গঙ্গার ভাঙনে বিপন্ন মালদা-মুর্শিদাবাদ, বাড়ছে ক্ষোভ
মালদা ও মুর্শিদাবাদ, দুই জেলাতেই গঙ্গার ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ৷ ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থার দাবিতে সরব বাসিন্দারা৷

Published : October 8, 2025 at 8:01 PM IST
মালদা/মুর্শিদাবাদ, 8 অক্টোবর: প্রাচীন প্রবাদ, নদী এ’কূল ভাঙে ও’কূল গড়ে৷ কিন্তু গঙ্গার ক্ষেত্রে বোধহয় সেই প্রবাদ খাটে না৷ অন্তত মালদা আর মুর্শিদাবাদ জেলায়৷ দুই জেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত গঙ্গা এখানে দু’কূলই ভাঙে, কিছু গড়ে না৷ দশকের পর দশক থেকে দুই জেলার আয়তন কমিয়ে দিচ্ছে গঙ্গা৷ গিলে নিচ্ছে দু’কূলের কৃষিজমি, আমবাগান থেকে শুরু করে বসতিও৷
গঙ্গার তাণ্ডবে ইতিমধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে মালদার কালিয়াচক 2 নম্বর ব্লকের আস্ত একটা গ্রাম পঞ্চায়েত৷ নিশ্চিহ্ন হওয়ার প্রহর গুনছে মানিকচক ও রতুয়া 1 নম্বর ব্লকের আরও পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকা৷ একই কাহিনি মুর্শিদাবাদ জেলাতেও৷ ওই জেলার ফরাক্কা ও সামশেরগঞ্জ ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকা ইতিমধ্যেই নদীগর্ভে৷ চলতি মরশুমেও গঙ্গার খিদে যে কমেনি তার প্রমাণ পেয়েছে দুই জেলার মানুষ৷

এই বছর দেশ থেকে বর্ষার বিদায়পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছে৷ গঙ্গার জল নামছিল দ্রুতগতিতে৷ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছিলেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা৷ কিন্তু মৌসুমি বায়ু বিদায় নেওয়ার সময় প্রতি বছরই ভালো বৃষ্টিপাত ঘটায়৷ খানিকটা নিভে যাওয়ার আগে প্রদীপের আলো উসকে ওঠার মতো৷ এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি৷ 4 অক্টোবর থেকে হঠাৎ করেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়৷ এর জেরে ফের দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করে গঙ্গার জল৷
জলস্তরের নামা আর ওঠার খেলায় সামশেরগঞ্জের উত্তর চাচণ্ড গ্রামে শুরু হয় তীব্র নদী ভাঙন৷ সোমবার গভীর রাতে ওই গ্রামের শতাব্দী প্রাচীন চাচণ্ড কালীমন্দির গ্রাস করে উন্মত্ত গঙ্গা৷ 120 বছরের পুরনো মন্দিরটি বিগ্রহ-সহ গঙ্গায় চলে যায়৷ তার পাশেই রয়েছে গ্রামের একমাত্র শিশু শিক্ষাকেন্দ্র৷ সেটি এখন গঙ্গার উপরে বিপজ্জনক অবস্থায় ঝুলছে৷ কালীমন্দিরের পর শিশু শিক্ষাকেন্দ্রের শেষ পরিণতির প্রহর গুনছেন চাচণ্ডবাসী৷

সামশেরগঞ্জের বিডিও সুজিতচন্দ্র লোধ বলেন, “সোমবার রাতের ভাঙনে বেশ কয়েক মিটার এলাকা গঙ্গায় চলে গিয়েছে৷ প্রাচীন কালীমন্দিরটি বাঁচানো যায়নি৷ গঙ্গার গ্রাস থেকে বাকি অংশ রক্ষার জন্য সেচ দফতরের সঙ্গে আলোচনা চলছে৷ গ্রামবাসীদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে৷”
বিডিও একথা বললেও প্রশাসনের উপর ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয়দের৷ তাঁদের দাবি, মাসখানেক আগেও গঙ্গা গ্রামের পাড় ভাঙতে শুরু করে৷ সেই সময় 10টি বাড়ি নদীগর্ভে চলে গিয়েছে৷ মন্দিরটি কোনোরকমে বেঁচে যায়৷ তখনই প্রশাসনকে জানানো হয়েছিল, যেভাবে হোক, কালীমন্দির রক্ষার ব্যবস্থা যেন করা হয়৷ মন্দির বাঁচানোর জন্য প্রশাসনের কাছে অনেকবার আবেদন জানানো হয়েছে৷ কিন্তু প্রশাসন কোনও পদক্ষেপ করেনি৷ আর ক’দিন পর কালীপুজো৷ তার আগে গোটা মন্দির গঙ্গাগর্ভে চলে গেল৷ প্রশাসন কেন ভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ করল না? এবার গ্রামের একমাত্র শিশু শিক্ষাকেন্দ্রটিরও সলিল সমাধি হওয়ার পালা৷ প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় সেটিও রক্ষা পাবে না৷

এবার গঙ্গার দাপটে বাঁধ উড়েছে মালদার ভূতনি চরের৷ ভাঙনে দিশেহারা রতুয়া 1 নম্বর ব্লকের মহানন্দটোলা ও বিলাইমারি গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দারা৷ ইতিমধ্যে কান্তটোলা গ্রামের পুরোটাই নদীগর্ভে৷ নদীতে বিলীন হওয়ার প্রহর গুনছে শ্রীকান্তটোলা-সহ বেশ কয়েকটি গ্রাম৷ বিপন্ন কালিয়াচক 3 নম্বর ব্লকের শোভাপুর পারদেওনাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকাও৷
বিপন্ন মানুষের দাবি গঙ্গার ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা করা৷ সেই কাজ করার কথা রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের৷ কিন্তু এই প্রশ্ন উঠলেই দুই সরকার একে অন্যের দিকে আঙুল তোলে৷ শুরু হয় বাক্যুদ্ধ৷ এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি৷ রাজ্যের নেতা-মন্ত্রীরা দাবি করেন, এই কাজ কেন্দ্রীয় সরকারের৷ আর কেন্দ্রের তরফে দাবি করা হয়, এই কাজের জন্য রাজ্য সরকারকে প্রথমে আবেদন জানাতে হয়৷ সেই আবেদনের ভিত্তিতে কেন্দ্র প্রকল্প তৈরি করে৷ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখনও পর্যন্ত কোনও আবেদনই পাঠায়নি৷

দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষজনের কিন্তু এত কথা শোনার আর সময় নেই৷ সব হারিয়ে এখন তাঁরা ক্ষোভে ফুঁসছেন৷ কখন যে সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ হবে, কেউ জানে না৷ তাঁরা দেখছেন, পাশের রাজ্য বিহারে গঙ্গা ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে৷ পাথরের বোল্ডার দিয়ে পাড় থেকে নদীর গভীর পর্যন্ত বেঁধে দেওয়া হচ্ছে৷ চলতি বর্ষা মরশুমে তার সুফলও পাওয়া গিয়েছে৷ এবার বিহারে গঙ্গা ভাঙন হয়নি বললেই চলে৷ তাঁদের প্রশ্ন, বিহারে এই ব্যবস্থা নেওয়া গেলে পশ্চিমবঙ্গে তা হবে না কেন? তাঁরা কি ভারতবর্ষের বাইরে থাকেন? এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে, তা অজানা৷
আশার কথা, বুধবার থেকে গঙ্গার জলস্তর স্থিতিশীল হয়েছে৷ এদিন সকাল আটটায় গঙ্গার জলস্তর ছিল 24.18 মিটার৷ বিপদসীমা 24.69 মিটার থেকে 51 সেন্টিমিটার নীচে৷ সেচ দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, আপার ক্যাচমেন্ট থেকে যদি আর জল না নেমে আসে তবে আগামিকাল থেকেই জলস্তর কমার সম্ভাবনা রয়েছে৷ কিন্তু সাধারণত দেখা যায়, স্থিতিশীল হওয়ার পর কয়েকদিন গঙ্গার জলস্তরের বাড়া-কমা চলতে থাকে৷ তবে জলস্তর কমার সময় আরও একবার তীব্র নদী ভাঙনের সম্ভাবনা থেকেই যায়৷ তাই এখনই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই নদীপাড়ের বাসিন্দাদের৷ এখনও সতর্ক হয়েই থাকতে হবে সবাইকে৷

