ETV Bharat / bharat

বিতর্ক-মৃত্যুর অভিযোগের মাঝে SIR সময়সীমা বাড়াল কমিশন, 'রক্তের দাগ মুছবে না' তোপ তৃণমূলের

ভোটার তালিকা প্রকাশের সময়সীমা বৃদ্ধি করল নির্বাচন কমিশন ৷ চাপের মুখেই কি এই সিদ্ধান্ত, নয়া দিনক্ষণ ঘোষণা হতে উঠছে প্রশ্ন ৷

Election Commission of India
নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ (ফাইল ছবি: পিটিআই)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : November 30, 2025 at 12:46 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

নয়াদিল্লি, 30 নভেম্বর: বিরোধী দলগুলির চাপ ও বিতর্কের মাঝে ভোটার তালিকায় বিশেষ সংশোধনের সময় বৃদ্ধি করল নির্বাচন কমিশন ৷ 9 ডিসেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের কথা ছিল ৷ সেই তারিখ আরও সাতদিন পিছিয়ে 16 ডিসেম্বর করা হয়েছে ৷ পিছিয়ে গিয়েছে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের দিনও ৷ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের দিন 7 ফেব্রুয়ারি থেকে পিছিয়ে 14 ফেব্রুয়ারি করা হয়েছে ৷

রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল এই পদক্ষেপকে তাদের দীর্ঘদিনের দাবির 'নৈতিক জয়' হিসাবে দেখছে ৷ অন্যদিকে, বিজেপি বিষয়টিকে রুটিন প্রশাসনিক পর্যালোচনা বা 'অ্যাসেসমেন্ট'-এর অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে ৷ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, একাধিক রাজ্যে বিএলও-দের মৃত্যুর ঘটনায় এসআইআর আতঙ্ককে দায়ী করা হয়েছে ৷ বিভিন্ন রাজ্যের প্রবল আপত্তিতে কমিশন এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে ৷

গত 4 নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গ-সহ 9টি রাজ্য ও 3টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের এসআইআর প্রক্রিয়া চলছে ৷ এই সময়ের মধ্যে বুথ স্তরের আধিকারিকরা (বিএলও) বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনুমারেশন ফর্ম বিতরণ করছেন ৷ ভোটারদের কাছ থেকে এই ফর্ম সংগ্রহ করার শেষ তারিখ ছিল 4 ডিসেম্বর ৷ এই সময়সীমা এক সপ্তাহ বৃদ্ধি করেছে কমিশন ৷ 11 ডিসেম্বর ফর্ম সংগ্রহের শেষ দিন বলে একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে স্বশাসিত ভোট পরিচালন সংস্থা ৷

কমিশনের নির্দেশিকায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে, পোলিং স্টেশনগুলির পুনর্বিন্যাস বা র‍্যাশনালাইজেশনের কাজও সমান্তরালভাবে চলবে 11 ডিসেম্বর পর্যন্ত ৷ তথ্য ডিজিটাইজেশন বা আপডেটের কাজ চলবে 12 ডিসেম্বর থেকে 15 ডিসেম্বর পর্যন্ত ৷

বহু প্রতীক্ষিত খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের তারিখও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে ৷ নতুন সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী 16 ডিসেম্বর খসড়া তালিকা প্রকাশিত হবে ৷ এরপর 16 ডিসেম্বর থেকে 15 জানুয়ারি পর্যন্ত ভোটাররা দাবি ও আপত্তি (Claims and Objections) জানাতে পারবেন ৷ এই অভিযোগগুলির নিষ্পত্তির সময়সীমা ধরা হয়েছে 7 ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৷ সবশেষে, 2026 সালের 14 ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে বলে জানিয়েছে, কমিশন ৷

মাত্র এক মাস সময়ের মধ্যে এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটারদের মধ্যে এনুমারেশন ফর্ম বিতরণ ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে তা সংগ্রহ করতে গিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বিএলওরা ৷ এর সঙ্গে রয়েছে তথ্য আপলোড করার কাজ ৷ সবমিলিয়ে বিএলও-রা দিশেহারা হয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে ৷

তৃণমূল কংগ্রেস বারবার এই প্রক্রিয়ার সময় বৃদ্ধি ও সুষ্ঠুভাবে এই প্রক্রিয়া করা নিয়ে সরব হয়েছে ৷ গত 28 নভেম্বর তৃণমূলের 10 সাংসদের একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনের সদর দফতরে গিয়ে ফুল বেঞ্চের সঙ্গে দেখা করে ৷ এসআইআর আতঙ্কে রাজ্যে 40 জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে রাজ্যের শাসকদল ৷ সাংসদরা মৃতদের তালিকা মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে জমা দিয়েছেন ৷

কমিশন সূত্রে খবর, বাংলা ছাড়া রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, কেরল, গুজরাতের মতো রাজ্যে বিএলও-দের মৃত্যুতে এসআইআর প্রক্রিয়ার চাপকে দায়ী করেছে মৃতদের পরিবার ৷ রাজস্থানে আরএসএস (RSS) ঘনিষ্ঠ শিক্ষক সংগঠনগুলি কমিশনের কাছে জানিয়েছে, শিক্ষকরা বিএলও-র কাজ করতে গিয়ে চরম মানসিক ও শারীরিক চাপের মুখে পড়ছেন ৷ 12টি রাজ্য থেকে লাগাতার এই অভিযোগ পেয়ে এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করে কমিশন সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে ৷

এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই নির্বাচন কমিশনকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন তৃণমূলের রাজ্য সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার ৷ তাঁর মতে, এটা তৃণমূলের জয় বা পরাজয়ের বিষয় নয়, বরং কমিশনের চূড়ান্ত অদূরদর্শিতার প্রমাণ ৷ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচন কমিশন প্রথম থেকেই বিজেপির অঙ্গুলিহেলনে কাজ করছে ৷ তাদের চরম প্রস্তুতিহীনতা ও হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ৷ গায়ের জোরে এসআইআর চাপিয়ে দিতে গিয়ে তারা এখন পদে পদে নিজেদের নির্ঘণ্ট বদলাতে বাধ্য হচ্ছে ৷

রাজ্যে বিএলও'দের মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, "সাতদিন সময় বাড়িয়ে হয়তো কমিশন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে ৷ কিন্তু, এই প্রক্রিয়ার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে যে 35টি প্রাণ চলে গেল, তার দায় কে নেবে ? নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে এই রক্তের দাগ কোনও দিন মুছবে না ৷"

তৃণমূলের এই আক্রমণের পাল্টা জবাব দিয়েছেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা সুকান্ত মজুমদার ৷ তিনি কমিশনের এই সিদ্ধান্ত একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসাবেই দেখছেন ৷ তাঁর যুক্তি, যে কোনও বড় কাজ চলাকালীন বা ইমপ্লিমেন্টেশনের পর তার একটি অ্যাসেসমেন্ট বা পর্যালোচনা হয় ৷ কমিশন সেই পর্যালোচনা করেই সময়সীমা বাড়িয়েছে, এর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই ৷

বিএলও-দের উপর কাজের চাপের অভিযোগ নিয়ে প্রাক্তন বিজেপি রাজ্য সভাপতির মন্তব্য, "জীবন সবার আগে, তাই অহেতুক চাপ নেওয়া উচিত নয় ৷" তবে তিনি পাল্টা কটাক্ষ করেন, "চাপের নামে রাজনীতি করা হচ্ছে ৷ যেমন এক মহিলা কর্মীর আত্মহত্যার অভিযোগ উঠেছিল, পরে দেখা গেল তিনি চুক্তিভিত্তিক কর্মী ছিলেন ৷" সুকান্তর মতে, চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের কাজের অভ্যাস বা চাপ নেওয়ার ক্ষমতা সব সময় স্থায়ী কর্মীদের মতো হয় না ৷ অথচ, অনেক বিশেষভাবে সক্ষম বিএলও-রা নির্দিষ্ট সময়েই কাজ শেষ করেছেন ৷ তাই চাপ সবার জন্য সমান নয়, বরং মানসিকতা এবং অভ্যাসের উপর নির্ভর করে ৷