হাসপাতালে তেহরান থেকে আসে অনুদান; খামেনেইয়ের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ আলিপুর
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবর পেতেই শোকস্তব্ধ আলিপুরের 25 হাজার এলাকাবাসী ৷ তিনদিন ধরে বন্ধ দোকানপাট, স্তব্ধ জনজীবন ৷

Published : March 3, 2026 at 1:21 PM IST
মহম্মদ রফিক মোল্লার প্রতিবেদন
বেঙ্গালুরু, 3 মার্চ: সালটা 1980 ৷ সেইবছর কাশ্মীরে যেমন খামেনেই এসেছিলেন তেমনই তিনি কর্ণাটকের আলিপুরেও গিয়েছিলেন ৷ ইরানের এই সদ্য় নিহত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার মৃত্যু ঘিরে দিকে দিকে শিয়া সম্প্রদায়ের তীব্র প্রতিবাদ চলছে ৷ জম্মু ও কাশ্মীর, উত্তরপ্রদেশ, লাদাখ থেকে দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকের রাস্তায় কালো পতাকা, আয়াতোল্লার প্রতিকৃতি নিয়ে শোকপ্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে বিক্ষোভকারীদের ৷ আলিপুরের গ্রামবাসীরা যে খামেনেইয়ের অবদান কিছুতেই ভুলতে পারছেন না ৷ কী সেই অবদান ? তুলে ধরল ইটিভি ভারত ৷
রবিবার ভোর নাগাদ ইরানের সংবাদমাধ্যমের তরফে জানা যায়, ইজরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক হামলার সময় খামেনেইয়ের মৃত্যু হয়েছে । তারপরই শুরু হয় দিকে দিকে প্রতিবাদ ৷ শিয়া মুসলিমদের কাছে আয়াতোল্লা আলী খামেনেই শুধু বিদেশি রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি ছিলেন 'মারজা-এ-তাকলিদ', অর্থাৎ ধর্মীয় অনুকরণের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস । বেঙ্গালুরু থেকে প্রায় 90 কিলোমিটার দূরে গৌরিবিদানুর তালুকের একটি ছোট গ্রাম আলিপুর ৷ খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই তিন দিন ধরে স্তব্ধ জনজীবন ।

গ্রামের রাস্তার নামকরণ ইরানের শহরের নামে- দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ৷ কাজকর্ম বন্ধ করে খামেনেইকে নিয়ে বিশেষ প্রার্থনা চলছে ৷ গ্রামের বাসিন্দারা আওড়ে চলেছেন ইরানের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ৷ এই গ্রাম ও তার আশপাশ মিলিয়ে প্রায় 25 হাজার মানুষজন শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত ৷ এই এলাকা ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের জন্য সমানভাবে স্বীকৃত । গ্রামের বেশ ক'য়েকটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে ইরানি শহর যেমন তেহরান, কোম এবং সিরাজের নামে । অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের ইরানে পাঠায় ধর্মীয় পাঠ, পড়াশোনা এবং উচ্চ শিক্ষার জন্য ৷

হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন খামেনেইয়ের- আলিপুরের লেখক এবং স্থানীয় ইতিহাসবিদ সৈয়দ নাতিক আলিপুরি বলছেন, "ইরানের সঙ্গে এ জায়গার সম্পর্ক গভীর । আমাদের গ্রাম ও ইরান শিয়া ধর্ম বিশ্বাসের বাইরেও বিস্তৃত । এই বন্ধন সভ্যতা, ঐতিহাসিক এবং আবেগভরা ৷ 1980 সালে আয়াতুল্লাহ খামেনেই কর্ণাটকের আলিপুর সফর করেছিলেন । সেই সফরে তিনি এই শহরে একটি হাসপাতাল তৈরির কথা বলে, ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেছিলেন ৷ তাঁর ওই সফরে আমাদের জন্য ওই হাসপাতাল তৈরির কথা শুধুই প্রতিশ্রুতি ছিল না পরে তা বাস্তবেও পরিণত হয়েছিল ৷"

তাঁর কথায়, "ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেইয়ের মৃত্যু এই গ্রামের বেশিরভাগ জনকেই অবাক করে দিয়েছে।" এরপরই কাঁপা কাঁপা গলায় সৈয়দ নাতিক বলেন, "ইরানের উপর আক্রমণ এবং আয়াতুল্লাহ খামেনেইয়ের শাহাদাতে (মৃত্যুবরণ) আমরা শোকাহত । ফিলিস্তিনের মজলুম মানুষের পক্ষে কথা বলা ও তাঁদের জন্য আওয়াজ তোলার কারণেই খামেনেইকে এমনভাবে টার্গেট করা হয়েছে ।" এই হামলাকে ইতিহাসবিদ 'প্রতারণা' হিসেবে অভিহিত করে বলেন, "ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই অন্যায় ভুলবে না ।"

এরপর তিনি ইরানের একটি স্কুল বোমা হামলার খবরেরও নিন্দা করেছেন । তাঁর কথায়, "যখন একটি স্কুলে শিশু হত্যা করা হয়, তখন তা শুধু দেশের উপর নয়, মানবতার উপর আক্রমণ । এই ধরনের কর্মকাণ্ড অত্যন্ত নিন্দনীয় ৷"
পরবর্তীতে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেইয়ের আলিপুরে তৈরি হাসপাতাল নিয়ে বিস্তারিতভাবে বলেন, "খামেনেইয়ের তরফে উদ্বোধন করা এই হাসপাতালে, মানুষ সর্বদা পরিষেবা পায় ৷ ইরানের সঙ্গে আলিপুরের সংযোগের যে প্রতীকগুলি রয়েছে তার মধ্যে একটি হল ইমাম খোমেনি হাসপাতাল (Imam Khomeini Hospital) ৷ এই হাসপাতাল ইমাম খোমেনি মেডিক্যাল ট্রাস্ট (Imam Khomeini Medical Trust) পরিচালিত । এখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করা হয় ।"

সবশেষে ইটিভি ভারতকে ওই ইতিহাসবিদ বলেন, "সাংস্কৃতিকভাবে, আলিপুর তার অনন্য ইতিহাসকে প্রতিফলিত করে । এখানকার অনেক মহিলারা ঐতিহ্য বজায় রেখে ইরানি স্টাইলের হিজাব অনুসরণ করেন । ইরানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং অর্থনীতিকে বিস্তৃত করে ৷"

