বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের জন্য তালাবন্ধ পার্ক, ওড়িশার উদ্যানগুলিতে নেই মৌলিক সুবিধা
ওড়িশার বড় শহরগুলিতে পার্কের অবস্থা নিয়ে ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি ভুবনেশ্বরের বিকাশ কুমার দাস, কটকের নারায়ণ সাহু, বহরমপুরের সমীর কুমার আচার্য পুরীর শক্তিপ্রসাদ মিশ্রের রিপোর্ট ৷

Published : May 29, 2026 at 9:09 AM IST
যে সব শিশুরা সাধারণত জন পরিসরে অবাধে ঘোরাফেরা করতে পারে না, তাদের জন্য পার্ক একটি আদর্শ আশ্রয়স্থল ৷ দুঃখের বিষয়, সেটা হয়ে ওঠেনি ৷ হয়তো হালকা রঙে রং করা, রাস্তাগুলিতে বৈচিত্র্যময় ছবি আঁকা, সুরক্ষিত খেলার সরঞ্জাম রয়েছে এবং সুন্দরভাবে ডিজাইন করা- কিন্তু যে সব শিশুরা বিশেষভাবে সক্ষম, তারাই যদি এই পার্কে কোনও বাধা ছাড়া প্রাণখুলে হাসতে না-পারে, তাহলে পার্কের উদ্দেশ্য সাধন হবে কীভাবে ?
ভুবনেশ্বরের সেনসরি পার্কে গেটটি তালা বন্ধ ৷ ভিতরে খেলার সরঞ্জামগুলি ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে, চারদিকে গাছপালা ছেয়ে গিয়েছে এবং অস্বস্তিকর নীরবতা- যদিও এই জায়গাটি দিব্যাঙ্গ শিশুদের হাসির আওয়াজে মুখরিত হয়ে ওঠার কথা ছিল ৷
2022 সালের মে মাসে শহিদ নগর এলাকায় এই সেনসরি পার্কটির সূচনা করা হয়েছিল ৷ বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের আনন্দের জন্য এই জায়গাটি উৎসর্গ করা হয়েছিল ৷ শহরে এরকম অভিনব পার্ক আর ছিল না তখন ৷ কিন্তু দু-এক বছরের মধ্যে যে জায়গাটি শিশুদের নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৈরি হয়েছিল, সেটিই এখন হয়ে উঠেছে প্রবেশ-অযোগ্য এবং অ-সুরক্ষিত ৷
বড় গাছগুলি উপড়ে ফেলা হয়েছে ৷ পুরো পার্ক জুড়ে ঝোপঝাড় ৷ খেলার সরঞ্জামগুলিও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে ৷ দোলনাগুলিতে মরচে পড়ে গিয়েছে ৷ যে খেলার সরঞ্জামগুলি শিশুদের উজ্জীবিত করার জন্য ছিল, সেগুলি রোদ, বৃষ্টি এবং ধুলোয় নষ্ট হয়ে গিয়েছে ৷
পার্কগুলির ভিতরে পথকুকুরদের ঘুরে-বেড়ানো নিয়ে উদ্বিগ্ন শিশুদের অভিভাবক থেকে স্থানীয়রা ৷ এলাকার এক বাসিন্দা সস্মিতা দাস বলেন, "যখন এই পার্কটির উদ্বোধন হয়, তখন আমরা খুব আনন্দ পেয়েছিলাম ৷ ভেবেছিলাম, বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের জন্য় এই পার্কটা আশীর্বাদ ৷ কিন্তু বেশির ভাগ সময় পার্কের দরজায় তালা লাগানো থাকে ৷ আমরা শিশুদের নিয়ে পার্কে ঢুকতে গেলে নিরাপত্তাকর্মীরা আমাদের সংশ্লিষ্ট স্কুল থেকে আবেদনপত্র নিয়ে আসতে বলে ৷ ভিতরে লক্ষ লক্ষ টাকার জিনিসপত্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ৷ এদিকে পার্কের বাইরে থেকেই অনেকে ফিরে যাচ্ছে ৷ কর্তৃপক্ষের এই দিকটিতে নজর দেওয়া উচিত ৷"
শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা কীভাবে অবহেলার শিকার, সেনসরি পার্ক তো তার একটি মাত্র উদাহরণ ৷ এরকম আরও বহু পার্ক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ওড়িশার বিভিন্ন শহরে ৷ যেখানে শহরে শিশুদের জন্য নিরাপদ জায়গা একটা বিরল ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে ৷ এখন শহর লম্বালম্বি এবং আড়েও বেড়ে উঠছে ৷ সর্বত্র শুধু কংক্রিটের বহুতল ৷ তাই খোলা মাঠ এবং খেলার জায়গা সীমিত হয়ে গিয়েছে ৷

অভিভাবকরা বুঝতে পারছেন, তাঁদের শিশুরা এখন সারাদিন মোবাইল দেখছে, কম্পিউটারের স্ক্রিনে আবদ্ধ হয়ে রয়েছে ৷ কারণ, দৌড়োদৌড়ি, ওঠানামা, নতুন কিছু উদ্ভাবন এবং খেলতে খেলতে শেখার বিষয়টি এখন অতীত হয়ে গিয়েছে ৷ পার্ক এবং খেলার মাঠগুলি শুধু গাফিলতির চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ৷
অধিকাংশ পার্কেই এই অবহেলার ছাপ স্পষ্ট- ভাঙাচোরা ছাউনি, ফাটল ধরা স্লাইড, মরচে পড়া লোহার রড, ক্ষতিগ্রস্ত মেঝে এবং অপর্যাপ্ত আলোক ব্যবস্থা ৷
সরকারি তথ্য অনুযায়ী ভুবনেশ্বরে প্রায় 200টি পার্ক রয়েছে ৷ 2.5 একরের বেশি জায়গা নিয়ে তৈরি পার্কগুলি ভুবনেশ্বর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডিএ)-এর আওতাধীন ৷ এছাড়া 184টি পার্ক ভুবনেশ্বর মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (বিএমসি) রক্ষণাবেক্ষণ করে ৷ এতগুলি পার্ক থাকা সত্ত্বেও ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েই গিয়েছে ৷
ইন্দিরা গান্ধি পার্কের ভিতরে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক অভিভাবক গুলাম মইনুদ্দিন ৷ তিনি জানালেন, আধুনিক শহুরে জীবনের জন্য পার্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ ৷ তিনি বলেন, "শহরগুলিতে পার্ক ভীষণভাবে প্রয়োজন ৷ বিশেষত যেসব শিশুরা অ্যাপার্টমেন্টের মধ্যে বাস করে, তাদের ক্ষেত্রে পার্কই একমাত্র জায়গা, যেখানে তারা খোলা আকাশের নীচে খেলাধুলো করতে পারে ৷ আর এটা শারীরিক ও মানসিক উন্নতির জন্য শিশুদের প্রয়োজন ৷ কিন্তু পার্কে স্থাপিত খেলাধুলোর সরঞ্জামগুলি যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ হয় না ৷ তাই শিশুরা যখন খেলছে, তখন সবসময় তাদের উপর নজর রাখতে হয় ৷"
কয়েকজন অভিভাবকের অভিযোগ, মেঝের টাইলসগুলো আলগা হয়ে গিয়েছে, তাই শিশুরা খেলতে গিয়ে আঘাত পায় ৷ কয়েকটি পার্কে আলোর ব্যবস্থা যথেষ্ট নেই ৷ অন্ধকার নামলে সমাজ-বিরোধী কাজকর্মের আঁতুড়ঘর হয়ে ওঠে এই পার্ক ৷ এই নিয়ে উদ্বিগ্নি স্থানীয়রা ৷
জরুরি অবস্থার প্রস্তুতি নিয়েও দুশ্চিন্তা প্রকাশ করলেন মইনুদ্দিন ৷ তিনি বলেন, "অধিকাংশ পার্কে লোহার তৈরি সরঞ্জাম রয়েছে ৷ সেখানে রক্ষণাবেক্ষণ হওয়াটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৷ কারণ বৃষ্টির জলে লোহার উপর মরচে ধরে যায় ৷ প্রতিটি পার্কে একটা প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকা উচিত ৷ যে কোনও সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে ৷"
এই পার্ক সংক্রান্ত আলোচনা শিশুদের মধ্যে 'নিষ্ক্রিয় জীবনধারা' গড়ে ওঠার স্বাস্থ্যগত উদ্বেগগুলি তুলে না-ধরলে অসম্পূর্ণই থেকে যাবে ৷ সৌরভ প্রতিদিন সকালে পার্কে যান ৷ তিনি বলেন, "ইদানীং শিশুরা বাড়িতে মোবাইল ও কম্পিউটারে গেম খেলেই সময় কাটিয়ে দেয় ৷ এই কারণে শিশুদের মধ্যে ওবেসিটি বেড়ে চলেছে ৷ কোনও শারীরিক কসরৎ নেই ৷ খেলাধুলোর অভাবে শিশুরা অলস ও ঘরকুনো হয়ে গিয়েছে ৷"
রক্ষণাবেক্ষণের অভাব প্রসঙ্গে ভুবনেশ্বরের মেয়র সুলোচনা দাস জানালেন, পার্কগুলির তদারকির জন্য একটি সুসংসহত নাগরিক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে ৷ মেয়র বলেন, "আমরা স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং রেসিডেন্ট ওয়েলফেয়ার অ্য়াসোসিয়েশনগুলিকে বিএমসি-র অধীনে থাকা পার্কগুলির দেখাশোনার জন্য নিযুক্ত করেছি ৷ মাসিক বেতন দিয়ে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর একজন সুপারভাইজারকে নিয়োগ করেছিল বিএমসি ৷ শিশুদের সুরক্ষার পাশাপাশি সবুজায়ন বৃদ্ধি করাটাই আমাদের কাছে অগ্রাধিকার ৷"
তবে তালা লাগানো গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবার অথবা ক্ষতিগ্রস্ত খেলার সরঞ্জাম, নীতি বাস্তবায়নের আশ্বাস এবং প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা অন্যকিছু বলে ৷
দেওয়ালের লেখাটা পরিষ্কার
ডিজিটাল বিনোদনের দখলদারি তরুণ প্রজন্মের জীবনে জাঁকিয়ে বসেছে ৷ কারণ শারীরিক খেলাধুলোর পরিবেশের ক্রমাবনতি হচ্ছে ৷ এই ধারা বদলে দেওয়া এটাই কি উপযুক্ত সময় নয় ?
পুরী: কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি পার্কগুলি অবহেলার শিকার
পর্যটনের জন্য বিখ্যাত পুরী শহরে পার্কের মতো জন পরিসরগুলির অবস্থা— বিশেষত শিশুদের জন্য তৈরি জায়গাগুলির ক্ষেত্রে অত্যন্ত হতাশাজনক ৷ স্থানীয়রা এই প্রকল্পগুলিকে 'ব্যর্থ বিনিয়োগ' হিসেবে দাগিয়েছেন ৷ বর্তমান পরিস্থিতি বছরের পর বছর ধরে চলে আসা অবহেলার চিত্রকেই জানান দিচ্ছে ৷
স্থানীয়রা জানালেন, শিশুদের খেলাধুলো, বিশ্রাম নেওয়া ও বিনোদনের জন্য যে জায়গাগুলি তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলি এখন ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায়, ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ হয়ে পড়ে রয়েছে ৷ সর্বোপরি মানুষ এই পার্কগুলির কথা ভুলেই গিয়েছে ৷
অনেক পার্কেই খেলার সরঞ্জামগুলি নষ্ট করা হয়েছে ৷ পার্কজুড়ে বুনো আগাছা গজিয়েছে ৷ কোথাও কোথাও আগাছায় পরিপূর্ণ পার্ক চত্বর সাপ ও সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীর আবাসস্থল হয়ে উঠেছে ৷ স্থানীয়রা এর জন্য প্রশাসনিক গাফিলতিকেই দায়ী করেছে ৷ কারণ এই পার্কগুলি জনসাধারণকে ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না ৷
এদিকে বিপুল সরকারি খরচে এই পার্কগুলি তৈরি হয়েছিল, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ৷ রাজ্য সরকারের মুক্তা প্রকল্পের আওতায় 2021 সালের নভেম্বরে 7.17 কোটি টাকা 205টি প্রোজেক্টের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল ৷ এই প্রোজেক্টগুলির উদ্দেশ্য ছিল পুরী পুরনিগমের আওতায় থাকা 25টি কিন্ডারগার্টেনের উন্নয়নের জন্য ৷ প্রতিটি কিন্ডারগার্টেনের জন্য প্রায় 14 লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে বলে খবর ৷

এর লক্ষ ছিল, জনপরিসরে শিশুরা খেলবে, সাধারণ মানুষ আসবে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়ির বাইরে সেখানে সময় কাটাবে ৷
এক স্থানীয় সিদ্ধান্ত রায় স্মৃতিচারণ করে এবং জানান, তিন বছর আগে পুরী শহরের বিভিন্ন জায়গায় কিন্ডারগার্টেন তৈরির কাজ শুরু করেছিল সরকার ৷ দখলীকৃত সরকারি জমি পুনরুদ্ধার করে সেগুলিতে শিশুদের পার্ক তৈরি করা হয় ৷ তিনি বলেন, "এর উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের খেলার জায়গা দেওয়া ৷ যাতে শিশুদের বৌদ্ধিক বিকাশ হয় ৷ তারা শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে বেড়ে ওঠে ৷ মানুষ এই জায়গাগুলিতে এসে প্রার্থনা করতে পারেন অথবা শুধুই বিশ্রাম নিতে পারেন ৷"
কিন্তু তাঁর অভিযোগ, খারাপ ব্যবস্থাপনার ফলে কোনও কিছুই দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে না এখানে ৷ সিদ্ধান্ত বলেন, "পুরী পুরনিগমের অব্যবস্থার ফলে অনেকগুলি পার্ক পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে রয়েছে ৷ কোটি কোটি টাকা খরচ করে এই পার্কগুলি তৈরি করা হয়েছিল ৷ কিন্তু কে লাভবান হচ্ছে ?" তিনি আরও জানালেন, আরও হৃদয়বিদারক যেটা, পুরী মহানগর পুরনিগমের মর্যাদা পেয়েছে ৷
এই পার্কগুলির পুনরুদ্ধারের আবেদন নিয়ে তিনি জেলা প্রশাসনের কাছে দরবার করেছিলেন ৷ তিনি বলেন, "পার্কগুলি দেখাশোনার ভার কোনও বেসরকারি সংস্থা বা স্থানীয় ক্লাবের সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হোক ৷ এর ফলে পার্কগুলির যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হবে ৷"
এই সমস্যা শুধু পাড়ার পার্কগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, চক্রতীর্থ সমুদ্র সৈকতে পর্যটনের দিকটি মাথায় রেখে একটি পার্ক তৈরি হয়েছিল, যা এখন বেহাল অবস্থায় পড়ে রয়েছে ৷ 2021 সালে চক্রতীর্থ পার্কের নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ৷ 2023 সালে তা শেষ হয় ৷ এর জন্য প্রায় 3 কোটি টাকা খরচ হয়েছে ৷ পার্কে রাজ্যের বাইরে থেকে আসা পর্যটক এবং স্থানীয় পর্যটকদের বিনোদন ও সুবিধার কথা মাথায় রেখে নানাবিধ ব্যবস্থা করা হয়েছে ৷ জামাকাপড় বদলানোর ঘর, শৌচালয়, পানীয় জলের ব্যবস্থা, বিনোদনের পার্ক, একটি ওপেন জিম এবং শিশুদের খেলার সরঞ্জাম আছে ৷
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই পরিকাঠামোগুলি দীর্ঘ দিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে ৷ নির্মাণ আরম্ভের তিন বছরেরও বেশি সময় পরে আজও পার্কটি পুরোপুরি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়নি ৷ ব্যবস্থাপনার অভাবে জিমের সরঞ্জামগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে রয়েছে, শিশুদের দোলনার উপর মরচে ধরেছে এবং প্রাথমিক সুযোগ-সুবিধাগুলির এতটাই দুরবস্থা যে, মেরামতের ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছে ৷
জামাকাপড় বদলানোর ঘরগুলি এবং শৌচালয় তালাবন্ধ অবস্থায় রয়েছে ৷ সমুদ্রে স্নান সারার পর জামাকাপড় পাল্টানোটা মহিলা পর্যটকদের কাছে একটা চ্যালেঞ্জের মতো ৷ কারণ ঘরগুলিই তো পাওয়া যায় না ৷
এলাকাবাসীরা ভয়ের পরিবেশের কথাও বলেছেন ৷ আলোকব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সন্ধ্যায় অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চলগুলিতে অসামাজিক কাজকর্ম করা থেকে মদের নেশা হয় বলে অভিযোগ ৷ এর সঙ্গে সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের হেনস্থা করা হয়, এমনকী চুরির ঘটনাও ঘটে থাকে ৷
পুরীর এক বাসিন্দা হেক্টর মিশ্র মনে করেন, প্রজেক্ট বাস্তবায়িত করার ক্ষেত্রে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার অভাবের কারণে এই দুরবস্থা ৷ তাঁর পরামর্শ, "এর জন্য কয়েকজন অযোগ্য আধিকারিকরা দায়ী ৷ পুরীকে মহানগর পুরসভার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আর কিছুই পরিবর্তন হয়নি ৷ প্রজেক্টগুলি এমনভাবে করা উচিত, যাতে মানুষ উপকৃত হয় ৷ অন্যথায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে যে প্রজেক্ট তৈরি হচ্ছে, তা মানুষের কোনও কাজে লাগছে না ৷"
তিনি বলেন, "পরিত্যক্ত পার্কগুলিকে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং ক্লাবের হাতে তুলে দিতে হবে ৷ তাতে হয়তো পার্কের অবস্থা অনেকটাই উন্নত হবে ৷ " এই সমস্যা নিয়ে পুরীর কালেক্টর দিব্যজ্যোতি পারিদা বলেন, "আমরা পার্কগুলির রক্ষণাবেক্ষণকে গুরুত্ব দিচ্ছি ৷ আরও অনেক লোকজন নিয়োগ করা হবে এবং পার্কের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা হবে ৷ পার্কগুলির সরঞ্জাম মেরামতির পর ফের পার্ক খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ৷" তিনি একমাস সময়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, "আমি নিশ্চিত আগামী মাসের মধ্যে পার্কের সমস্যাগুলির সমাধান হয়ে যাবে ৷"
তালা লাগানো পার্কের বাইরে অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলির অথবা জরাজীর্ণ, ক্ষতিগ্রস্ত জনপরিসরে বিচরণ করছেন যাঁরা, তাঁদের মোক্ষম প্রশ্ন, আগামী প্রজন্ম খেলার মাঠ হারিয়ে ফেলার আগেই মেরামতি হবে তো ?
বরহমপুর: কোনও যত্ন ছাড়াই পার্কগুলি বেঁচে আছে
বরহমপুরে পার্কগুলি শহরের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ৷ কিন্তু এখানকার কাহিনিও খুব ভালো নয় ৷
শহরের পার্কগুলিতে সাধারণত সকালে প্রাতঃভ্রমণে আসা এবং প্রবীণরা ছাওয়ায় এককোণে বসে থাকার ছবি চোখে পড়ে ৷ সন্ধ্যার সময় অভিভাবকরা ছোট শিশুদের নিয়ে আসেন ৷ এমনকী ছাত্রছাত্রীরাও রোজের ভিড় থেকে দূরে কিছুটা সময় কাটায় ৷
গান্ধি পার্ক, বিজু পটনায়েক পার্ক, রামলিঙ্গম প্রমোদ গার্ডেন এবং নেহরু পার্কের রক্ষণাবেক্ষণ সারা বছর ধরে করে পুর কর্তৃপক্ষ এবং উন্নয়ন এজেন্সিগুলি ৷ এখানে ভিড় লেগেই থাকে ৷ শহরের প্রধান পার্কগুলির বাইরে তাকালে জানা যাবে, এখানে পার্কগুলি ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত ৷ শিশুদের পার্ক এবং পাড়ার বিনোদন কেন্দ্র-সহ বেশিরভাগ ছোট পার্কই জরাজীর্ণ, অব্যবহৃত অথবা পরিত্যক্ত ৷
হিলপটনা এবং আশেপাশের এলাকার বাসিন্দারা নিয়মিত নেহরু পার্কে যাতায়াত করেন ৷ পুরনো পরিকাঠামো, অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উদ্বেগের সেই একই পুরোনো চিত্র দেখা যায় ৷
এলাকার এক অভিভাবক সুচিত্রা পাণ্ডা জানান, পার্কগুলি বিনোদনের জায়গা নয় ৷ তিনি বলেন, "পার্কগুলি মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৷ কিন্তু শহরের অনেক পার্কে খেলার সরঞ্জামগুলি ভেঙেচুরে পড়ে আছে ৷ কয়েকটি জায়গা নিরাপদ নয় ৷ পুরনো সরঞ্জামগুলির নিয়মতি রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন ৷ নতুন সরঞ্জাম স্থাপন করা দরকার, ঘাসগুলি সুন্দর করে ছেঁটে মসৃণ করা এবং আরও চারাগাছ রোপণ দরকার ৷"
তিনি পার্ক চত্বরে মশা, সাপ ও অন্যান্য সরীসৃপ প্রাণীর উপদ্রবের কথাও তোলেন ৷ এর ফলে পার্কে শিশুরা খেলতে যেতে পারে না ৷ তিনি বলেন, "সুরক্ষিত এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য প্রশাসনের অবিলম্বে পার্কের ব্যবস্থাপনা ও সৌন্দর্যায়নের উপর নজর দেওয়া উচিত ৷"
আরেক অভিভাবক অমৃতা পানিগ্রাহী আক্ষেপ করেন, শহরে শিশুদের খেলার জায়গা একেবারে সীমিত ৷ তাঁর কথায়, "আমি আমার সন্তানের সঙ্গে পার্কে যাই ৷ কিন্তু জায়গাটা খুব ছোট এবং আলোর ব্যবস্থা অত্যন্ত খারাপ ৷ শিশুরা মাটিতে খেলে ৷ তাই ফিভার ব্লক দিয়ে ঢাকা দেওয়ার দরকার ৷ এছাড়া পার্কগুলি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাটাও গুরুত্বপূর্ণ ৷"
ছাত্রছাত্রীরাও পার্ক নিয়ে তাঁদের ক্ষোভের কথা উগরে দিলেন ৷ চিত্রা শেঠি নানা সময়ে মন ভালো করতে পার্কে যান ৷ তিনি জানালেন, পার্কগুলির পরিকাঠামো খুব খারাপ ৷ কোনও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না ৷ চিত্রা বলেন, "পার্কের অনেক সরঞ্জামই ভাঙা অবস্থায় পড়ে রয়েছে ৷ শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট পার্কে পর্যাপ্ত আলোর প্রয়োজন ৷"
এই দাবিগুলি অসাধারণ কিছু নয় ৷ সুরক্ষিত সরঞ্জাম, পরিচ্ছন্ন মাঠ, আরও ভালো আলোর ব্যবস্থা এবং রক্ষণাবেক্ষণ চালু রাখা- এগুলি মানুষের খুব প্রাথমিক চাহিদা ৷ কিন্তু কবে এবং খকন বরহমপুরে সেগুলি কার্যকর হবে, সেটাই দেখার ৷

কটক: খেলার মাঠে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ
কটকে পার্কের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায় ৷ সম্প্রতি, উড়িষ্যা হাইকোর্ট কটক ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (সিডিএ) এবং কটক মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (সিএমসি) দ্বারা পরিচালিত শহরের পার্কগুলিতে পানীয় জল এবং অন্যান্য মৌলিক সুবিধার অভাবের বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ করেছে । আদালত আগেও বিষয়টি আমলে নিয়েছিল ৷
বিচারপতি কৃষ্ণা রাম মহাপাত্র এবং বিচারপতি ভি নরসিমহার বেঞ্চে শুনানির সময় আদালত শহরের পার্কগুলির দুরবস্থা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ৷ বিশেষত পানীয় জলের অভাব, পরিচ্ছন্ন শৌচালয় ও অবশ্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগুলির না-থাকা নিয়ে ৷ বিজু পটনায়েক পার্ক-সহ সমস্ত পার্কে বেহাল নিকাশি ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত আলোর অভাব নিয়েও উদ্বেগের কথা জানায় হাইকোর্ট ৷
সরকারি আধিকারিকরা আদালতে আশ্বাস দেন, যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে ৷ সব পার্কে পানীয় জল এবং নিকাশি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে ৷ এর বাস্তবায়ন ও তা ঠিকঠাক হয়েছে কি না, সেই সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছে ৷ পার্কের মৌলিক সুবিধাগুলির জন্য যদি আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়, তাহলে এটা বোঝা যায় যে মিলেনিয়াম সিটি কটকের দুর্দশা কতটা গভীরে ৷
কটক পুরনিগমের মেয়র সুভাষ সিংকে প্রশ্ন করা হলে তিনি অর্থনৈতিক চাপানউতোরের কথা উল্লেখ করেন ৷ তিনি আশ্বস্ত করেছেন, "শহরের একশো পার্ক রয়েছে ৷ এই সব পার্কগুলির দেখাশোনার জন্য যথেষ্ট অর্থ নেই সিএমসি'র কাছে ৷ যে পার্কগুলি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে, এর মধ্যেও আমরা সেই সমস্যাগুলির সমাধানের চেষ্টা করব ৷"
ভুবনেশ্বর, পুরী, বরহমপুর এবং কটক- সর্বত্র একটি সাধারণ উদ্বেগ, শিশুরা তাদের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ৷ তবে এই সবকিছুর মধ্যে গভীরতম পরিহাসটি হল ভুবনেশ্বরের সেনসরি পার্ক ৷
কংক্রিটের সাম্রাজ্য, ডিজিটাল নির্ভরতা এবং বাইরে খেলাধুলার সীমিত স্বাধীনতার মাঝে বেড়ে ওঠা মিলেনিয়াল প্রজন্মের শিশুদের কাছে পার্কগুলো এখন আর কেবল সাধারণ কোনও জনসুবিধা নয়; বরং শহুরে শৈশবের অবশিষ্ট শেষ কয়েকটি খেলার মাঠের অন্যতম হয়ে উঠতে পারে এগুলো ৷

