ETV Bharat / bharat

কর্ণাটকের শিমোগা ট্রি পার্কের সবুজায়নের গভীরে লুকিয়ে শিশুর মৃত্যু ও সুরক্ষার অভাব

12 একর জমির উপর তৈরি শিমোগা পার্কটি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় ৷ কিন্তু প্রশ্নে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, প্রাথমিক ব্যবস্থার অভাব আর এক শিশু মৃত্যুর ঘটনা ৷

Karnataka Tree Park
কর্ণাটকের শিমোগা ট্রি পার্ক (ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : May 30, 2026 at 9:02 AM IST

7 Min Read
Choose ETV Bharat

সারা ভারতের শহর ও শহরতলি, পার্কগুলি এখন বিনোদন ও অবহেলার মধ্যে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়ে গিয়েছে ৷ ভাঙাচোরা খেলার সরঞ্জাম, খোলামেলা জনপরিসর না-থাকা এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগই উঠে এসেছে 'দ্য লাস্ট প্লেগ্রাউন্ড' প্রচারে ৷

শিমোগার আরও কিছু বলার আছে, যা উপর উপর দেখা বোঝা যায় না ৷ এখানে সবুজায়নের অনুপস্থিতি নয়, সমস্যা তার থেকেও গভীরে ৷

শিবামোগ্গা তালুকে 206 নম্বর জাতীয় সড়কের কাছে 12 একর জায়গাজুড়ে রয়েছে থিম্মাক্কা ট্রি পার্ক ৷ সবুজ-শ্যামল ও ছায়াঘেরা এক মনোরম স্থান, যা চোখের জন্যও অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক । গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে মানুষের জীবন যখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে, ঠিক সেই সময় চারপাশের এই ঘন সবুজ পরিবেশ যেন এক বাড়তি পাওনা ৷ পার্কের ভিতরে নির্মিত 'পারগোলা' বা ছাদযুক্ত মাচাগুলি রোদ-বৃষ্টিতে আশ্রয় দেয় ৷ আম, পেয়ারা এবং বিভিন্ন শোভাবর্ধনকারী গাছের পাশাপাশি এখানে ভারত ও বিদেশের নানা প্রজাতির বাঁশ গাছও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ৷ পুরো পার্ক জুড়ে হাঁটার পথ তৈরি করা হয়েছে, যা শিশু, পর্যটক এবং প্রকৃতিপ্রেমীদের কথা মাথায় রেখে বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছে ৷

এক ঝলক দেখলে মনে হবে, জনবিনোদনের জায়গার তো ঠিক এমনই হওয়া উচিত ৷ কিন্তু উপরের এই সৌন্দর্যকে সরিয়ে ভিতরে তাকালেই আপনি এমন কিছু সমস্যা রয়েছে, যা একইসঙ্গে পরিচিত এবং উদ্বেগজনক ৷

ভাঙাচোরা খেলনার সরঞ্জাম, পানীয় জলের অভাব, পার্কে ঘুরতে আসা মানুষদের জন্য সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং 2024 সালের সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ৷ সেই কারণে প্রায় দেড় বছর বন্ধ ছিল এই পার্ক এবং এই পরিস্থিতি একজনের মনে অস্বস্তি তৈরি করবে ৷

একটা দুর্ঘটনা, যা পার্ককে বদলে দিয়েছে

2024 সালে একটি 4 বছর বয়সি শিশু পরিবারের সঙ্গে পার্কে ঘুরতে এসেছিল ৷ হঠাৎ তার উপর একটি পশু মূর্তি ভেঙে পড়ে এবং তার মৃত্যু হয় ৷ জানা গিয়েছে, ওই শিশুটি একটি হরিণের মূর্তির উপর বসে ফোটো তুলছিল ৷ মুহূর্তে ওই মূর্তিটি ভেঙে পড়ে ৷ গুরুতর আহত হয় শিশুটি ৷ সঙ্গে সঙ্গে তার চিকিৎসা শুরু হয় ৷ কিন্তু শিশুটিকে বাঁচানো যায়নি ৷

এই দুর্ঘটনার পর ট্রি পার্কটি বন্ধ করে দেওয়া হয় ৷ পরে 2025 সালের শেষদিকে জনসাধারণের জন্য পার্কটি খুলে দেওয়া হয় ৷ কিন্তু দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার কারণে পার্কের ভিতরে আগাছা জমে গিয়েছে ৷ পরে সেই সব আগাছা কেটে ফেলা হয় ৷ স্থানীয়দের বক্তব্য, পার্কটি এখনও পর্যটক ও ভ্রমণকারীদের জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারেনি ৷ যাঁরা এই পার্কে ঘুরে মনোরম পরিবেশের প্রশংসা করেন, তাঁদের মনেও ওই দুর্ঘটনা একটা সতর্কবাণীর মতো জেগে থাকে ৷

Karnataka Shimoga Tree Park Accident
দুর্ঘটনা ও তার পরে প্রভাব (ইটিভি ভারত)

মান্ড্য থেকে ঘুরতে আসা এক পর্যটক বিজয়লক্ষ্মী জানালেন, তাঁর আত্মীয় তাঁকে এই পার্কে ঘুরতে নিয়ে এসেছেন ৷ তিনি মতে এটা ঘোরার জায়গা ৷ তাঁর কথায়, "পার্কটি সুন্দরভাবে পরিকল্পনা করে গড়ে তোলা হয়েছে ৷ প্রবল তাপে এই সবুজায়ন স্বস্তি দেয় ৷ হরিণের মূর্তিগুলি খুব আকর্ষণীয় ৷ কিন্তু আমি শুনেছি, এর আগে একটি শিশু একটি পশুর মূর্তির উপর বসেছিল ৷ সেটি ভেঙে পড়ে এবং শিশুটির মৃত্যু হয় ৷ মূর্তিগুলি নিরাপদ স্থানে স্থাপন করা উচিত ৷ শিশুদের শুধু ফোটো তোলার জন্য ওইভাবে বসানো উচিত নয় ৷"

পার্কে পানীয় জলের অভাবের কথাও বলেন তিনি ৷ বিজয়লক্ষ্মী বলেন, "শিশুরা এখানে খেলতে পারবে, খুব ভালো পরিবেশ ৷ কিন্তু শহর থেকে এত দূরে ৷ এখানে পানীয় জলের মতো প্রাথমিক সুবিধাটা থাকা উচিত ৷" পার্ক চত্বরে খেলার নানারকম সরঞ্জামে অবহেলার ছাপ সুস্পষ্ট ৷ কিছু কিছু সরঞ্জামে মরচে ধরে গিয়েছে ৷ অন্যগুলি হয় পুরনো হয়ে গিয়েছে আর নয়তো ভেঙেচুরে পড়ে রয়েছে ৷ পর্যটকদের অভিযোগ, পার্কটি জনপ্রিয় হলেও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না ৷

পার্কে আরও বেশ কিছু প্রাথমিক সুযোগ-সুবিধারও অভাব রয়েছে । পার্কটি জাতীয় সড়কের কাছে অবস্থিত এবং বিভিন্ন জেলা থেকে পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারীরা পার্কে আসেন ৷ কিন্তু সেখানে পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই, কোনও খাবার স্টল নেই এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সব ব্যবস্থারও অভাব রয়েছে ৷

হাসান জেলার বেলুর থেকে এসেছেন রাজেশ্বরী ৷ তিনি বলেন, "পার্কটি সুন্দর ৷ শৌচালয় এবং ওয়াশরুম আছে ৷ কিন্তু পানীয় জলের কোনও বন্দোবস্ত নেই ৷ গরমে দীর্ঘ সময় জল ছাড়া থাকা অত্যন্ত কষ্টের ৷ যত দ্রুত সম্ভব জলের ব্যবস্থা করা হোক ৷" তিনি অবশ্য পার্কের আরামদায়ক শান্তির পরিবেশের প্রশংসা করেছেন ৷

রাজেশ্বরী বলেন, "খেলার সরঞ্জামগুলির অবস্থা খুবই খারাপ ৷ শিশুরা এখানে খেলতে আসে ৷ কিন্তু অনেকগুলি খেলনা এবং খেলার সরঞ্জাম ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে ৷ সেগুলি মেরামত করতে পারলে আরও অনেক লোকজন এখানে ঘুরতে আসবে ৷"

আরেক পর্যটক বাণী মহেশ পার্কের বিশাল জায়গা এবং সবুজায়নের ভূয়সী প্রশংসা করেন ৷ পাশাপাশি তিনি এও বলেন, " একটি পার্কে সবুজ গাছপালা ভর্তি থাকলে, সেটা এমনিতেই মনে একটা প্রশান্তি এনে দেয় ৷ কিন্তু অন্য আরও কিছু বিষয় আছে, যা ঠিক করতে হবে ৷ যেমন শিশুদের জন্য দোলনা ও স্লিপগুলি ৷ কিছু সরঞ্জাম কোনও কাজই করে না ৷ আবার অনেক কিছু ব্যবহারের যোগ্য নয় ৷ খাবার জল, স্ন্যাক্স এবং ফল পাওয়া গেলে, সেগুলি কিনে খাওয়া যেত ৷"

পার্ক: অতীত ও বর্তমান

বাঘ-সিংহের অভয়ারণ্যের কাছে 2016 সালে মুড্ডিনাকোপ্পা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় পার্কটি তৈরি হয় ৷ জাতীয় সড়কের কাছে হওয়ায় বহু পর্যটকই পার্কে ঘুরতে আসেন ৷ এখানে শৌচাগার আছে ৷ গাছপালা ও সবুজায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জল সরবরাহের একটি গভীর নলকূপ (বোরওয়েল), একটি বাঁশ বাগান এবং ‘সিটি পার্ক’ নামে একটি বিশেষ অংশ রয়েছে—যেখানে বিচিত্র প্রজাতির বৃক্ষরাজি রয়েছে । পার্কটিতে প্রবেশের জন্য 10 টাকা প্রবেশ মূল্য ধার্য করা হয়েছে ৷ তা সত্ত্বেও, পর্যটকরা পার্কিং ব্যবস্থা, অভ্যন্তরীণ রাস্তার উন্নয়ন, সুসজ্জিত প্রবেশপথ, সিসিটিভি নজরদারি এবং গাছপালা শনাক্তকারী উন্নত তথ্যফলকের অভাব নিয়ে অভিযোগ করেন ৷ তাদের মতে, জাতীয় সড়কের সঙ্গে পার্কের প্রবেশপথ সংযুক্তকারী রাস্তার উন্নয়ন ও সৌন্দর্যায়ন প্রয়োজন ৷

বন দফতরের মেরামতির আশ্বাস

পর্যটকদের এই উদ্বেগের জবাবে শঙ্করা ফরেস্ট জোন ডিভিশনার ফরেস্ট অফিসার (ডিএফও) অজয়া জানালেন, দীর্ঘদীন বন্ধ থাকার পর অনেক কাজ করা শুরু হয়েছে ৷ 2024 সালের জানুয়ারি থেকে পার্কটি বন্ধ ছিল ৷ 2025 সালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং পুনর্গঠন করে ফের খোলা হয় ৷ তিনি বলেন, "খেলার সরঞ্জামগুলি-সহ পার্কটিকে পরিষ্কার করার পর ফের সাধারণের জন্য খোলা হয়েছে ৷ শিশুদের খেলার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে শৌচাগার, হাঁটার রাস্তা এবং পেরগোলা আছে ৷ মানুষ এগুলির সদ্ব্যবহার করুক ৷"

তিনি পার্কের বিশাল বাঁশগাছের সংগ্রহের দিকটি উল্লেখ করে পার্কের শিক্ষাগত মানের উপর জোর দেন ৷ এই পার্কে নানা ধরনের গাছ রয়েছে, যা থেকে প্রকৃতি সম্পর্কে অনেক কিছু শেখা যায় ৷ যদিও তিনি কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামোর কথা মেনে নিয়েছেন ৷ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার কারণেই সেগুলি ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে রয়েছে ৷

ডিএফও আশ্বস্ত করেছেন, "বছরখানেক পার্কটি বন্ধ ছিল ৷ অ্যাডভেঞ্চারের সরঞ্জামগুলির কোনও যত্ন নেওয়া হয়নি ৷ যত দ্রুত সম্ভব সেগুলি মেরামত করা হবে ৷ পানীয় জলের ব্যবস্থাও করা হবে ৷" অজয়া আরও জানান, বর্তমান অর্থবর্ষে ট্রি পার্কের সার্বিক উন্নয়ন করা হবে ৷

Karnataka Shimoga Tree Park Accident
দুর্ঘটনা ও তার পরে প্রভাব (ইটিভি ভারত)

দ্য লাস্ট প্লেগ্রাউন্ড: সবুজায়ন একাই যথেষ্ট নয়

দ্য লাস্ট প্লেগ্রাউন্ডের অন্য সব প্রতিবেদনগুলির থেকে শিমোগার থিম্মাক্কা ট্রি পার্কের কাহিনি আলাদা ৷ এই পার্কটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়নি ৷ এখানে সবুজ আছে ৷ ছায়া আছে ৷ জীববৈচিত্র্য আছে এবং শ্বাস নেওয়ার জায়গাটাও আছে ৷

কোনও জায়গার সৌন্দর্যায়ন দিয়ে তার নিরাপত্তা, সহজগম্যতা কিংবা যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা যায় না ৷ শুধু এমন একটা পার্ক নয়, যেটা দূর থেকে দেখলে ভালো লাগবে, এমন পার্ক মানুষ চায় না ৷ প্রয়োজন শিশুদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ, সুসংহত ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে এমন খেলার সরঞ্জাম, পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং নিরাপদ পরিকাঠামো—এমন সবকিছু, যা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ৷

শিমোগার পার্কে ঘরের বাইরে স্বস্তি পাওয়া যায় ৷ কিন্তু ওই শিশুটির মৃত্যুর কথা মনে এলে এবং বর্তমান ব্যবস্থাগুলি দেখলে তখনই এটা উন্নয়নের পথে একটা অসম্পূর্ণ ছবি হয়ে ওঠে ৷