দিল্লিতে শিশুদের জন্য পার্কগুলির বাস্তবিক দুরবস্থা
রাজধানী দিল্লির চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পার্কগুলি নিয়ে ইটিভি ভারতের বিশেষ প্রতিবেদন ৷

Published : May 31, 2026 at 8:57 AM IST
দিল্লির 'স্মার্ট সিটি' গড়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আলোচনার মাঝেই, একটি বাস্তবিক উদ্বেগ রাজধানীর শিশুদের পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদেরও প্রতিনিয়ত ভাবিয়ে তুলছে ৷ শিশুদের পার্কগুলি সাধারণত স্লাইড, দোলনা এবং খেলার ছলে শিশুদের হাসিখুশি কোলাহলের ছবিই মনে করিয়ে দেয় ৷ অথচ অনেক জায়গায় এই পার্কগুলি এখন মরচে-পড়া লোহার রড, ভাঙা টাইলস এবং অসুরক্ষিত খেলার সরঞ্জামে পূর্ণ এক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়েছে ৷
সমগ্র দিল্লি জুড়ে, এমন অনেক পার্কই আজ একই করুণ কাহিনি শোনাচ্ছে ৷ দেশের রাজধানীতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় 18 হাজার পার্ক রয়েছে ৷ কিন্তু স্থানীয়দের মতে, এদের অধিকাংশই ক্রমশ এমন এক অবস্থায় পৌঁছে যাচ্ছে যেখানে যাওয়াটা আর নিরাপদ বা কাম্য নয়— অর্থাৎ সেগুলি কার্যত 'নো-গো জোন' বা নিষিদ্ধ এলাকায় পরিণত হচ্ছে ৷

1. ইন্ডিয়া গেট চিলড্রেনস পার্ক
দিল্লিতে ইন্ডিয়া গেট-এর কাছে পার্কটি একসময় অত্যনম আকর্ষণীয় জায়গা ছিল ৷ দেশে শিশুদের পার্কগুলির মধ্যে এই পার্কটিকে মর্যাদাপূর্ণ ছিল ৷ এখন অবশ্য পার্কটির অবস্থা শোচনীয় ৷
সম্প্রতি যে অভিভাবকরা এই পার্কটিতে ঘুরতে গিয়েছিলেন, তাঁদের অভিযোগ, পার্কের রক্ষণাবেক্ষণ হয় না ৷ দোলনাগুলির অবস্থা খারাপ ৷ লোহার তৈরি খেলার সরঞ্জামগুলির রঙ চটে গিয়েছে ৷ মরচে ধরে সেগুলি বিপজ্জনক রকমের ধারালো হয়ে উঠেছে ৷ মাঠে রাবারের যে আচ্ছাদন রয়েছে, সেখানে শিশুরা পড়ে গেলে গুরুতর আহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ৷
পার্কে পানীয় জলের ব্য়বস্থা নেই
গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে যে পরিবারগুলি শিশুদের নিয়ে এই পার্কে বেড়াতে গিয়েছেন, তাঁরা শিশুদের তৃষ্ণা মেটাতে পার্কে তন্নতন্ন করে পানীয় জল খুঁজেছেন ৷ সঙ্গে নোংরা শৌচালয়, অকোজো ফোয়ারা, ভাঙা দোলনা ৷ এছাড়া রোদ্দুরে পুড়ে যাওয়া খেলার সরঞ্জামগুলি অবহেলার নিদর্শন বয়ে চলেছে ৷
অভিভাবকদের বক্তব্য, শিশুদের পার্কে যে অবশ্য প্রয়োজনীয় সুবিধেগুলি থাকা দরকার, সেগুলি নেই ৷ রাজস্থান থেকে দিল্লিতে তার মায়ের কাছে ঘুরতে এসেছেন মণিকা ৷ তিনি তাঁর শিশু সন্তানদের পার্কে নিয়ে এসেছিলেন ৷ কিন্তু পার্কের অবস্থা দেখে অত্যন্ত হতাশ হয়েছেন ৷
মণিকার অভিযোগ, শৌচালয়গুলি অত্যন্ত নোংরা ৷ এছাড়া পার্কে ঘুরতে আসা পর্যটকরা ভিতরে বেশ কয়েক ঘণ্টা কাটাচ্ছেন ৷ তাঁদের পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম এবং পানীয় জল প্রয়োজন ৷ তিনি পার্কের সবদিক ঘুরে দেখেছেন, কোথাও কোনও পানীয় জল পাননি ৷ তাঁর বক্তব্য, "শিশুরা এখানে খেলতে আসে, ঘুরে বেড়ায়, দোলনায় চড়ে আনন্দ করে ৷ এই গরম খেলাধুলোর পর তো তাদের জলটাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ৷ কিন্তু সারা পার্কের কোথাও একটিও জলের কল বা কুলার কিছু নেই ৷" তিনি আরও জানান, পার্কের কর্মচারীদের জন্য দফতরে কুলার লাগানো হয়েছে ৷ কিন্তু জনসাধারণের জন্য এমন কোনও ব্যবস্থা নেই ৷ তিনি খেলার সরঞ্জামগুলির দুরবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ৷
আরেক পর্যটক চিন্তা দেবী দিল্লির এই শিশুদের পার্কে বেড়াতে এসেছেন ৷ তাঁর গলাতেও পানীয় জল নিয়ে একই সুর শোনা গেল ৷ তিনি বলেন, "আমি একটু জলের খোঁজে একেবারে প্রধান প্রবেশদ্বার পর্যন্ত গিয়েছি ৷ পরে দেখতে পেলাম, একজন জলের বোতল নিয়ে ঘুরছে ৷ তখন বুঝতে পারলাম, পার্কের বাইরে থেকে পানীয় জলের বোতল কিনে পার্কে ঢুকছে সবাই ৷" এরপর তিনিও 20 টাকা দিয়ে একটি জলের বোতল কেনেন ৷ তিনি বলেন, "এই প্রবল গরমে শিশুদের পার্কে একটা জলের ব্যবস্থা থাকা উচিত, অন্তত তিন থেকে চারটি জায়গায় ৷"
মণিকা অভিযোগ করেছিলেন, পার্কের দোলনাগুলির আশপাশে বা উপরে কোথাও কোনও ছায়া নেই ৷ তিনি বলেন, "সরাসরি সূর্যের আলো পড়ে দোলনাগুলি অত্যন্ত গরম হয়ে যায় ৷ শিশুরা সেখানে ভালোভাবে খেলতে পারে না ৷" বর্ষার সময় পার্কে ঘুরতে আসেন অনেকে ৷ তাঁরা জানালেন, বর্ষায় দোলনার নীচে জল জমে যায় ৷ তখন সমস্যায় পড়তে হয় ৷
পার্কে ঘুরতে আসা আরেক ব্যক্তি অবধেশ জানান, পার্কের দু'টি ফোয়ারাই কোনও কাজ করে না ৷ তিনি বলেন, "মোগলি বা মিউজিক্যাল ফাউন্টেন, কোনওটাই কাজ করে না ৷ পার্কে গাছপালা আছে ৷ কিন্তু রোদ্দুর থেকে রেহাই পাওয়ার কোনও ছায়া নেই ৷ আমাদের জল কিনে খেতে হচ্ছে ৷ এছাড়া ওয়াশরুমগুলির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ ৷"
অঙ্কুর পার্কে ঘুরে এখানকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন ৷ তিনি জানালেন, ওয়াশরুমগুলি ঠিকঠাক রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না ৷ নয়াদিল্লি পুরনিগম (এনডিএমসি) পার্কে জলের মেশিন বসিয়েছে ৷ কিন্তু সেখান থেকে জল বেরোয় না ৷ তাঁর কথায়, "এই অবস্থায় লোকজন ইন্ডিয়া গেটের বাইরে থেকে অথবা পার্কের ভিতরে ক্যান্টিন থেকে জল কিনতে বাধ্য হচ্ছে ৷"

ভাঙাচোরা দোলনা ও ক্ষতিগ্রস্ত সিঁড়ির সংখ্যা বেড়ে চলেছে
পার্কে বেশ কয়েকটি দোলনার অবস্থা খুব খারাপ ৷ খেলার সরঞ্জামগুলিতে থাকা সিঁড়িগুলি ভাঙা ৷ ফলে শিশুদের পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার বিপদ বেড়ে চলেছে ৷ বসার জায়গাগুলিও ঠিকঠাক নেই ৷ খেলার কয়েকটি পরিকাঠামো আলাগা হয়ে গিয়েছে ৷ অভিভাবকরা জানিয়েছেন, সময়মতো মেরামতি করা না হলে, এই সমস্যাগুলি শিশুদের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনবে ৷
শিশুদের জন্য গ্রন্থাগারই আশার আলো
এই সমস্যাগুলির মধ্যে শিশুদের লাইব্রেরি একটি বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে ৷ গ্রন্থাগারে হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষায় শিশুদের পড়ার গল্পের বই পাওয়া যায় ৷ ছ'বছর থেকে 12 বছর পর্যন্ত বয়সি শিশুরা গ্রন্থাগার থেকে বই নিয়ে পড়তে পারে ৷ অভিভাবকরা মনে করছেন, এটা একটা ইতিবাচক উদ্যোগ, যা শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করবে ৷
অবশ্য, পার্কে ঘুরতে আসা ভ্রমণকারীরা উল্লেখ করেছেন, পার্কের প্রাথমিক পরিকাঠামো এবং সুযোগ-সুবিধেগুলি উন্নত হলে তবেই এই লাইব্রেরির মতো উদ্যোগগুলি সফল হবে ৷
শিশুদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে কর্তৃপক্ষ যদি সুযোগ-সুবিধাগুলি মজবুত করে, তাহলে পার্ক শুধু যে একটি পর্যটন স্থল হয়ে উঠবে, তাই নয়, একটি শিশুদের জন্য নিরাপদ এবং স্মরণীয় অভিজ্ঞতায় পরিণত হবে ৷
2. নেহরু এনক্লেভে রিং রোডে শিশুদের পার্ক
দিল্লিতে শিশুদের জন্য তৈরি নেহরু এনক্লেভ পার্ক জনপ্রিয় ৷ 2026 সালের 5 মে এই পার্কের উদ্বোধন করেছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হর্ষ মালহোত্রা ৷ সদ্য তৈরি হওয়ায় পার্কটি শিশু ও বড়দের কাছে একটি আকর্ষণীয় জায়গা হয়ে উঠেছে ৷
স্পাইডার ম্যান থেকে অ্যান্ট-ম্যান থিম দিয়ে সাজানো হয়েছে পার্কটি ৷ শিশুদের জন্য পাহাড়ে ওঠার একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে ৷ এতে পাহাড়ে ওঠার আনন্দ পাবে তারা ৷ শিশুদের জন্য দোলনার পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য খেলার সরঞ্জামও স্থাপন করা হয়েছে এখানে ৷ পার্কের আরেকটি আকর্ষণ সবুজায়ন ৷ পার্কজুড়ে গাছ ও চারাগাছ রয়েছে ৷
শিশু এবং পার্কে ঘুরতে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি ৷ রাক্ষী পার্কের দোলনায় চড়তে এসেছিলেন তাঁরা ৷ তাঁদের কথায়, "এর আগে আমরা যখন এখানে আসতাম, তখন খুব কিছু ছিল না ৷ কিন্তু এখন সংস্কার করা হয়েছে ৷ এখন এখানে আশ্রয়স্থল রয়েছে ৷ প্রতিটি বসার জায়গার ডিজাইন রয়েছে ৷ একেকটি একেক রকম আকৃতির এবং শুধু শিশু নয়, বড়দের কাছেও সমান আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে ৷"
তিনি আরও জানালেন এখানে এই পার্কটিই প্রথম এত ভালোভাবে সংস্কার করা হয়েছে ৷ আরেক ভ্রমণকারী রিঙ্কি জানালেন, পার্কের পরিবেশ দুর্দান্ত ৷ তিনি বলেন, "সব বয়সিদের জন্য দোলনা রয়েছে ৷ আমরা নিয়মিত পার্কে আসি এবং এখানে সময় কাটাতে ভালোবাসি ৷"
আরেক ভ্রমণকারী রাহুল জানালেন, পার্কটি অসাধারণ ৷ তাঁর পরামর্শ, "এটাই একমাত্র পার্ক যেখানে সব ধরনের দোলনা এবং শিশুদের জন্য বিভিন্ন ধরনের খেলার পরিকাঠামো রয়েছে ৷ প্রত্যেক শিশুর অন্তত একবার এখানে এসে খেলাধুলো করতে হবে ৷" রিং রোডে নেহরু এনক্লেভ তৈরি করেছে পুরনিগম ৷ এর জন্য প্রায় 94 লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে ৷
3. পূর্ব দিল্লিতে সুজরমল চিল্ড্রেন'স পার্ক
ইটিভি ভারতের একটি প্রতিনিধি দল দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (ডিডিএ)-র অধীনে বিশ্বাস নগরে মহারাজা সুরজমল পার্কের বাস্তবিক পরিস্থিতি জানতে সেখানে ঘুরতে গিয়েছিল ৷
মূল প্রবেশদ্বারে স্পষ্ট করে লেখা 'গ্রিন দিল্লি বাই ডিডিএ' ৷ কিন্তু পার্কে ঢুকলে ছবিটা বদলে যায় ৷ পার্কটির কিছু জায়গা সবুজ এবং ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে ৷ কিন্তু অন্যত্র শুষ্ক জমি এবং ধুলো উড়ছে ৷ যাঁরা এই পার্কে ঘুরতে এসেছেন, তাঁদের প্রতিক্রিয়াও মিশ্র ৷
তুষার গান্ধি প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় এই পার্কে ঘুরতে আসেন ৷ তাঁর কথায়, "সব মিলিয়ে এই পার্কটি বেশ ভালো ৷ কিন্তু শিশুদের জন্য যে দোলনাগুলি স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলি ভেঙে গিয়েছে ৷ শৌচাগারের অবস্থাও অত্যন্ত খারাপ ৷" তিনি জানালেন, কয়েকটি বসার জায়গাও ভেঙেচুরে গিয়েছে ৷ অন্য জায়গাগুলিতে প্রাথমিক ব্যবস্থাগুলি নেই ৷
সবুজায়নের বিষয়ে তুষার গান্ধি জানালেন, পার্কের মধ্যে কয়েকটি জায়গায় মাত্র গাছপালা রয়েছে ৷ বেশির ভাগ এলাকাই শুষ্ক ও গাছ-বিহীন ৷ এখানে যথেষ্ট সংখ্যক মালি নেই ৷ গাছে জল দেওয়ার বন্দোবস্তও নেই ৷
রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সর্বত্র ধুলো
স্থানীয় এক বাসিন্দা জানালেন, বিনোদন এবং জনসাধারণের স্বাস্থ্যের জন্যে পার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৷ তিনি বলেন, "মানুষ সকালে ও বিকালে এখানে আসে ৷ জগিং করে, ব্যায়াম করে ৷ অনেকেই শ্বাসকষ্টজনিত রোগে এবং হাঁটুর সমস্যায় ভুগছেন ৷ তাই স্বস্তি পেতে তাঁরা পার্কে আসেন ৷" যদিও পার্কের এত ধুলোয় সেই সমস্যা থেকেই যায় ৷
একজন তরুণ ভ্রমণকারী রাহুল গত পাঁচ-ছ'বছর ধরে এই পার্কে আসছেন ৷ তিনি জানান, পার্কের মাঠটি ক্রিকেট খেলার উপযুক্ত ৷ কিন্তু বর্ষায় পুরো মাঠটি কাদা-জলে ভরে যায় ৷ তাঁর কথায়, "মাঠটি ঠিক করে তৈরি করা হলে তরুণদের খেলার জন্য অনেক ভালো একটা জায়গায় পরিণত হতে পারে ৷"
নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
পার্কে আসা অনেক ভ্রমণকারীই জানিয়েছেন, পার্কে নিরাপত্তারক্ষীদের দেখাই যায় না ৷ যদিও রাতে আলো জ্বলে, কিন্তু তাও মানুষ ঠিক নিরাপদ বোধ করে না ৷ 1984 সাল থেকে এই এলাকায় থাকেন সন্তোষ কুমার ৷ তিনি জানালেন, অবস্থা আগের থেকে উন্নত হয়েছে কিন্তু আরও অনেক কিছুই করা বাকি ৷
তিনি বলেন, "হাঁটার ট্র্যাক, দোলনা এবং অন্যসব ব্যবস্থা পার্কে আছে ৷ কিন্তু সেগুলি সময়মতো মেরামতি করা দরকার ৷" পার্কের মধ্যে একটি কাঠের ছায়া তৈরি হয়েছিল, এখন সেটা ভেঙেচুরে গিয়েছে ৷ ফোয়ারাগুলি বছরের পর বছর ধরে বন্ধ ৷ পার্কে আসা পর্যটকরা জানালেন, যদি ডিডিএ নিয়মিত পরিষ্কার করে, সবুজ গাছপালার রক্ষণাবেক্ষণ করে, শিশুদের দোলনাগুলির যত্ন নেয় এবং এর সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে ৷ তাহলে পার্কটি সাধারণের জন্য আরও ভালো জনপরিসরে হয়ে উঠতে পারে ৷
4. যমুনার ধারে তৈরি বাঁশেরা পার্ক
2023 সালের সেপ্টেম্বরে দিল্লির সরাই কালে খান এলাকায় এই পার্কটি তৈরি হয়েছিল ৷ এটা দিল্লি-এনসিআর-এর প্রথম বাঁশের থিমের পার্ক ৷ দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (ডিডিএ) এই পার্কটি তৈরি করেছে ৷ এই পার্কটি শিশুদের খেলার জন্য তৈরি ৷ এখানে খেলা, অ্যাডভেঞ্চার ও নানাবিধ শারীরিক কসরতের ব্যবস্থা রয়েছে ৷ বিভিন্ন বিনোদনের বন্দোবস্ত আছে ৷
দিলশাদ গার্ডেন থেকে এই পার্কে ঘুরতে এসেছেন সিম্মি রাওয়াল ৷ তাঁর সঙ্গে রয়েছে তাঁর মেয়ে ৷ তিনি জানালেন, পার্কে সবকিছুই ভালো ৷ তাঁর কথায়, "এখানে নিরাপত্তারক্ষীরা আছে ৷ শিশুদের অ্যাডভেঞ্চারের জন্য অনেক কিছু আছে ৷ সন্ধ্যায় এলে বেশি আনন্দ পাওয়া যায় ৷"
শিশুদের নিরাপত্তা ভ্রমণকারীদের স্বস্তি দেয়
মঙ্গলপুরী থেকে পুষ্পা এই পার্কে ঘুরতে এসেছেন তাঁর পরিবার ও শিশুকে নিয়ে ৷ তিনি জানালেন, শিশুরা এখানে আনন্দ পায় কারণ, কোনও নিরাপত্তার বিষয়ে কোনও ঝুঁকি নেই ৷ তিনি বলেন, "প্রতিটি পদে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের তাদের সঙ্গে থাকতে হবে ৷"
দিল্লির শাস্ত্রী নগর এলাকা থেকে পার্কে শিশুদের নিয়ে এসেছেন পঙ্কজ কুমার ৷ তিনি জানালেন, সোশাল মিডিয়া থেকে তিনি প্রথম এই পার্কটি সম্পর্কে জানতে পারেন ৷ তাঁর কথায়, "এখানে শিশুদের জন্য নতুন নতুন আকর্ষণ আছে, এবং অ্যাডভেঞ্চারের ব্যবস্থা রয়েছে ৷"
অভিভাবকরা বিশ্বাস করেন যথাযথ দেখাশোনার পাশাপাশি এই পার্কে বিনোদন ও শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশের একটি মজবুত সংমিশ্রণ পাওয়া যায় ৷
5. রোহিণীর স্বর্ণ জয়ন্তী পার্ক
রোহিণীর স্বর্ণ জয়ন্তী পার্কটি 'জাপানিজ পার্ক' নামেও পরিচিত ৷ এটা দিল্লির অন্যতম গুরুত্বপর্ণ জনপরিসর ৷ 1990 সালে 250 একর জায়গাজুড়ে এই বিশাল পার্কটি তৈরি হয়েছিল ৷ 1997 সালে ভারতের স্বাধীনতার 50 বছর পূর্তিতে এই পার্কটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয় ৷
শিশুদের খেলার জায়গার অবস্থা খুব খারাপ
সম্প্রতি শিশুদের খেলার জায়গাটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দা ও ভ্রমণকারীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে ৷ অভিযোগ, বেশিরভাগ দোলনা এবং খেলার সরঞ্জামগুলি হয় ভেঙে গিয়েছে, নয়তো মরচে ধরে গিয়েছে ৷ সেগুলি শিশুদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে ৷ বসার জায়গাগুলির অবস্থাও খারাপ ৷ নিরপাত্তার মান অত্যন্ত নিম্ন ৷ পার্কের অন্য বিভাগগুলির তুলনায় শিশুদের জায়গাগুলি গুরুতর অবহেলার শিকার ৷ অভিভাবকরা তাদের শিশুদের এখানে আনতে দ্বিধা বোধ করেন ৷
এলাকার বাসিন্দা এবং নিয়মিত যাঁরা পার্কে ঘুরতে আসেন, তাঁরা জানালেন, পার্কটি একসময় রোহিণীর গর্ব ছিল ৷ যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন পার্কের সব ঔজ্জ্বল্য ফিকে হয়ে গিয়েছে ৷ এক অভিভাবক সুদেশ দাহিয়া জানালেন, নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকির কারণে তাঁরা শিশুদের দোলনায় চড়তে দেন না ৷ তিনি বলেন, "সামান্য মেরামতিতেও বেশ কিছু সমস্যার সমাধান হতে পারে ৷ কিন্তু প্রশাসনের কোনও নজরদারি নেই ৷"
পার্কে নিয়মিত আসেন ঐশ্বর্য জানালেন, পার্কটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নয় ৷ পানীয় জলের মতো প্রাথমিক সুযোগ-সুবিধেগুলিও খুব উদ্বেগজনক ৷ সোশাল মিডিয়ায় এবং স্থানীয়ভাবে মানুষ পার্কের এই দুরবস্থা নিয়ে সরব হয়েছে ৷ কিন্তু উন্নতি হলেও তা অত্যন্ত ধীর গতিতে ৷
এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ডিডিএ সংস্কারের কাজ করুক ৷ এর ফলে পার্কটি ফের শিশুদের কাছে সুরক্ষিত এবং আনন্দের জায়গা হয়ে উঠবে ৷
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
দিল্লির ডেপুটি মেয়র ড. মণিকা পন্থ বলেন, "আমাদের দিল্লি পুরনিগমের আওতায় 15 হাজার 200টি পার্ক আছে ৷ এই পার্কগুলির রক্ষণাবেক্ষণ একটা গুরুতর দায়িত্ব ৷ কারণ, হর্টিকালচার দফতরে যথেষ্ট কর্মী নেই ৷" তিনি জানালেন, পিপিপি মডেলের আওতায় মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে ৷ তাহলে দিল্লি সরকার এবং পুরনিগমের সঙ্গে তাঁরাও কাজ করতে পারবেন ৷ এই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পার্ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আমরা তহবিল বরাদ্দ করতে পারব ৷
মণিকা আরও বলেন, "এখন পার্কের ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়নমূলক কাজে গতি এসেছে ৷ দিল্লিতে রেখা গুপ্তার সরকার গঠনের পর সিএমডিএফ তহবিলের মাধ্যমে অনেক কাজ করা হয়েছে ৷"
তিনি আরও জানান, দীর্ঘসময় ধরে ফুটপাথগুলি ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে ছিল ৷ সেগুলি আমজনতার প্রয়োজনে মেরামত করা হচ্ছে ৷ কয়েকটি পার্কে, জলের মোটর কাজ করছিল না ৷ সেগুলিও সারানো হয়েছে ৷ ডেপুটি মেয়রের সংযোজন, "পার্কগুলিতে শিশুদের খেলার জায়গা এবং ছোট ছোট দোলনা স্থাপন করা হয়েছে ৷ কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলির অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছে ৷"
এই বিষয়ে প্রাক্তন এমসিডি গার্ডেন কমিটির চেয়ারম্যান ধরমবীর বলেন, "দিল্লির পার্কগুলিতে নিরাপত্তা বিষয়ে অডিট করাটা কোনও বাধ্যবাধকতা নয় ৷ নিরাপত্তা ও পার্ককে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার পরিবর্তে অধিকাংশ পার্কের মূল লক্ষ সৌন্দর্যায়ন ৷" সমীক্ষায় ইঙ্গিত মিলেছে, 60 শতাংশেরও বেশি দোলনা পাঁচ বছরেরও বেশি পুরনো ৷ দোলনাগুলি ঠিকঠাক কাজ করছে কি না, এই বিষয়ে কোনও পরীক্ষা হয়েছে কি না, তার কোনও রেকর্ড নেই ৷
তাঁর সংযোজন, "এনডিএমসি এবং ডিডিএ পার্কগুলির মধ্যে একটা বড় পার্থক্য রয়েছে ৷ বড় বড় পার্কগুলির মধ্যে শিশুদের জায়গাগুলি অনেক সময় অবহেলা করা হয় ৷ কারণ বাজেটের বেশিরভাগটাই চলে যায় সবুজায়ন করতে এবং পার্ক সাজাতে ৷ ভারতে শিশুদের পার্কগুলি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তার সমীক্ষা নিয়ে কোনও কঠোর বাধ্যবাধকতা নেই ৷"

সমাধান কী ?
ধরমবীরের পরামর্শ, নিরাপত্তাজনিত সমীক্ষা আবশ্যিক করা হোক ৷ এই সমীক্ষার আওতায় প্রতি তিন মাস অন্তর দোলনাগুলির কাঠামোগত অবস্থা এবং সুরক্ষা খতিয়ে দেখা হবে ৷ নরম অবতরণ-পৃষ্ঠ অর্থাৎ দোলনার নীচে কংক্রিটের মেঝের পরিবর্তে সুরক্ষার ম্যাট এবং সিসিটিভি বাধ্যতামূলক করা হবে ৷ তিনি বলেন, "রেসিডেন্টস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনস (আরডব্লিউএএস) বুঝতে হবে যে, পার্কগুলি শুধু হাঁটার জায়গা নয়, শিশুদের সামগ্রিক বিকাশের অবশ্য প্রয়োজনী একটি জায়গা ৷"
যখন দিল্লির পার্কগুলিতে শিশুদের হাসির শব্দ ফিকে হয়ে যাচ্ছে, এখনই সময় এই প্রতিটি জায়গায় নতুন করে নজর দেওয়া এবং সেগুলির অবস্থার উন্নতি ঘটানো ৷ অবিলম্বে কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে আগামী প্রজন্ম হয়তো নিজেদের কেবল কংক্রিটের জঙ্গল আর মোবাইল স্ক্রিনের মধ্যেই আবদ্ধ দেখতে পাবে ৷ এখনই উপযুক্ত সময়— নতুবা আর কখনও নয় ৷

