মাইলেজ কমছে, ইঞ্জিন নষ্ট হচ্ছে ? 'শুধু ইথানলকে দায়ী করা ঠিক নয়', জবাব কেন্দ্রের
E20 নিয়ে একগুচ্ছ 'ভুয়ো প্রচার' খণ্ডন করে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী তুলে ধরলেন বৈজ্ঞানিক তথ্য ৷

Published : July 4, 2026 at 12:51 PM IST
নয়াদিল্লি, 4 জুলাই: পেট্রলে 20 শতাংশ ইথানল (E20) মেশানো নিয়ে গত কয়েক মাসে একের পর এক বিতর্ক ছড়িয়েছে । কখনও দাবি করা হয়েছে, ইঞ্জিনের ক্ষতি হচ্ছে । কখনও বলা হয়েছে, গাড়ির মাইলেজ কমে যাচ্ছে, এমনকী বিমার বৈধতাও নাকি প্রশ্নের মুখে পড়ছে । এই আবহেই শুক্রবার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে প্রচলিত ধারণাকে ভ্রান্ত বলে দাবি করল কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক । সরকারের বক্তব্য, E20 কর্মসূচি কোনও পরীক্ষামূলক প্রকল্প নয়, বরং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং দীর্ঘ পরীক্ষার ভিত্তিতেই তা চালু করা হয়েছে ।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত অভিযোগ ছিল, ইথানল মেশানো পেট্রল ব্যবহারে গাড়ির মাইলেজ কমে যাচ্ছে । কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী বলেন, "এর জন্য শুধু ইথানল দায়ী নয়, এর পিছনে আরও একাধিক কারণ রয়েছে ।" তাঁর বক্তব্য, গাড়ির ইঞ্জিনের ধরন, চালানোর অভ্যাস, রাস্তার অবস্থা, যানজট, টায়ারের চাপ-সহ নানা বিষয় জ্বালানির স্থায়িত্বের উপর প্রভাব ফেলে । ফলে মাইলেজের সামান্য ওঠানামার জন্য একমাত্র ইথানলকে দায়ী করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয় ।
দাবির সমর্থনে অটোমোটিভ রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (ARAI)-র পরীক্ষার ফলও তুলে ধরেছে কেন্দ্র । প্রায় 40 হাজার কিলোমিটার চার চাকার এবং 20 হাজার কিলোমিটার দু'চাকার যানবাহনে E20 জ্বালানি ব্যবহার করে পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, চালানোর অভিজ্ঞতা বা ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি । মাইলেজে সামান্য পরিবর্তন দেখা গেলেও তা স্বাভাবিক সীমার মধ্যেই রয়েছে । বরং E20-র জন্য বিশেষভাবে তৈরি ইঞ্জিনে ইথানলের উচ্চ অকটেন মান আরও উন্নত কর্মক্ষমতা দিতে পারে বলে দাবি মন্ত্রকের ।
ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিয়েছে কেন্দ্র। ARAI, ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ পেট্রোলিয়াম এবং সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ান অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স (SIAM)-এর যৌথ সমীক্ষার উল্লেখ করে মন্ত্রক জানিয়েছে, ধাতব বা প্লাস্টিকের যন্ত্রাংশে E20-এর কোনও ক্ষতিকর প্রভাব পাওয়া যায়নি । তবে বহু পুরনো মডেলের কিছু গাড়িতে রাবারের নির্দিষ্ট অংশ তুলনামূলক দ্রুত বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে ।
ইথানল উৎপাদনে বিপুল জল অপচয়ের অভিযোগও খারিজ করেছে কেন্দ্র । সোশাল মিডিয়ায় প্রচার হয়েছিল, এক লিটার ইথানল তৈরিতে প্রায় 10 হাজার লিটার জল লাগে । মন্ত্রকের দাবি, বাস্তবে একটি আধুনিক ডিস্টিলারিতে প্রতি লিটার ইথানল উৎপাদনে প্রায় 3 থেকে 5 লিটার প্রক্রিয়াজাত জল ব্যবহৃত হয় ৷ অধিকাংশ কারখানাই জিরো লিকুইড ডিসচার্জ (Zero Liquid Discharge) প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই জল পুনর্ব্যবহার করে । পাশাপাশি, খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় মজুত রেখে তবেই উদ্বৃত্ত চাল ইথানল তৈরিতে ব্যবহার করা হয় । বর্তমানে উৎপাদনের 40 শতাংশেরও বেশি ভুট্টা থেকে হচ্ছে, যার জন্য ধানের তুলনায় অনেক কম জলের প্রয়োজন হয় ।
E20 ব্যবহারে গাড়ির ওয়ারেন্টি ও বিমা বাতিল হয়ে যাবে, এমন দাবিকেও ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে সরকার । তাদের বক্তব্য, যেসব যানবাহন E20 ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত, সেগুলির ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারী সংস্থা ও বিমা সংস্থাগুলির শর্তে কোনও পরিবর্তন হয়নি ।
প্রচলিত আরও কয়েকটি দাবিরও জবাব দিয়েছে কেন্দ্র । যেমন, ইথানলে চিনি থাকায় পিঁপড়ে বা মৌমাছি আকৃষ্ট হয়, এই দাবি সম্পূর্ণ অসত্য বলে জানিয়েছে মন্ত্রক । কারণ, জ্বালানি-গ্রেড ইথানল এমনভাবে পরিশোধিত হয় যাতে কোনও অবশিষ্ট চিনি থাকে না । উপরন্তু এতে এমন উপাদান মেশানো হয়, যা পোকামাকড়কে দূরে রাখে ।
এ ব্যাপারে পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে কেন্দ্র । তাদের দাবি, প্রতিটি ইথানল উৎপাদনকারী কারখানাকে কঠোর পরিবেশগত ছাড়পত্র, ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহারের নিয়ম এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের শর্ত মেনেই কাজ করতে হয় ।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, 2014-15 সাল থেকে ইথানল মিশ্রণ কর্মসূচির ফলে 1.9 লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছে ৷ 1.6 লক্ষ কোটি টাকার বেশি কৃষকদের হাতে পৌঁছেছে ৷ প্রায় 930 লক্ষ মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমেছে এবং 310 লক্ষ মেট্রিক টনেরও বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে ।
উল্লেখযোগ্যভাবে, নির্ধারিত সময়ের আগেই 2025 সালের ডিসেম্বর মাসে দেশে পেট্রলে 20 শতাংশ ইথানল মিশ্রণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে । 2013-14 সালে যেখানে মিশ্রণের হার ছিল মাত্র 1.5 শতাংশ, বর্তমানে তা পৌঁছেছে 20 শতাংশে । কেন্দ্রের দাবি, জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই কর্মসূচিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে ।

