ETV Bharat / bharat

ত্রিপুরা ছাত্র হত্যায় দেরাদুন প্রশাসনকে নোটিশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের

'বর্ণবিদ্বেষে'র অভিযোগ তোলেন মৃত ত্রিপুরার ছাত্রের বাবা ৷ অ্যাঞ্জেলের বাবা জানান, দেরাদুনে পড়তে তাঁর ছেলেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয় ৷

RACIALLY ATTACK IN UTTARAKHAND
ত্রিপুরার 24 বছর বয়সি অ্যাঞ্জেল চাকমা, যাঁর মৃত্যু হয়েছে দেরাদুনে (Social media)
author img

By PTI

Published : December 30, 2025 at 2:42 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

নয়াদিল্লি, 30 ডিসেম্বর: অ্যাঞ্জেল চাকমাকে খুনের ঘটনায় তৎপর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ৷ দেরাদুনের জেলাশাসক ও সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশকে নোটিশ পাঠানো হল কমিশনের তরফে ৷ ঘটনার তদন্ত করে সাতদিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে ৷

অভিযোগ, 'চাইনিজ মোমো' বলে বারবার কটাক্ষ করা হত ত্রিপুরা থেকে দেরাদুনে MBA করতে আসা অ্যাঞ্জেলকে ৷ গত 9 ডিসেম্বর 5-6 জন যুবক বছর চব্বিশের অ্যাঞ্জেলের উপর অতর্কিতে হামলা চালায় ৷ ত্রিপুরার বছর চব্বিশের ওই যুবকের মাথায় ও পিঠে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে থাকে ৷ হাতপাতালে ভর্তি করা হলে 17 দিন লড়াইয়ের পর গত শুক্রবার প্রয়াত হন অ্যাঞ্জেল ৷ এরপর তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া নৃশংশ ঘটনা ও 'বর্ণবিদ্বেষে'র অভিযোগ সামনে আসে ৷ সোমবার বাবা অভিযোগ করেন 'চিনা' তকমা দিয়ে অ্যাঞ্জেলকে খুন করা হয় ৷ এরপরই তৎপর কমিশন ৷

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন দেরাদুন প্রশাসনকে ত্রিপুরা ছাত্রকে খুনের ঘটনায় ওঠা সমস্ত অভিযোগের যথাযথ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে ৷ সেইসঙ্গে আগামী সাত দিনের মধ্যে গৃহীত পদক্ষেপের একটি রিপোর্টও চেয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন মামলার পুঙ্খনাপুঙ্খ তদন্তের রিপোর্ট উত্তরাখণ্ডের মুখ্যসচিব এবং ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশের কাছে পাঠানোরও নির্দেশ দিয়েছে। কমিশনের নোটিশে আরও বলা আছে, দেরাদুন প্রশাসনকে রাজ্যের সর্বত্র উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে আসা পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

RACIALLY ATTACK IN UTTARAKHAND
অ্যাঞ্জেল চাকমার উপর হামলা ও মৃত্যুর প্রতিবাদে সোমবার দেরাদুনের গান্ধিপার্কে ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা একটি মোমবাতি মিছিলে অংশ নেন (পিটিআই)

অ্যাঞ্জেলকে 'চিনা' বলে কটাক্ষ

দেরাদুনের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ চূড়ান্ত বর্ষের ছাত্র ছিলেন অ্যাঞ্জেল চাকমা ৷ গত 9 ডিসেম্বর কয়েকজন যুবক ছুরি ও ব্রেসলেট দিয়ে ত্রিপুরার ছাত্রকে আক্রমণ করে বলে অভিযোগ। সেদিন থেকে গুরুতর জখম অবস্থায় 17 দিন হাসপাতালে থাকার পর গত 26 ডিসেম্বর তিনি মারা যান। তাঁর বাবা মণিপুরের টাংজেংয়ে কর্মরত একজন বিএসএফ জওয়ান ৷ তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলেকে নির্মমভাবে আক্রমণ করা হয় ৷ সেইসঙ্গে আক্রমণকারীরা অ্যাঞ্জেলকে 'চিনা' বলে ডাকত ৷

অ্যাঞ্জেল 'ভারতীয়, চিনা নয়'

মৃত ছাত্রের বাবা তরুণ চাকমা সংবাদসংস্থা পিটিআইকে ফোনে বলেন, "ওই 5-6 জন যুবক আমার ছেলেকে 'চাইনিজ মোমো' বলে ডাকত ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করত ৷ ঘটনার দিনও এমনটাই হয়েছিল ৷ আমার আরেক ছেলে মাইকেল ও অ্যাঞ্জেল বাজার যাচ্ছিল ৷ ঠিক তখনই ছয়জন একটি বাইক ও স্কুটি করে এসে তাদের কাছে এসে থামে। সেই সময় অভিযুক্তরা মাইকেলকে কিছু বলে এবং ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দেয়। অ্যাঞ্জেল এতে আপত্তি জানায় ৷ তারপর ওরা গালিগালাজ করতে শুরু করে ৷ পরিস্থিতি চরমে পৌঁছয় ৷ অ্যাঞ্জেল তাদের বারবার বলেছিল সে 'ভারতীয়, চিনা নয়' ৷ একথা শোনার পরও ওরা আমার ছেলেকে ছেড়ে দেয়নি ৷ পাল্টা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে থাকে ৷ মাথায় ও ঘাড়ে গুরুত আঘাত লাগে ৷ সেলাকুই এলাকা থেকে অ্যাঞ্জলকে উদ্ধার করে আমার আরেক ছেলে হাসপাতালে ভর্তি করে ৷"

ছেলের খুনিদের শাস্তির দাবি বাবার

তিনি আরও বলেন, "পুলিশ প্রথমে FIR করতে অস্বীকার করেছিল ৷ পরে সর্বভারতীয় চাকমা ছাত্র ইউনিয়ন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপে ঘটনার দু'থেকে তিন দিন পর একটি এফআইআর দায়ের করে। এটি একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ওদের আক্রমণে আমার অ্যাঞ্জেলের ঘাড় ভেঙে গিয়েছিল, যার ফলে ওর মৃত্যু হয়। ওর পড়াশোনার শেষবর্ষ চলছিল ৷ চাকরিও পেয়েছিল ৷ কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল ৷ ছেলের অকাল মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী তাদের কড়া শাস্তি দিতে হবে ৷ আমি আমার ছেলেকে হারিয়েছি এবং এখন তার ন্যায়বিচার পাওয়া উচিত।" এদিকে, পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ত্রিপুরার উনাকোটি জেলার মাছমারা গ্রামে অ্যাঞ্জেলের শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়।

পুলিশের বক্তব্য

তদন্তকারীর জানিয়েছেন, গত 10 ডিসেম্বর পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের হয় ৷ তদন্তে নেমে গত 14 ডিসেম্বর পুলিশ তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে এবং 2 নাবালককে আটক করে। অন্যদিকে, আরেক অভিযুক্ত নেপালের বাসিন্দা ৷ সে নিজের দেশে পালিয়ে থাকতে পারে ৷ শনিবার, দেরাদুনের এসএসপি অজয় ​​সিং সাংবাদিক সম্মলনে বলেন, " 6 অভিযুক্তের দলটি নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি ৷ সেইসঙ্গে কোনও বিষয় নিয়ে তর্ক হচ্ছিল। অ্যাঞ্জেলকে কোনওকিছু নিয়ে কটাক্ষ করা হচ্ছিল ৷ এর মধ্যে মারামারি শুরু হয় এবং ধারালো অস্ত্র এবং ব্রেসলেট (কাড়হা) দিয়ে ত্রিপুরার ছাত্রটির উপর আক্রমণ করা হয়। মারামারিতে অ্যাঞ্জেল গুরুতর আহত হন ৷ তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় ৷ গত শুক্রবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।"

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হস্তক্ষেপ

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য প্রিয়াঙ্ক কানুনগোর সভাপতিত্বে একটি বেঞ্চ গঠিত হয়েছে ৷ 1993 সালের মানবাধিকার সুরক্ষা আইন (Protection of Human Rights Act, 1993)-এর 12 নম্বর ধারা অনুযায়ী বেঞ্চটি গঠিত হয়েছে ৷ বেঞ্চের তরফে পাঠানো দেরাদুন প্রশাসনকে পাঠানো নোটিশে বলা আছে - "ছেলেটির বাবার অভিযোগ অনুয়ায়ী, ত্রিপুরার ওই ছাত্র ভিনরাজ্যে পড়তে গিয়ে বর্ণবিদ্বেষের শিকার হয়েছেন ৷ তাঁকে নির্মমভাবে আক্রমণ করে হত্যা করা হয়েছে। ওই যুবককে 'ভারতীয় নাগরিক হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত করার পরও বর্ণবিদ্বষের শিকার হয়ে কটুক্তি শুনতে হয় ও তাঁর উপর হামলা চালানো হয়। এই ঘটনাটি দেশব্যাপী ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে ৷ অভিযোগকারী এই বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন এবং এই ধরনের ঘটনা যাতে আর না-হয় তাই জরুরি হস্তক্ষেপ ও জবাব চেয়েছেন ৷ ছেলেটির বাবার অভিযোগ অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে এই ঘটনা মানবাধিকারের লঙ্ঘন বলে মনে হচ্ছে ৷

এদিকে, সোমবার উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি ওই ছাত্রের বাবার সঙ্গে কথা বলেন এবং অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তির আশ্বাস দেন। পাশাপাশি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলির মানুষের বিরুদ্ধে 'ঘৃণাজনিত অপরাধ' যাতে বন্ধ হয় তার চেষ্টা চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন ৷