পুজোয় অংশ নেন সবধর্মের মানুষ ! ফিরিঙ্গি কালীবাড়ির নিরামিষ ভোগে মায়ের পছন্দ রাবড়ি
ফিরিঙ্গি কালীবাড়িতে পশু বা ছাগ বলির রেওয়াজ নেই ৷ সারাবছর ধরে প্রতিদিন কাঠ চাপা ফুলে মায়ের পুজো হয় এখানে ৷

Published : October 13, 2025 at 9:37 PM IST
কলকাতা, 13 অক্টোবর: কলকাতার কালী মন্দিরগুলির অন্যতম বউবাজার এলাকার ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি । 200 বছরের বেশি আগে এই মন্দিরে মাকে প্রতিষ্ঠা করেন অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি । সেই সময় থেকে এখানে অধিষ্ঠান করছেন সিদ্ধেশ্বরী ঠাকুরানি বা ফিরিঙ্গি কালী । তিনি খেতে পছন্দ করেন রাবড়ি, যা তাঁর ভোগের মূল উপকরণ ।
এই কালীপুজো মায়ের ভোগ থেকে অজানা অনেক কথাই ইটিভি ভারতের কাছে তুলে ধরলেন মন্দিরের বর্তমান সেবায়েত অতনু বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ সাতপুরুষ ধরে ফিরিঙ্গি কালীবাড়িতে মায়ের সেবায় নিয়োজিত বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার । আর বর্তমানে পুজোর ভার অতনুর কাঁধে ৷ তাঁর হাতেই আজও ভোগ গ্রহণ করেন মা ৷ আর সামনেই কালীপুজো ৷ তার আগে ফিরিঙ্গি কালীবাড়িতে সাজসাজ রব ।
পুজোর বিশেষত্ব
পুজোর আগে শনিবার অর্থাৎ 11 অক্টোবর থেকেই ভক্তদের জন্য বন্ধ হয়েছে মন্দির । বন্ধ থাকবে সপ্তাহখানেক । হবে মায়ের অঙ্গরাগ । এখানে ভোর থেকে কালীপুজোর আগে মন্দির খুলে যায় । ভক্তদের পুজো দু'দফায় নেওয়া হয় সন্ধ্যা পর্যন্ত । শুরু হয় অমাবস্যায় মূল পুজো ।

মায়ের সাজ
পুজোর দিন মা একসঙ্গে সাত-আটটি বেনারসি পরেন । পাশাপাশি ভক্তদের দেওয়া সোনা ও রুপোর গয়নায় সেজে ওঠেন দেবী ৷ সঙ্গে থাকে ফুলের সাজ ৷
সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগ
ফিরিঙ্গি কালীবাড়িতে মাকে সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগ অর্পণ করা হয় ৷ তাঁর ভোগের তালিকায় বাধ্যতামূলকভাবে থাকে রাবড়ি । না, এটা প্রাচীন কাল থেকে প্রচলিত এমনটা নয় । তবে দীর্ঘ 25 বছরের বেশি সময় এই প্রথা মানা হয় । মনে করা হয়, মা সব থেকে বেশি পছন্দের রাবড়ি ও পনির । ভোগের তালিকায় আছে, খিচুড়ি, সঙ্গে পাঁচরকমের সবজি ভাজা, ঘিয়ে ভাজা লুচি, তরকারি, পোলাও, আলুর দম, আলু ফুল কপি তরকারি, ছানার কোপ্তা, পনির তরকারি । এমনকি চাটনি, পাপড়, পায়েস ও পাঁচরকম মিষ্টি । তবে বিশেষভাবে দেওয়া হয় রাবড়ি ।

এর কারণ হিসেবে সেবায়েত অতনু বলেন, "মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন বউবাজার এলাকার এক ভক্ত । তার মিষ্টির দোকান । তিনি তারপর থেকে প্রতিদিন নিত্যপুজোতেও রাবড়ি দেন মাকে । নিজে আসতে না পারলে লোকে দিয়ে পাঠান । কালীপুজোর দিন বাধ্যতামুলকভাবে হাঁড়ি ভর্তি রাবড়ি আসে । এই প্রথা চলে আসছে 25 বছরের বেশি সময় । পরের দিনই হয় অন্নকোট । সেখানে মাকে অন্ন ভোগ দেওয়া হয়, যা ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া হয় । সিদ্ধেশ্বরী মায়ের ভোগ সম্পূর্ণ নিরামিষ হয় । মাছ বা মাংস প্রবেশ করানো হয় না মন্দিরে । কোনও ভক্ত মাছ দিলে সেটা মন্দিরের বাইরে থেকেই ছুইয়ে নিয়ে যান ।"
হয় না পশু বলি
ফিরিঙ্গি কালীবাড়িতে পশু বলির চল নেই ৷ অতনুর কথায়, "পরিবারের তরফে কুমড়ো, আখ, শশা বলির রেওয়াজ আছে । ভক্তরা আগে ছাগ বলি দিতেন বাইরে । তবে 2013 সালে বাবা স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়ে সেই পশু বলি বন্ধ করে দেন ।"

কাঠ চাঁপা ফুলে মায়ের পুজো
এই মন্দির আসলে ছিল শিব মন্দির, যা প্রতিষ্ঠা হয়েছিল 905 বঙ্গাব্দে । আর তার আগে থেকেই মন্দিরের পিছনে রয়েছে কাঠ চাঁপা গাছ । যে গাছে সারা বছর প্রতিদিন ফুল হয় । একটা ফুল হয়নি এমন কোনোদিন যায়নি । তাই সেই সময় প্রথম সেবায়েত শশীভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময় থেকেই মাকে প্রতিদিন সেই কাঠ চাঁপা দিয়ে নিত্যপুজো করা হয় । অতনু বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন শশীভূষণের ষষ্ঠ প্রজন্ম ।
মন্দিরে সবধর্মের মানুষের প্রবেশ
অতনু বলেন, "মায়ের এই মন্দিরেই একমাত্র সব মানুষকেই সমান চোখে দেখেন মা । পার্সি থেকে খ্রিস্টান, মুসলিম সকলেই এই মন্দিরে শুধু প্রবেশ করেন না মায়ের পূজো দিয়ে থাকেন । আমরা আশা করি আরও বেশি পরিমাণে সমস্ত ধর্মের মানুষ মায়ের কাছে আসুক ৷ মায়ের আশীর্বাদ গ্রহণ করুক ।"

ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি পুজোর ইতিহাস
500 বছর আগে বর্তমান মধ্য কলকাতার সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ছিল শ্মশান । তখন মধ্য কলকাতায় ছিল পর্তুগিজ সাহেব অ্যান্টনির মামাবাড়ি । স্ত্রী সৌদামিনিকে নিয়ে এখানে এসে থাকতেন অ্যান্টনি । পরে স্ত্রী সৌদামিনির কথাতেই শিবলিঙ্গের পাশে সিদ্ধেশ্বরীর মূর্তি স্থাপন করেন তিনি । কবিয়াল হিসাবে খ্যাতি অর্জনের পরেও এই মন্দিরে আসতেন অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি । তাঁর নামানুসারেই লোকমুখে এই কালীমন্দির পরিচিতি পায় ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি নামে । সেই থেকে ঐতিহ্য মেনে ফিরিঙ্গি কালীবাড়িতে পূজিত হন মা ।

লোকমুখে চর্চিত, বাঙালি মেয়েকে বিয়ে করার পর অ্যান্টনি হিন্দু ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং পরে তিনি সেই ধর্ম গ্রহণ করেন । সেইসময় এখানে শিবের উপাসনা হতো । সেখানেই মা কালীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন অ্যান্টনি কবিয়াল । এই মন্দিরে কালী প্রতিমা ছাড়াও শীতলা, মনসা, দুর্গা ও শিব মূর্তি রয়েছে ।
ফিরিঙ্গি কালী মন্দিরেও রয়েছে কালীর সিদ্ধেশ্বরী রূপের বিগ্রহ । জানা যায়, প্রতিষ্ঠাকাল সময়ের মূর্তিটা ছিল মাটির তৈরি । বর্তমান মূর্তি অবশ্য কংক্রিটের তৈরি । সিদ্ধেশ্বরী কালী ছাড়াও রয়েছে অষ্টধাতুর দুর্গা, জগদ্ধাত্রীর বিগ্রহ ও নারায়ণ শিলা ৷ নিত্যপুজো ছাড়াও বছরে বেশ কয়েকটা তিথিতে এখানে কালীর পুজো হয় ।


