শিক্ষার আলোয় অশিক্ষার অন্ধকার ঘোচালো ফুটপাতে দুই মেয়ে, মাধ্যমিকে সফল হয়ে গড়ল নজির
বাবা-মায়ের আপত্তিকে উড়িয়ে সাফল্য সোনিয়া ঘোষ এবং প্রিয়াঙ্কা প্রামাণিকের ৷ একজনের স্বপ্ন ট্যাটু আর্টিস্ট হওয়া, তো আরেকজনের চিত্রশিল্পী ৷

Published : May 2, 2025 at 8:15 PM IST
কলকাতা, 2 মে: "অসৎ হইতে মোর সৎ পথে নাও ৷ জ্ঞানের আলোক জ্বেলে আঁধার ঘোচাও ৷" এই প্রার্থনা গীতিকেই বাস্তবে পরিণত করেছে ফুটপাতবাসী দুই কন্যা ৷ তাদের মাথার উপর কোনও ছাদ নেই ৷ না-আছে পড়াশোনার পরিবেশ ৷ এমনকি পরিবারের থেকে সমর্থনও পায়নি ওরা ৷ থাকার মধ্যে আছে শুধু ইচ্ছেশক্তি ও সাহস ৷ আর সেই দু’টিকে পুঁজি করে এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় সফল হল ফুটপাতের দুই মেয়ে সোনিয়া ঘোষ এবং প্রিয়াঙ্কা প্রামাণিক ৷
সার্দান অ্যাভিনিউেয়ে নবনালন্দা স্কুলের বিপরীতে এক শৌচালয়ের সামনে মায়ের সঙ্গে থাকে সোনিয়া ঘোষ ৷ আর কালীঘাট মেট্রো স্টেশনের কাছে ফুটপাতে বাবা-মা’র সঙ্গে থাকে প্রিয়াঙ্কা প্রামাণিক ৷ কিন্তু, দু’জনের কাউকে পড়াশোনা করতে দিতে চায়নি তাদের বাবা-মায়েরা ৷ প্রিয়াঙ্কার বাবা রাজমিস্ত্রি, মা গৃহবধূ ৷ আর সোনিয়ার মা বেসরকারি হাসপাতালে সাফাই কর্মী ৷
দুই পরিবারে শিক্ষার আলো খুব একটা পৌঁছায়নি ৷ তাই প্রতি মুহূর্তে দুই বন্ধুকে শুনতে হয়েছিল, 'পড়াশোনা করে কী হবে ! তার চেয়ে ভালো কাজ কর ৷ কাজ করে টাকা উপার্জন কর' ৷ তাই বাবা-মায়েদের চাপে পড়ে মাঝেমধ্যেই দোকানে বাসন মাজতে হয়েছে ৷ কিন্তু, তা খুব একটা পছন্দ ছিল না তাদের ৷
তাই, বাবা-মায়ের সেই নিষেধ শোনেনি দুই কন্যা ৷ নিজেদের ইচ্ছেশক্তিতে পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছে তারা ৷ আর এই কঠিন লড়াইয়ে তাদের পাশে ছিলেন, এখনও রয়েছেন বৃন্দা ঘোষ ৷ তাঁর উদ্যোগেই করোনার সময় পড়াশোনা শুরু করে প্রিয়াঙ্কা এবং সোনিয়া ৷ প্রিয়াঙ্কা বর্তমানে কালীধন ইনস্টিটিউশনের ছাত্রী এবং সোনিয়া পড়ে টালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে ৷
বৃন্দা ঘোষের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হাত ধরেই স্কুলে ভর্তি হওয়া এবং আজকের এই সাফল্য ৷ তিনি নিজে একসময় স্কুলে পড়াতেন ৷ কোভিডের সময় ফুটপাতে একদিন খাবার নিয়ে এসেছিলেন ৷ সেখানেই এই দুই বন্ধুর সঙ্গে আলাপ ৷ তারপর তাদের মন বোঝা ৷ পড়াশোনার আগ্রহ আছে যেনে, ওদের জন্য বইখাতা কিনে এনেছিলেন ৷ নিজেই পড়াতেন ৷ তারপর দু’জনকে স্কুলে ভর্তি করান ৷
পাশের মার্কের থেকে সামান্য কিছু বেশি নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে প্রিয়াঙ্কা এবং সোনিয়া ৷ তবে, তাদের এই লড়াই ও সাফল্য বিফলে যায়নি ৷ মেয়েরা পাশ করেছে শুনে, পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে তাদের মায়েরা ৷ প্রিয়াঙ্কাকে তার মা নিজে হাতে মিষ্টি খাইয়ে দিয়েছে ৷ আর সোনিয়াকে তার মায়ের বার্তা, 'আরও ভালো করে পড়াশোনা কর' ৷

এ দিনের এই সাফল্যের পর প্রিয়াঙ্কা ও সোনিয়া ইটিভি ভারতকে বলে, "মা-বাবা কাজে যেতে বলত ৷ তখন আমরা দোকানে গিয়ে বাসন মাজতাম ৷ কিন্তু, ইচ্ছে করত সবার মতো স্কুলে যেতে ৷ তবে, বাবা-মা উল্টোপাল্টা কথা বলত ৷"
সোনিয়া বলে, "পড়াশোনা শিখে কী করব, এই প্রশ্নটাই করত মা ৷ কিন্তু, আমার ট্যাটু আর্টিস্ট হওয়ার ইচ্ছে ৷ আঁকতে আমার খুব ভালো লাগে ৷ পড়াশোনা শিখে আমি চাই রোজগার করতে ৷ শুনেছি মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য সবাই অনেক পড়াশোনা করে ৷ কিন্তু, আমরা স্কুলে যেটুকু সময় থাকতাম ওইটুকুই ৷ মায়ের কাছে চলে এলে আর পড়া হতো না ৷"
এ দিন প্রিয়াঙ্কা ও সোনিয়ার রেজাল্ট দেখেছিলেন তাদের ম্যাম বৃন্দা ঘোষ ৷ সোনিয়া বলে, "ম্যাম প্রথম রেজাল্ট দেখেন ৷ রেজাল্ট দেখে আমাদেরকে বলেন, আমরা পাশ করে গিয়েছি ৷ আমরা ভাবতে পারিনি ৷ চোখে জল চলে এসেছিল আমাদের ৷ এখন মা বলছে পাশ করেছিস, মন দিয়ে পড়াশোনা কর আরও ৷"

কথায় বলে, শিক্ষার আলো সব অন্ধকারকে ঘুচিয়ে দিতে পারে ৷ দুই ষড়োশির মাধ্যমিকের সাফল্য তাদের বাবা-মায়েদের হৃদয় পরিবর্তন করতে পারলে, একদিন তারা তাদের পড়াশোনার মধ্যে দিয়ে আরও অনেক প্রিয়াঙ্কা ও সোনিয়ার জীবনের অন্ধকারকে ঘোচাবে, সে আশা করাই যায় ৷

