'ঘৃণা ছড়াচ্ছে...', মামদানির আপত্তির পর USCIRF-এর নিশানায় RSS
29 অগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়্যার গার্ডেনে ভাগবতের সভা ঘিরে বিতর্ক । ওই অনুষ্ঠানে প্রায় 5000 মানুষের সামনে RSS প্রধানের বক্তব্য রাখার কথা ।

Published : August 29, 2026 at 1:53 PM IST
নিউ ইয়র্ক, 29 অগস্ট: একদিকে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি । অন্যদিকে আমেরিকার আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত কমিশন (USCIRF) । নিউইয়র্কের মাটিতে RSS প্রধান মোহন ভাগবতের নির্ধারিত সভাকে ঘিরে আপত্তির সুর ক্রমেই চড়ছে । মামদানির প্রকাশ্য বিরোধিতার কয়েক দিনের মধ্যেই RSS-কে নিয়ে আরও কড়া মন্তব্য করলেন USCIRF কমিশনার ড. আসিফ মাহমুদ । তাঁর অভিযোগ, RSS-এর মতো সংগঠন 'ঘৃণা ছড়াচ্ছে' এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে । একই সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে আলোচনার দরজাও খোলা রাখলেন তিনি । বললেন, "সুযোগ পেলে মোহন ভাগবতের সঙ্গে মুখোমুখি বসে কথা বলতে প্রস্তুত ৷"
আর সেই মন্তব্যের মধ্যেই নতুন মাত্রা পেয়েছে 29 অগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়্যার গার্ডেনে ভাগবতের সভা ঘিরে বিতর্ক । 'Universal Oneness Celebration' নামে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রায় 5000 মানুষের সামনে RSS প্রধানের বক্তব্য রাখার কথা । অনুষ্ঠানটির আয়োজকদের দাবি, এটি কোনও রাজনৈতিক সমাবেশ নয়; বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের মানুষকে নিয়ে 'ঐক্য' ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মঞ্চ । RSS-ও একই সুরে বলেছে, অনুষ্ঠানটি হচ্ছে 'open dialogue' বা মুক্ত আলোচনার ভাবনায় । কিন্তু সেই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয় সমালোচকেরা ।
মাহমুদের বক্তব্য, ভারতের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা রয়েছে । কিন্তু RSS নিয়ে তাঁর উদ্বেগ গুরুতর । তাঁর অভিযোগ, সংগঠনটি ঘৃণা তৈরির সঙ্গে যুক্ত এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার পাশাপাশি মৌলিক মানবাধিকারের প্রশ্নও সেখানে জড়িয়ে রয়েছে । তবে, সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে RSS প্রধানের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি । তাঁর যুক্তি, মুখোমুখি কথোপকথনে RSS-এর তরফে এমন কিছু আশ্বাস বা নিশ্চয়তা মিলতে পারে, যা তাঁর বর্তমান অবস্থান বদলানোর সুযোগ তৈরি করবে । অর্থাৎ, অভিযোগ রয়েছে, আপত্তিও রয়েছে, তবু আলোচনার রাস্তা বন্ধ নয় । মাহমুদের এই অবস্থানই এখন গোটা বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ।
মামদানি কেন আপত্তি তুললেন ? USCIRF-এর মন্তব্যের আগে নিউইয়র্কের মেয়র মামদানিই ভাগবতের অনুষ্ঠান নিয়ে সরব হয়েছিলেন । মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠকে তিনি স্পষ্ট জানান, MSG-তে RSS প্রধানের অনুষ্ঠান তিনি সমর্থন করেন না । তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ভারতের 'বহুত্ববাদী' ও 'ধর্মনিরপেক্ষ' পরিচয়ের কথা । তাঁর দাবি, যে ভারতকে তিনি ছোটবেলায় চিনেছেন, সেখানে প্রত্যেকের জায়গা ছিল । সেই জায়গায় কোনও 'বর্জনমূলক' ভাবনার উত্থান তাঁকে উদ্বিগ্ন করে।
আপত্তি জানালেও অনুষ্ঠান বাতিল করার ক্ষমতা নিউইয়র্ক শহর কর্তৃপক্ষের রয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন মামদানি । তাঁর বক্তব্য, এটি একটি বেসরকারি অনুষ্ঠান ৷ তাই শহর কর্তৃপক্ষের হাতে সেটি বাতিল করার আইনি ক্ষমতা আছে কি না, তিনি নিশ্চিত নন । এই অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ । কারণ, মেয়র হিসাবে আপত্তি জানিয়েছেন মামদানি, কিন্তু প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা নিয়েও সতর্ক থেকেছেন।
ভাগবতের অনুষ্ঠানের বিরোধিতা শুধু মেয়রের দফতরেই আটকে নেই । নিউইয়র্কে একাধিক আন্তঃধর্মীয় এবং নাগরিক অধিকার সংগঠনও প্রকাশ্যে আপত্তি জানিয়েছে । তাঁদের বক্তব্য, RSS-এর মতাদর্শ নিয়ে যে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে, তার প্রেক্ষিতে নিউইয়র্কের মতো বহুত্ববাদী শহরে এই ধরনের অনুষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক ।
এর মধ্যেই USCIRF আগেই RSS-এর বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছিল । সংস্থাটির তরফে RSS-এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এবং সংগঠনের নেতাদের ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের সরকারি সৌজন্য বা বৈঠক এড়ানোর মতো পদক্ষেপের কথাও বলা হয়েছিল । ফলে মাহমুদের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখছে না রাজনৈতিক মহল । বরং ভাগবতের আমেরিকা সফরকে কেন্দ্র করে RSS-এর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ভারতীয় বহুত্ববাদ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তারই ধারাবাহিকতা হিসাবে দেখা হচ্ছে ।
সমালোচনার মুখে RSS অবশ্য পিছু হটার বার্তা দেয়নি । বরং সংগঠনের জাতীয় প্রচার ও সংবাদমাধ্যম বিষয়ক প্রধান সুনীল অম্বেকর জানিয়েছেন, নিউইয়র্কের 'Universal Oneness Celebration' একটি আন্তঃধর্মীয় সমাবেশ । বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের সামনে মোহন ভাগবত বক্তব্য রাখবেন ।
RSS-এর বক্তব্য, অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়েছে পারস্পরিক সম্মান ও মুক্ত আলোচনার পরিবেশে । যাঁরা RSS-এর ভাবনা ও দর্শন সম্পর্কে জানতে চান, তাঁদেরও আলোচনায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি । এই পালটা বার্তার রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয় । কারণ, সমালোচকেরা যেখানে RSS-কে নিয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং ভারতের বহুত্ববাদ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, সেখানে RSS চাইছে নিজেদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে 'আলোচনা', 'সম্প্রীতি' এবং 'সাংস্কৃতিক ঐক্য'-র প্রবক্তা হিসাবে তুলে ধরতে ।
এই সফরের পিছনেও রয়েছে RSS-এর শতবর্ষ উদযাপন । সংগঠনের শতবর্ষের কর্মসূচির অংশ হিসাবে আমেরিকা, কানাডা ও ব্রিটেনে সফর করছেন ভাগবত । বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং সংগঠনের ভাবনা তুলে ধরাই এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে RSS জানিয়েছে ।
নিউইয়র্কে পৌঁছে ইতিমধ্যেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন ভাগবত । MSG-র অনুষ্ঠান তারই সবচেয়ে বড় এবং প্রতীকী পর্ব । আর তাই 29 অগস্টের সভার দিকে নজর এখন শুধু নিউইয়র্কে নয়, ভারতেও ।
কারণ, একই অনুষ্ঠানকে ঘিরে যে দু'টি সম্পূর্ণ বিপরীত বয়ান তৈরি হয়েছে, তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ । এক দিকে মামদানির অভিযোগ, RSS-এর ভাবনা ভারতের বহুত্ববাদী চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক । USCIRF-এর অভিযোগ আরও কড়া, ঘৃণা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের প্রশ্ন । অন্য দিকে RSS-এর বক্তব্য, এটি কোনও বিভাজনের মঞ্চ নয়, বরং বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে কথোপকথনের জায়গা । আর এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই মাহমুদের বার্তা সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে, সমালোচনা থাকলেও ভাগবতের সঙ্গে বসে কথা বলতে তিনি প্রস্তুত ।
ফলে এখন দেখার, ম্যাডিসন স্কোয়্যার গার্ডেনের মঞ্চ থেকে ভাগবত কী বলেন । তিনি কি RSS-এর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সরাসরি জবাব দেবেন ? ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কী অবস্থান নেবেন ? আর সেই বক্তব্য কি মমদানি ও USCIRF-এর মতো সমালোচকদের উদ্বেগ কমাতে পারবে ?
প্রেসিডেন্সি জেলে 'ওয়েব নেটওয়ার্ক' আমেরিকান সেন্টারে হামলার চক্রীর, কাকে ফোন আফতাবের ?
প্রতীক্ষার অবসান, অশোকনগরে বাণিজ্যিকভাবে শুরু খনিজ তেল উত্তোলন

