আমেরিকায় তরুণীকে খুন, আট মাস পর আগ্রায় গ্রেফতার অভিযুক্ত ! কোন 'সূত্রে' অপরাধীর নাগাল ?
অভিযোগ, টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই নিকিথাকে ডেকে এনে তাঁর উপর ছুরি দিয়ে হামলা করেন অর্জুন। খুনের পর ফ্ল্যাটেই নিকিথার দেহ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল ৷

Published : August 29, 2026 at 2:28 PM IST
হায়দরাবাদ, 29 অগস্ট: আমেরিকায় হায়দরাবাদের তরুণীকে খুনের অভিযোগ । ঘটনার প্রায় আট মাস পর উত্তরপ্রদেশের আগ্রা থেকে গ্রেফতার অভিযুক্ত । তদন্তকারীদের দাবি, মৃত তরুণীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা সরানোর সূত্র ধরেই শেষ পর্যন্ত অভিযুক্তের নাগাল পান তাঁরা । শুক্রবার সাংবাদিক বৈঠকে এমনটাই জানিয়েছেন সেকেন্দ্রাবাদ জোনের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার রক্ষিতা কৃষ্ণমূর্তি ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতের নাম অর্জুন শর্মা । বয়স 27 বছর । নিহত নিকিথারও বয়স ছিল 27 । লালাগুড়ার বাসিন্দা নিকিথা উচ্চশিক্ষার জন্য 2022 সালে আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছিলেন । সেখানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় চেন্নাইয়ের বাসিন্দা অর্জুনের । পরে দু'জনে মেরিল্যান্ডের একটি বাড়িতে একসঙ্গে ভাড়া থাকতেন । তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল বলে দাবি ৷
ঘটনার সূত্রপাত 2024 সালে । সেই সময় নিকিথা আমেরিকায় চাকরি পান । পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে, একই সময়ে অর্জুন এবং তাঁর মা রচনা শর্মা নিকিথাকে জানান, অর্জুন চাকরি হারিয়েছেন । সেই কথা বিশ্বাস করে নিকিথা তাঁকে মোটা অঙ্কের টাকা ধার দেন বলে অভিযোগ । পরে সেই টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে নিকিথাকে নিজের কলম্বিয়া-র অ্যাপার্টমেন্টে ডেকে পাঠান অর্জুন ।
সময়টা ছিল 2025 সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ । অভিযোগ, টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই নিকিথাকে ডেকে এনে তাঁর উপর ছুরি দিয়ে হামলা করেন অর্জুন । খুনের পর ফ্ল্যাটেই নিকিথার দেহ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল ৷ তদন্তকারীদের দাবি, 31 ডিসেম্বর নিকিথাকে খুন করা হয় ।
এর পরেই শুরু হয় আরও ধোঁয়াশা তৈরির চেষ্টা । 1 জানুয়ারি আমেরিকা থেকে ভারতে পালিয়ে আসেন অর্জুন । তার আগে মেরিল্যান্ড পুলিশের কাছে নিকিথা নিখোঁজ বলে একটি অভিযোগও দায়ের করেছিলেন তিনি । কিন্তু সেই অভিযোগে সন্দেহ হয় স্থানীয় পুলিশের । তদন্তে নেমে 3 জানুয়ারি অর্জুনের অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি চালানো হয় । সেখান থেকেই উদ্ধার হয় নিকিথার দেহ । এরপর আমেরিকায় শুরু হয় খুনের তদন্ত । এ দিকে ভারতে ফিরে আসা অর্জুনকে খুঁজে বের করাই তদন্তকারীদের কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় ।
শেষ পর্যন্ত যে সূত্রে সেই জট খুলতে শুরু করে, তা হল ব্যাঙ্ক লেনদেন । পুলিশের দাবি, ভারতে ফিরে আসার পরও নিকিথার মোবাইল নম্বর এবং ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে নিজের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠান অর্জুন । মৃতার বাবা আনন্দ বিষয়টি জানতে পেরে 16 এপ্রিল লালাগুড়া থানায় অভিযোগ দায়ের করেন । সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু করে পুলিশ ।
সেকেন্দ্রাবাদ জোনের ডিসিপি রক্ষিতা কৃষ্ণমূর্তির নেতৃত্বে তদন্তে নামেন ইনস্পেক্টর রবিকিরণ এবং সাব-ইনস্পেক্টর বিজয় । ব্যাঙ্কের লেনদেন, মোবাইল নম্বর এবং অন্যান্য সূত্র খতিয়ে দেখে তদন্তকারীরা শেষ পর্যন্ত অর্জুনের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হন । তাঁর সন্ধান মেলে উত্তরপ্রদেশের আগ্রায় । চলতি মাসের 24 তারিখ আগ্রা থেকে অর্জুনকে হেফাজতে নেয় পুলিশ । এরপর তাঁকে দিল্লির পাতিয়ালা হাউস কোর্টে হাজির করানো হয় । আদালতের নির্দেশে তাঁকে তিহাড় জেলে পাঠানো হয়েছে ।
তদন্তকারীদের কাছে এখন একাধিক প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ । আমেরিকায় খুনের পর কী ভাবে ভারতে এসে এত দিন আত্মগোপন করেছিলেন অর্জুন ? নিকিথার ফোন ও ডেবিট কার্ড তাঁর কাছে কী ভাবে এল ? মৃতার অ্যাকাউন্ট থেকে ঠিক কত টাকা সরানো হয়েছিল ? সেই টাকা কোথায় ব্যবহার করা হয়েছে ? আর এই আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে খুনের সরাসরি কোনও যোগ ছিল কি না, সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে ।
নিকিথার বাবা আনন্দ অবশ্য দাবি করেছেন, তাঁর মেয়ের খুনের পিছনে নিছক প্রেমের সম্পর্ককে কারণ হিসাবে দেখা ঠিক হবে না । তাঁর অভিযোগ, ঘটনার পিছনে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন । তিনি পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থার কাছে সমস্ত আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখে প্রকৃত কারণ সামনে আনার আবেদন জানিয়েছেন ।
একই সঙ্গে অর্জুনের মা রচনা শর্মাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করার দাবি জানিয়েছেন নিকিথার বাবা । তাঁর বক্তব্য, মেয়ের কাছ থেকে টাকা ধার নেওয়ার ঘটনায় রচনার নামও উঠে এসেছে । তাই গোটা আর্থিক লেনদেনের চক্র এবং খুনের আগে-পরে কী ঘটেছিল, তা জানতে তাঁকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন ।
এক তরুণীর আমেরিকায় রহস্যমৃত্যু, অভিযুক্তের দেশ ছেড়ে পালানো, তারপর মৃতার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকেই উঠে আসা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র- সব মিলিয়ে তদন্ত এখন একাধিক দেশের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে জড়িয়ে । আট মাস পর আগ্রা থেকে অভিযুক্ত ধরা পড়লেও নিকিথাকে কেন খুন করা হয়েছিল এবং সেই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ঠিক কতটা আর্থিক যোগ ছিল, তার উত্তরই এখন তদন্তের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ।

