মহাত্মা গান্ধির সহযোদ্ধার পরিবারের জমি দখল! কাঠগড়ায় তৃণমূল
পায়নি তেমন কোনও সরকারি সাহায্য ৷ অভিযোগ, কৃষিজমির পাট্টা দখল এলাকার প্রভাবশালী তৃণমূলিদের ৷ এখন কোনোরকমে বেঁচেবর্তে রয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামীর পরিবার ৷

Published : August 30, 2025 at 7:04 PM IST
|Updated : August 30, 2025 at 9:58 PM IST
মালদা, 30 অগস্ট: একসময় মহাত্মা গান্ধির সহযোদ্ধা ছিলেন তিনি ৷ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন ৷ স্বাধীনতার আগে তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম আদিবাসী বিধায়কও ৷ তাঁর নাম হয়তো অনেকেই জানেন না ৷ তিনি বীর বীরসা ওরাওঁ ৷ তিনি প্রয়াত হয়েছেন বহুকাল আগে ৷ আজ কোনোরকমে বেঁচেবর্তে রয়েছেন এমন একজন মানুষের উত্তরসূরীরা ৷ অভিযোগ, একসময় সরকারের তরফে তাঁদের কিছুটা কৃষিজমির পাট্টা দেওয়া হলেও এলাকার প্রভাবশালী তৃণমূলীরা সেই জমি দখল করে নিয়েছে ৷
স্যাঁতস্যাঁতে ঘর, উপরে শতচ্ছিদ্র চালা, বৃষ্টি হলে ঘরের ভিতরটা কাদায় মাখামাখি ৷ এই দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটালেও বীরসা ওরাওঁয়ের উত্তরসূরীরা তেমন কোনও সরকারি সাহায্য পান না ৷ জরাজীর্ণ বাড়ি থাকলেও তাঁদের নাম সরকারি ঘরের তালিকায় ওঠেনি ৷ শনিবার বীরসা ওরাওঁয়ের পরিবারের এমনই পরিস্থিতি খতিয়ে দেখলেন স্থানীয় থানার আইসি ৷ সবকিছু শুনে দ্রুত পদক্ষেপ করার আশ্বাস দিয়ে গেলেন তিনি ৷
স্বাধীনতা সংগ্রামী বীর বীরসা ওরাওঁ
প্রয়াত বীর বীরসা ওরাওঁয়ের বাড়ি হরিশ্চন্দ্রপুর থানার তেঁতুলবাড়ি গ্রামে ৷ এখন ওই বাড়িতে থাকেন তাঁর নাতবউ এবং তাঁর পরিবার ৷ অপুষ্টির চিহ্ন সবার শরীরে ৷ সবাই দিনমজুরি করেন ৷ যা আয় হয় তাতে সবার দু'বেলা পেট ভরে না ৷ সরকারি সাহায্য বলতে শুধু মাসিক হাজার টাকা ৷ এদিন এই পরিবারটির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন হরিশ্চন্দ্রপুর থানার আইসি মনোজিৎ সরকার ৷ পরিস্থিতি দেখে নিজের পকেট থেকে তিনি পরিবারটিকে কিছু আর্থিক সাহায্য করেন ৷
পরিবারের আক্ষেপ
বীরসা ওরাওঁয়ের নাতবউ সুমিয়া ওরাওঁ বলেন, "আমার দাদাশ্বশুর দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে লড়াই করেছিল ৷ প্রথম বিধায়কও ছিল ৷ স্বাধীনতার লড়াই জেতার পর তাঁর কী হয়েছিল আমার জানা নেই ৷ আমরা এখন খুব সমস্যায় আছি ৷ সরকারের কাছ থেকে কিছু পাইনি ৷ টাকা-পয়সা, ঘর-বাড়ি কিছু না ৷ তবে সরকার আমাদের পাট্টার জমি দিয়েছিল ৷ যদিও ওই জমি তৃণমূলের লোকজন দখল করে নিয়েছে ৷ আমরা এখন প্রায় না-খেয়ে থাকছি ৷ আমার দাদু দেশের জন্য লড়াই করেছিল ৷ তারপরেও কেউ আমাদের কিছু দেয়নি ৷ আজ থানার আইসি এসেছিলেন ৷ সাহায্য করেছেন ৷ আমি তাঁকে সব ঘটনা জানিয়েছি ৷ জমি দখলের কথাও ৷ তিনি আমাকে বলেছেন, প্রয়োজন পড়লে আমরা যেন তাঁকে ফোন করি ৷"

পুলিশের প্রতিশ্রুতি
আইসি মনোজিৎ সরকার বললেন, "আমরা জানতে পেরেছি, বীরসা ওরাওঁ মালদা জেলার প্রথম বিধায়ক ছিলেন ৷ আজ তাঁর বাড়িতে এসেছিলাম ৷ পরিবারটির আর্থিক পরিস্থিতির কথা শুনলাম ৷ সমস্যার কথাও জানলাম ৷ এই পরিবারটি শুধু মাসিক হাজার টাকা ভাতা পায় ৷ এঁরা যাতে আরও বেশি সরকারি সুযোগ সুবিধে পান তার জন্য আমি সঠিক জায়গায় জানাব ৷ এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর বাড়ির সদস্যরা যাতে ভালোভাবে থাকেন, সেটা দেখা আমাদের কর্তব্য ৷ এনিয়ে বিডিওর সঙ্গেও কথা বলব ৷ পরিবারটির কথা আগে শুনেছিলাম ৷ আজ দেখতে এসেছি ৷ শুনলাম, এঁদের সরকারি পাট্টার জমি দখল হয়ে গিয়েছে ৷ ওই জমি যাতে এঁদের ফিরিয়ে দেওয়া যায় সেটাও দেখা হবে ৷"

সরব আদিবাসী সমাজ
এলাকার বাসিন্দা তথা হরিশ্চন্দ্রপুর আদিবাসী ইউনিটের সভাপতি হরতাল ওরাওঁ বলেন, "মালদা জেলার প্রথম বিধায়ক ছিলেন বীর বীরসা ৷ তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামীও ছিলেন ৷ আজ হরিশ্চন্দ্রপুর থানার আইসি তাঁদের বাড়িতে গিয়েছিলেন ৷ বীর বীরসার পরিবারের লোকজনকে আর্থিক সাহায্য করেছেন ৷ তাঁদের অভিযোগও শুনেছেন ৷ ডাকবাংলো ব্রিজ লাগোয়া এলাকায় এই পরিবারটির সরকারি পাট্টার জমি ছিল ৷ তৃণমূলের লোকজন সেই জমি দখল করে নিয়েছে ৷ এখানে আদিবাসীদের অনেক জমি এভাবে দখল হয়ে গিয়েছে ৷’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘আমরা প্রশাসনকে লিখিতভাবে সব জানিয়েছি ৷ এই পরিবারটির জন্যও আমরা প্রশাসনের কাছে আবেদন জানাব ৷ বীর বীরসার একটি মূর্তি যাতে তেঁতুলবাড়িতে স্থাপিত হয় তার আর্জি জানাব ৷ মূর্তি বসানোর জন্য জায়গার কোনও অভাব হবে না ৷ এখানে অনেক বড় বড় নেতা রয়েছেন ৷ কিন্তু এই পরিবারটি শুধু মাসিক এক হাজার টাকা ভাতা ছাড়া আর কিছু পায় না ৷ এটা লজ্জাজনক ৷"
ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস তৃণমূলের
প্রশ্ন অন্য জায়গায় ৷ হরিশ্চন্দ্রপুরের বর্তমান বিধায়ক তজমুল হোসেন রাজ্যের মন্ত্রীও বটে ৷ তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় রাজনীতি করছেন ৷ একসময় নেতাজির তৈরি ফরওয়ার্ড ব্লকের বিধায়ক ছিলেন ৷ তিনি কি বীর বীরসা ওরাওঁয়ের পরিবারের দুর্দশার কথা জানতে পারেননি? এদিন তাঁকে ফোনে পাওয়া যায়নি ৷ তবে সেই বাড়িতে আইসি'র পা পড়ার পর নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব ৷
তৃণমূলের ব্লক সভাপতি জিয়াউর রহমান বলেন, "বিষয়টি শুনলাম ৷ সত্যিই এটা দুঃখজনক ব্যাপার ৷ বীর বীরসা ওঁরাও মালদা জেলার প্রথম বিধায়ক ছিলেন ৷ স্বাধীনতা সংগ্রামেও তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে ৷ মালদা জেলার প্রতিও তাঁর অনেক অবদান রয়েছে ৷ প্রশাসনের তরফে আজ পুলিশ তাঁর পরিবারের কাছে গিয়েছিল ৷ আমরাও খোঁজখবর নিচ্ছি ৷ আজ রাতেই আমরা তাঁর বাড়িতে যাব ৷ তাঁর উত্তরসূরীদের কোথায় কী অসুবিধে রয়েছে, সেটা দেখব ৷’’
তিনি বলেন, ‘‘বিডিওকে অনুরোধ করব, ওই পরিবারটিকে যদি সরকারি ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়া যায় তবে সেটা দ্রুত করে দেওয়া হোক ৷ ওই পরিবারটির সরকারি পাট্টার জমি যে দখল হয়ে গিয়েছে সেটা জানা নেই ৷ সত্যিই সেটা ঘটে থাকলে বিডিও এবং বিএল অ্যান্ড এলআরওকে বলব, ওই জমি দ্রুত পুনরুদ্ধার করে যেন পরিবারটিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় ৷"

