গা থাকত ৷ সেসব এখন অতীত ৷ পুর কর্তৃপক্ষ বলছে, শিশুদের নিরাপত্তা তাদের কাছে সবচেয়ে জরুরি বিষয় ৷ কোনও বিশেষ মরশুম নয়, সারাবছর ধরেই পার্কে আসা শিশুদের নিরাপত্তার দিকে তারা নজর রাখছে ৷ শিশুদের ব্যবহারে সরঞ্জামের উপর প্রতিনিয়ত নজরদরি চালানো হয় ৷ দরকার পড়লেই করা হয় মেরামতির ব্যবস্থা ৷
হরিশ্চন্দ্র বলেন, "স্কুলে ছুটি থাকলে পার্কে শিশুদের আসা-যাওয়া বাড়ে ৷ আর তাই এসময় আমাদের নজরদারিও বাড়ে ৷ কোনও সামগ্রী ভেঙে গিয়ে থাকলে শিশু সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে সঙ্গে সঙ্গে সেগুলি সারিয়ে দেওয়া হয় ৷"
গরমকালে পুনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ- পেশওয়ে পার্কের বিখ্যাত টয় ট্রেন ৷ সবসময়ই বিপুল সংখ্যক মানুষকে আকৃষ্ট করে আসছে । প্রতি সন্ধ্যায় শিশুরা সারাসবাগেও এসে জড়ো হয়; পুনের পরিবারগুলির কাছে এটি এখনও অন্যতম প্রধান বিনোদন কেন্দ্র ।
কাটরাজ চিড়িয়াখানাও দর্শনার্থীদের আকর্ষণের একটি প্রধান কেন্দ্র । চিড়িয়াখানার কর্তারা জানান, সেখানকার প্রাণীদের জন্য গরমকালে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে ৷ পশুদের খাঁচায় কুলার বসানো থেকে শুরু করে জলের ব্যবহার বাড়িয়ে খাঁচা ঠান্ডার ব্যবস্থা হচ্ছে ৷ হাতিদের জন্য প্রতিদিন স্নানের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে ।
শিশুদের কাছে যদি কেউ জানতে চায় যে তাদের কি শুধু একটা পার্ক প্রয়োজন ? নাকি আরও বেশি কিছু চাই ৷ তাদের উত্তর একটাই-খেলার মাঠ । পুনে ভারতের এমন একটি শহর যেখানে খেলার মাঠের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে ৷ পার্কগুলোতে ভিড় জমার মূল কারণ, খেলার মাঠের অভাব । তবে দেশের অন্য কয়েকটি শহরের সঙ্গে এ ব্যাপারে পুনের একটা পার্থক্যও আছে ৷ শিশুদের জন্য যে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই সেটা আগেই বুঝেছিল পুনে প্রশাসন ৷ আর তাই পার্কগুলি শহরের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই গণ্য করছে । নাগরিকদের প্রতি পার্ক কর্তৃপক্ষের আহ্বান-তাঁরা যেন এই সমস্ত জায়গা সুন্দর রাখার কাজ, সংরক্ষণ করার কাজ করেন ।
অনেক সময় দেখা যায় শিশুদের খেলার সামগ্রী ব্যবহার করছেন পরিবারের সদস্যরা ৷ এই বিষয় থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করা হয়েছে ৷ পাশাপাশি দর্শনার্থীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে যেন তারা বর্জ্য সঠিকভাবে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলেন ৷ প্লাস্টিক বর্জ্যের জন্য নির্ধারিত বিন বা পাত্রগুলো ব্যবহার করেন । নাগরিকদের প্রতি রাউতের আবেদন, "এই পার্কগুলিকে কেবল পুরসভার সম্পত্তি ভাববেন না ৷ এগুলো সবারই সম্পদ । তাই আগলে রাখার দায়িত্বও সবার ৷"
ভারত এমন একটি দেশে যেখানে কোচিং সেন্টারের সংখ্য়া রোজ বাড়ছে ৷ শিশুদের মধ্যে মোবাইলের ব্যবহারে সময়ও বাড়ছে ৷ একইসঙ্গে শহরের সর্বত্র ঠাসাঠাসি অ্যাপার্টমেন্টের ভিড়ে শহুরে শৈশব ক্রমশ ঘরের চার দেওয়ালেই আবদ্ধ হয়ে পড়ছে—সেখানে পুনের পার্কগুলো যেন এক ভিন্ন বার্তা বহন করছে । এগুলো এমন এক বিরল উপহার তুলে ধরছে, যা আজকাল খুব কমই মেলে ৷ নিরাপদ এবং সবার জন্য উন্মুক্ত কিছু বহিরাঙ্গন বা খোলা জায়গা । আর হয়তো ঠিক এই কারণেই, এই গ্রীষ্মে পুনের এই পার্কগুলোকে আর নিছক বাগান বলে মনে হচ্ছে না; বরং এগুলোকে এখন মনে হচ্ছে শহরের বুকে টিকে থাকা শেষ কয়েকটি খেলার মাঠ ।
খেলার মাঠে মৃত্যু: কংক্রিটের জঙ্গল, বেহাল পরিকাঠামোর পার্কে অসহায় শৈশব ; কোথায় খুদেদের নিরাপত্তা ?

