স্বাধীনতার লড়াইয়ে ছিল 'স্বদেশী', এ বার অর্থনীতির স্বাধীনতায় সেই পথেই হাঁটার ডাক
চিনা পণ্য থেকে বিদেশি সংস্থাগুলি ভারতের বিশাল বাজারে ক্রমশ প্রভাব বাড়াচ্ছে। ফলে দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতা কঠিন হচ্ছে। পাপড়ি চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিবেদন৷

Published : August 30, 2026 at 10:08 PM IST
কলকাতা, 30 অগস্ট: 1905-এর স্বদেশী আন্দোলন ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতার লড়াই । বিদেশি পণ্য বর্জন করে দেশীয় পণ্যের ব্যবহারের ডাক উঠেছিল তখন । একশোরও বেশি বছর পরে সেই 'স্বদেশী' শব্দটিই ফিরে এল অন্য অর্থে, এবার রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং দেশীয় শিল্পকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য সামনে রেখে । বিদেশি পণ্যের ব্যবহার কমিয়ে দেশীয় পণ্য ব্যবহারের বার্তা নিয়ে রাজ্যজুড়ে প্রচারে নেমেছে স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ ।
বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন । তার প্রতিবাদে বাংলার পথে পথে তৈরি হয়েছিল প্রবল জনমত । 1905-এ আনুষ্ঠানিক রূপ নেয় স্বদেশী আন্দোলন । ব্রিটিশ পণ্য বয়কট এবং দেশীয় পণ্যের ব্যবহারের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিবাদকে অর্থনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামীরা । সেই ইতিহাসকেই বর্তমানের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে জুড়ে নতুন করে প্রচারে আনতে চাইছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের অর্থনৈতিক শাখা হিসাবে পরিচিত স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ ।
মঞ্চের বক্তব্য, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এসেছে । কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিদেশি পণ্যের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে সেই স্বাধীনতা কতটা শক্তিশালী থাকবে, সেটাই এখন প্রশ্ন । তাঁদের অভিযোগ, চিনা পণ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন পশ্চিমী বহুজাতিক সংস্থা ও অন্য বিদেশি সংস্থাগুলি ভারতের বিশাল বাজারে প্রভাব ক্রমশ বাড়াচ্ছে । ফলে দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতা কঠিন হচ্ছে ।
স্বদেশী জাগরণ মঞ্চের পূর্ব ক্ষেত্রের সহ-সংযোজক অম্লান কুসুম ঘোষের কথায়, "স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য আমরা স্বদেশীর পথে গিয়েছিলাম । আর আজ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা যাতে হারিয়ে না যায়, সেই কারণেই স্বদেশীর পথে হাঁটছি ।"

তাঁর ব্যাখ্যায়, ব্রিটিশ আমলে একটি দেশ অন্য দেশকে সামরিক শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করত । এখন সেই লড়াইয়ের বড় অংশই অর্থনৈতিক। বিদেশি পণ্য দিয়ে কোনও দেশের বাজার দখল করে নেওয়াও এক ধরনের অর্থনৈতিক আধিপত্য । তাঁর দাবি, ভারতের বাজারেও সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে । এক দিকে চিনা পণ্যের প্রভাব, অন্যদিকে আমেরিকা এবং পশ্চিমের বড় সংস্থাগুলির উপস্থিতি, দুইয়ের মাঝেই দেশীয় বাজার এবং শিল্পকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে ।

তবে বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করার কথা বলছে না মঞ্চ । ভারত-আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নিয়েও অবস্থান স্পষ্ট করে অম্লান বলেন, "আমরা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বিরোধিতা করছি না । দেশের সাধারণ মানুষের কাছে আমাদের আবেদন, তাঁরা স্বদেশী মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হন । রফতানি যত বাড়বে এবং আমদানি যত কমবে, দেশের অর্থনীতি তত শক্তিশালী হবে । দেশীয় পণ্যের ব্যবহার বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়বে ।"
এই ভাবনার সঙ্গে 'ভোকাল ফর লোকাল' এর বার্তাকেও একসূত্রে দেখছে মঞ্চ । দেশীয় উৎপাদন, স্থানীয় উদ্যোগ এবং ছোট ব্যবসাকে শক্তিশালী করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে । প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও বিভিন্ন সময়ে 'ভোকাল ফর লোকাল'-কে গণ আন্দোলনের রূপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন । স্বদেশী জাগরণ মঞ্চের বক্তব্য, সেই বার্তাকে শুধু বক্তৃতা বা প্রচারের মধ্যে আটকে না রেখে বাড়ির বাজার, দোকান এবং দৈনন্দিন জীবনের সিদ্ধান্তে নিয়ে যেতে হবে ।
এই প্রচারের লক্ষ্য শুধু বিদেশি পণ্য বর্জন নয় । মঞ্চের পরিকল্পনায় রয়েছে তিনটি মূল দিক, দেশীয় পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো, অর্থনীতিকে অল্প কয়েকটি বড় কর্পোরেট সংস্থার হাতে কেন্দ্রীভূত হতে না দেওয়া এবং তৃণমূল স্তরে কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ নির্মাণ । পাশাপাশি যুব সমাজের দক্ষতা উন্নয়নেও জোর দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে ।
প্রচার চলছে দু'টি পথে- অনলাইন এবং অফলাইন । সোশাল মিডিয়া ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে দেশীয় পণ্য ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হচ্ছে । বোঝানো হচ্ছে, বিদেশি পণ্যের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কীভাবে দেশের স্থানীয় শিল্প এবং কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে । পাশাপাশি বাড়ি, দোকান এবং বাজারে গিয়ে সরাসরি মানুষের সঙ্গে কথা বলেও চলছে প্রচার ।

মঞ্চের পূর্ব ক্ষেত্র কমিটির সদস্য চিকিৎসক দীপঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার প্রয়োজনীয়তা আরও সামনে এনে দিয়েছে । করোনা-পরবর্তী ধাক্কার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের মতো ঘটনাগুলি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দামে অস্থিরতা তৈরি করেছে । আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি সেখানেই স্পষ্ট ।
তাই সাধারণ মানুষের জন্য কিছু বার্তাও দিচ্ছে মঞ্চ । অপ্রয়োজনে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করে গণপরিবহণে জোর দেওয়া, প্রয়োজন না থাকলে কিছু সময়ের জন্য সোনা কেনা এড়ানো, নিছক বিনোদনের জন্য বিদেশ ভ্রমণ কমানো এবং সম্ভব হলে ভারতে তৈরি ইলেকট্রনিক পণ্য ব্যবহারের আহ্বান জানানো হচ্ছে ।
স্বদেশী জাগরণ মঞ্চের বক্তব্য, এই কর্মসূচি কোনও নির্দিষ্ট সরকারের উপর নির্ভরশীল নয় । 1991 সাল থেকেই সংগঠনটি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পক্ষে প্রচার চালিয়ে আসছে । সরকার বদলালেও দেশীয় শিল্প, স্থানীয় উদ্যোগ এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রয়োজন বদলায় না, এটাই তাদের যুক্তি ।
আর তাই এ বারের প্রচারের লক্ষ্য স্রেফ 'বিদেশি পণ্য বর্জন' নয় । বাড়ির বাজারের থলি থেকে দেশের অর্থনীতির ভিত, দুইয়ের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করাই স্বদেশী জাগরণ মঞ্চের লক্ষ্য । রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় আগামিদিনে আরও প্রচার কর্মসূচির পরিকল্পনাও রয়েছে ।
1905-এ স্বদেশী ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র । আজকের স্বদেশী জাগরণ মঞ্চের ভাষায়, লড়াইটা অন্য, দেশের বাজার, দেশীয় শিল্প এবং কর্মসংস্থানকে শক্তিশালী করে অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে আরও মজবুত করার লড়াই ।
E20 জ্বালানির দাপটে স্ক্র্যাপের মুখে 3 লক্ষ গাড়ি ! দ্রুত বদলাচ্ছে পুরনো গাড়ির বাজার

