নেপালে অশান্তির জেরে পানিট্যাঙ্কি সীমান্তে আটকে কয়েকশো ট্রাক, দিনে দেড় কোটির ক্ষতি
থমথমে পরিবেশ ভারত-নেপাল সীমান্তের পানিট্যাঙ্কিতে ৷ ট্রাকচালকদের সংগঠন সমস্যা মেটাতে কেন্দ্র ও রাজ্যকে চিঠি দিচ্ছে ৷

Published : September 10, 2025 at 8:00 PM IST
পানিট্যাঙ্কি, 10 সেপ্টেম্বর: জেন জি-র আন্দোলনে জ্বলছে প্রতিবেশী দেশ নেপাল ৷ তারই আঁচে মুহূর্তে বদলে গিয়েছে ভারত-নেপাল সীমান্তের ছবিটা ৷ বাণিজ্য থমকে যাওয়ায় করোনাকালে যে থমথমে পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, গত দু'দিন ধরে সেই একই ছবি ফিরে এসেছে ভারত-নেপাল সীমান্তের পানিট্যাঙ্কিতে । আটকে রয়েছে কয়েকশো ট্রাক ৷
কয়েকটি ট্রাককে জরুরি ভিত্তিতে নেপাল থেকে ভারতে আসার অনুমতি দেওয়া হলেও, ভারত থেকে নেপালে ট্রাক যাওয়ার ক্ষেত্রে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে । আর এই টালমাটাল পরিস্থিতির কারণে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছে ব্যবসায়ী মহল । নেপালে আটকে পড়া ট্রাকমালিকদের দ্রুত ফিরিয়ে আনতে আজ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, মুখ্যসচিব ও কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রী নীতিন গড়করিকে চিঠি দিয়ে আবেদন জানাচ্ছে ট্রাক মালিকদের সংগঠন ।
প্রতিদিন ভারত-নেপাল সীমান্ত পানিট্যাঙ্কি দিয়ে গড়ে প্রায় দেড়শো পণ্যবাহী ট্রাক ভারত থেকে নেপালে যায় । আবার নেপাল থেকে প্রায় প্রতিদিন 20 থেকে 25টি ট্রাক ভারতে পণ্য নিয়ে আসে । তবে নেপালের বর্তমান পরিস্থিতির পর মঙ্গলবার থেকে সেই সমস্ত ট্রাক সীমান্তে আটকে রয়েছে । বেশিরভাগ ট্রাকেই রয়েছে আলু, পটল, গ্যাস, মশলা, ওষুধ, চাল, ডাল, যন্ত্রপাতি ও তেলের ট্যাঙ্কারের মতো জরুরি সামগ্রী । নেপাল থেকে আসে পাইপ, প্লাস্টিকের টিন, প্লাইউড । পণ্যবাহী ট্রাকগুলো পারাপার করতে না-পারায় চিন্তায় ব্যবসায়ী মহল । রোজ বিপুল টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাঁদের ৷
ব্যাপক সমস্যায় পড়েছেন ট্রাকচালকরাও । জয়গাঁ থেকে আলু নিয়ে আসা ট্রাকচালক প্রসন্ন বর্মন বলেন, "মঙ্গলবার সকাল থেকে ট্রাক নিয়ে আটকে রয়েছি । জানি না কবে সীমান্ত স্বাভাবিক হবে । আমরাও চিন্তায় রয়েছি । ট্রাকে আলু রয়েছে । সেটা খারাপ হয়ে যেতে পারে ।"

ট্রাকমালিকদের সংগঠন ফেডারেশন অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রাক অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সজল ঘোষ জানিয়েছেন যে, "ভারত-নেপাল সীমান্তে আটকে রয়েছে প্রায় তিন-চারশো ট্রাক । যেহেতু নেপালে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রয়েছে এবং মোবাইল নেটওয়ার্কের সমস্যা রয়েছে, তাই তাঁদের সঙ্গে ঠিকভাবে যোগাযোগও করা যাচ্ছে না । অন্যদিকে, নেপালেও আটকে রয়েছে আরও তিনশো ট্রাক । তাই তাঁদের পরিবার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে ।" তিনি জানিয়েছেন যে, নেপালের দিকে আটকে পড়া ট্রাকগুলিকে যাতে দ্রুত ফিরিয়ে আনা যায়, এ বিষয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ চেয়ে আজই চিঠি পাঠানো হবে ।
অন্যদিকে, সীমান্ত বন্ধ থাকায় ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদেরও । সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় প্রায় 30টিরও বেশি দোকান রয়েছে । সীমান্ত দিয়ে পারাপার বন্ধ হওয়ায় মাথায় হাত পড়েছে সেইসব ব্যবসায়ীদের । সবথেকে বড় বিষয়, সীমান্তে প্রতিদিন একটি বাজার বসে । সেই বাজারে রয়েছে প্রায় শতাধিক দোকান । ওই বাজার থেকে প্রতিদিন প্রায় সাত থেকে আট লক্ষ টাকার ব্যবসা হয় । মূলত নেপালের নাগরিকরা এসে ওই বাজার থেকে ভারতীয় পণ্য কেনাকাটা করেন । তবে সীমান্ত কার্যত বন্ধ থাকায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে ওই বাজারটিও । কবে এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এখন তারই অপেক্ষায় দিন গুনছেন সীমান্তের ব্যবসায়ী থেকে ট্রাকচালকরা ।

স্থানীয় ব্যবসায়ী দীনেশ বর্মন ৷ সীমান্তের পাশেই রয়েছে তাঁর ছোটখাটো একটি হোটেল । তিনি বলেন, "প্রতিদিন ভালোই বিক্রি হত । কিন্তু দু'দিন ধরে শুধু দোকানই খুলছি । কোনও বিক্রি নেই ৷ সীমান্তে কেউ না-এলে কীভাবে বিক্রি হবে । এখন কবে সীমান্ত স্বাভাবিক হবে সেই আশায় রয়েছি ।"
সীমান্ত এলাকারই আরও এক ব্যবসায়ী পুলক বর্মন বলেন, "প্রতিদিন এখান দিয়ে প্রচুর সাধারণ মানুষ ও ট্রাক পারাপার করে । কিন্তু নেপালে ঝামেলার পর থেকেই সব বন্ধ । ব্যবসা সম্পূর্ণ তলানিতে । এই অবস্থায় কী করব জানি না ।"
তবে সীমান্ত দিয়ে যাঁরা নেপাল থেকে ভারতে আসছেন তাঁদের একাংশের মতে, বৃহস্পতিবার থেকে নেপালের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে । প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি দেশ ছাড়ার পর আন্দোলনের তীব্রতা একটু কমেছে । সেখানে জারি করা হয়েছে কার্ফু । নেপাল থেকে আগত প্রবীণ কুমার বলেন, "ওপারে এখনও উদ্বেগের পরিবেশ রয়েছে । কোনও প্রশাসন নেই । সেনা এখন সবটা দেখছে । তবে ভারতীয়দের নেপাল থেকে ফেরত যেতে দিচ্ছে আন্দোলনকারীরা ।"
ইতিমধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তায় জোর দিয়েছে এসএসবি ও পুলিশ । নবান্নের নির্দেশে ভারত-নেপাল সীমান্তে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে । একইভাবে নিরাপত্তা জোরদার করেছে এসএসবি । ইতিমধ্যে সীমান্তে পৌঁছে গিয়েছেন এসএসবির ডিআইজি মঞ্জিত সিং । নেপালে আটকে থাকা বাংলার পর্যটকদের জন্য হেল্পলাইন নম্বর চালু করেছে দার্জিলিং জেলা পুলিশ । আটকে থাকা পর্যটকরা যোগাযোগ করলে তাঁদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে । মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও জানিয়েছেন, আটকে পড়া পর্যটকদের ফেরাতে ব্যবস্থা নিচ্ছে রাজ্য সরকার ৷ তবে পানিট্যাঙ্কি সীমান্তে পণ্যবাহী ট্রাক পারাপার কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলেনি ৷ ফলে চিন্তা ক্রমে বাড়ছে ব্যবসায়ীদের ৷

