ETV Bharat / bharat

বিয়ের পর বিদেশে চলে যেতে চেয়েছিল ডাঃ শাহিন, জঙ্গি-যোগের পর মুখ খুললেন প্রাক্তন স্বামী

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ভারতে মহিলাদের মগজধোলাই করে জঙ্গি সংগঠনে নিয়োগের কাজ করত ডাঃ শাহিন ৷ এই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ, মেনে নিতে পারছে না পরিবার ৷

Faridabad White Collar Terror Module
বাঁ-দিক থেকে ডাঃ শাহিন, ডানদিকে প্রাক্তন স্বামী জাফর হায়াত (শাহিনের ছবি: পিটিআই এবং প্রাক্তন স্বামীর ছবি-ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : November 12, 2025 at 7:51 PM IST

6 Min Read
Choose ETV Bharat

কানপুর, 12 নভেম্বর: বোন জইশ-ই-মহম্মদের মহিলা শাখা জামাত-উল-মোমিনাতের নেতৃত্ব দিচ্ছে ৷ তদন্তকারীদের এই অভিযোগ বিশ্বাস করতে পারছেন না ধৃত ডাঃ শাহিনের দাদা মহম্মদ শোয়েব ৷ শুধু তিনিই নন, ফরিদাবাদের আল ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই চিকিৎসকের প্রাক্তন স্বামী ডাঃ জাফর হায়াতও মেনে নিতে পারছেন না ৷ তিনি কানপুরে কেপিএম হাসপাতালের চিকিৎসক ৷

সংবাদমাধ্যমে শাহিন সম্পর্কে তিনি জানান, সে কখনও বোরকা পরত না ৷ বিয়ের পর উন্নত জীবন যাপনের জন্য ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে থিতু হতে চেয়েছিল ৷ সন্তানদের প্রতিও যথেষ্ট যত্নবান ছিল অভিযুক্ত 'জইশ নেত্রী' শাহিন ৷ দম্পতির দুই সন্তান- একজন দ্বাদশ শ্রেণির ও অন্যজন দশম শ্রেণির পড়ুয়া ৷ তারা এখন ডাক্তার জাফর হায়াতের সঙ্গে থাকে ৷

ধৃত ডাঃ শাহিনের প্রাক্তন স্বামী জাফর হায়াত (ইটিভি ভারত)

সপ্তাহের শুরুতে হরিয়ানার ফরিদাবাদের ধৌজ এলাকায় একটি বাড়ি থেকে 2 হাজার 900 কিলো বিস্ফোরক পদার্থ উদ্ধার করে ফরিদাবাদ ও জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের যৌথ দল ৷ সোমবার সাংবাদিক বৈঠকে এই খবরটি জানান ফরিদাবাদের পুলিশ কমিশনার সতেন্দ্র কুমার গুপ্তা ৷ তিনি আরও জানান, এই বিপুল বিস্ফোরকের মধ্যে 360 কেজি অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বলে মনে করা হচ্ছে ৷

এই বিপুল বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া ডাক্তারদের মধ্যে একজন ডাঃ শাহিন ৷ সে এবং গ্রেফতার হওয়া অন্য দুই চিকিৎসক মুজাম্মিল শাকিল, মুজাম্মিল আহমদ গানাই ধৌজ এলাকার আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অবস্থিত মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে চাকরি করত ৷ বিস্ফোরকের পাশাপাশি ডাঃ শাহিনের গাড়ি থেকে মিলেছে AK-47 রাইফেল ৷ ইতিমধ্যে তাকে শ্রীনগরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ৷ সেখানে তাকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারী আধিকারিকরা ৷

কী বলছেন প্রাক্তন স্বামী ?

প্রাক্তন স্বামী জাফর হায়াত এদিন সংবাদসংস্থা পিটিআই-কে জানান, তিনি মাত্র গতকাল শাহিনের এই জঙ্গি-যোগের কথা জানতে পেরেছেন ৷ 2003 সালে তাঁদের বিয়ে হয় ৷ শাহিন ও তিনি আলাদা আলাদাভাবে ডাক্তারি পড়েছেন ৷ পেশায় তিনি শাহিনের সিনিয়র ৷ চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ জাফর বলেন, "2012 সালের শেষ দিকে আমাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয় ৷ কেন ও এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আমি জানি না ৷ আমাদের মধ্যে কোনও দিন ঝগড়া বা ঝামেলা কিছু হয়নি ৷ ও খুব সুন্দর ও যত্নশীল মানুষ ছিল ৷"

বিবাহবিচ্ছেদের পর তাঁর সঙ্গে শাহিনের আর কখনও কথা হয়নি ৷ জাফরের কথায়, "আমি ভাবতেই পারছি না, ও কোনও জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ৷ পরিবারের সঙ্গে ওর সম্পর্ক গভীর ছিল ৷ সন্তানদের খেয়াল রাখত ৷ তাদের পড়াশোনার দিকে নজর দিত ৷" বিয়ের পর শাহিন কখনও বোরখা পরত না, স্মৃতিচারণ করেন প্রাক্তন স্বামী ৷ তিনি বলেন, "ওকে কখনও বোরখা পরতে দেখিনি ৷ অনেক বছর আগে আমাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায় ৷ তারপর ও কী করেছে, আমি কিছু জানি না ৷"

বিদেশে গিয়ে পাকাপাকি বসবাসের প্রসঙ্গে হায়াত বলেন, "আমি শাহিনকে বলেছিলাম, আমরা এখানে ভালো আছি ৷ ভালো চাকরি করছি ৷ আমাদের সন্তান রয়েছে ৷ আত্মীয়রা আছেন ৷ সবকিছু এখানে ৷ দেশের বাইরে গেলে একা লাগবে ৷"

ডাঃ শাহিন জইশ-এর মহিলা শাখার নেত্রী

শাহিনকে অবশ্য জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের ওয়ান্টেড লিস্টে আগে থেকেই ছিল ৷ গত 19 অক্টোবর উপত্যকার বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনীকে হুমকি দিয়ে সাঁটানো পোস্টার চোখে পড়ে পুলিশের ৷ সেই সূত্রে পুলিশ শাহিনের সন্ধান পায় এবং তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল ৷ পরে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, মাসুদ আজহারের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদের মহিলা শাখার নেত্রী শাহিন ৷ ভারতে মহিলাদের মগজধোলাই করে জঙ্গি সংগঠনে নিয়োগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তার উপর ৷ তাকে বেছে নিয়েছিল স্বয়ং জইশ-প্রধান মাসুদ আজহারের নিকট আত্মীয় সাদিয়া আজহার ৷ তার স্বামী মৃত ইউসূফ আজহার আবার অপারেশন সিঁদুরে প্রাণ হারিয়েছিল ৷

এদিকে গত সোমবার, 10 নভেম্বর সন্ধ্যা 7টা নাগাদ দিল্লিতে লালকেল্লার সামনে সুভাষ মার্গ ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয় ৷ এই ঘটনায় অন্তত 12 জনের মৃত্যু হয়েছে ৷ গাড়িটি চালাচ্ছিল ডাঃ উমর নবি ৷ বিস্ফোরণে তারও মৃত্যু হয়েছে ৷ তার সঙ্গে এই 'হোয়াইট কলার টেরর মডিউল' ডাঃ শাহিনদের যোগাযোগ খুঁজে পেয়েছেন তদন্তকারীরা ৷ এই চিকিৎসকরা তাদের সম্মানীয় পেশার আড়ালে জইশ-ই-মহম্মদ ও আনসার গাজওয়াত-উল-হিন্দের হয়ে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চালিয়ে যেত ৷

শাহিনের দাদার বক্তব্য

লখনউয়ের আইআইএম রোডের বাসিন্দা ডাঃ শাহিনের এই জইশ-যোগ মেনে নিতে পারছে না তার পরিবারের সদস্যরা- বাবা, ভাই, প্রাক্তন স্বামী ৷ গাড়ি বিস্ফোরণের ঘটনার তদন্তে অভিযুক্ত ডাক্তারের বাবার কাছে গিয়েছিল পুলিশ ও জঙ্গি দমন শাখা (এটিএস), জানালেন তার দাদা মহম্মদ শোয়েব ৷ সংবাদসংস্থা পিটিআই-কে তিনি বলেন, "ওরা আমাদের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে ৷ স্বাভাবিক কিছু প্রশ্ন করেছে, যেমনটা আপনি এখন করছেন ৷ আমার বাবা বা আমার সঙ্গে কেউ খারাপ ব্যবহার করেননি ৷ শুধু জিজ্ঞাসা করছিল, কবে থেকে আমার বোন আমাদের সঙ্গে যোগযোগ বন্ধ করে দিল ৷" তিনি জানান, বিগত চার বছর ধরে বোনের সঙ্গে তাঁদের কোনও কথাবার্তা বা দেখা-সাক্ষাৎ কিছু হয়নি ৷ শোয়েব বলেন, "আমাদের মধ্যে কোনও যোগাযোগ ছিল না ৷ আমরা শেষ কথা বলেছি চার বছর আগে ৷ কিন্তু বাবা-মায়েরা তো স্বাভাবিক ভাবেই সন্তানের জন্য দুশ্চিন্তা করবেন ৷ আমি তার বড় দাদা, আমারও চিন্তা হত ৷"

লখনউয়ের আইআইএম রোডে ডাঃ শাহিনের বাড়ি ৷ সেখানে কখনও যাননি দাদা মহম্মদ শোয়েব ? এর উত্তরে তিনি বলেন, "না, আমি সেখানে কখনও যাইনি ৷ শুধু জানি যে আইআইএম রোডের কোথাও একটা শাহিনের বাড়ি ৷ কিন্তু ঠিক কোথায়, সেটা জানি না ৷" বোনের এই জঙ্গি-যোগ বা কার্যকলাপ নিয়ে কোনও দিন তাঁর সন্দেহ হয়নি ? শোয়েব বলেন, "শাহিন যখন ডাক্তারি পড়ছিল, তখনও ওর মধ্যে এরকম কোনও সন্দেহজনক কাজকর্মে জড়িত থাকার লক্ষণ দেখতে পাইনি ৷ এখনও ওর বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ বিশ্বাস করতে পারছি না ৷"

ফরিদাবাদ থেকে বিপুল বিস্ফোরণ উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় ডাঃ মুজাম্মিল গানাইকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ৷ তার সঙ্গে ডাঃ শাহিনের যোগাযোগ ছিল বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা ৷ এই চিকিৎসকরা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদ এবং আনসার গাজওয়াত-উল-হিন্দের হয়ে 'হোয়াইট কলার মডিউল' হিসাবে কাজ করছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ ৷

গতকাল শাহিনের বাবা সৈয়দ আহমদ আনসারি সাংবাদিকদের বলেন, "একমাস আগে আমার সঙ্গে ওর কথা হয়েছিল ৷ ও কখনও ডাক্তার মুজ্জামিল বা এরকম কারও নাম উল্লেখ করেনি ৷" তিনি জানান, মেয়ের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগে তিনি স্তম্ভিত ৷ শাহিন এলাহাবাদ অধুনা প্রয়াগরাজ থেকে ডাক্তারি পড়াশোনা শেষ করেছে ৷ ডাক্তার 'ভগবান'-এর একটি রূপ বলেই মনে করে সাধারণ মানুষ ৷ কিন্তু তাদের সঙ্গে জঙ্গি-যোগে স্বাভাবিকভাবে হতবাক দেশের আমজনতাও ৷