ETV Bharat / state

উত্তরবঙ্গে প্রথম ! চিন্তাধারা বদল করতে ন’বছরের কন্যের পৈতে

পৈতে ধারণ করে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করল ন'বছরের মধুপর্ণা সিদ্ধান্ত ৷ সে পুরোহিত হলেও পাশে থাকবে বলে জানিয়েছে পরিবার ৷

thread ceremony
ন’বছরের কন্যের পৈতে মালদায় (নিজস্ব ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : February 8, 2025 at 9:29 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

মালদা, 8 ফেব্রুয়ারি: মেয়েরা কম কিসে ৷ ছেলেদের পৈতে হলে তবে মেয়েদের নয় কেন ! তাই তো সমাজের তৈরি ছক ভেঙে ন'বছরের কন্যার পৈতে দিল পরিবার ৷ ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করল মধুপর্ণা সিদ্ধান্ত ৷ ঘটানাটি ঘটেছে মালদায় ৷ উত্তরবঙ্গে এই প্রথম এমন ঘটনা বলে দাবি তার পরিবারের ৷

রামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন, 'ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা ৷' যিনি এই উপলব্ধি করতে পারবেন, তিনিই ব্রহ্ম ৷ ভারতীয় সমাজে ব্রহ্মচর্য অতি প্রাচীন রীতি ৷ এখনও হিন্দুধর্মের আচারে উপনয়নের মাধ্যমে ব্রহ্মচর্য পালনের রীতি রয়েছে ৷ মূলত ব্রাহ্মণ পরিবারের পুরুষ সন্তানরা এর মাধ্যমে দীক্ষা গ্রহণ করে ৷ এই রীতি আদপে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বৈদিক ও শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠান ৷ এই অনুষ্ঠান হিন্দুধর্মের প্রাচীন গ্রন্থে ষোড়শ সংস্কারের (আচার) একাদশ সংস্কার ৷ এর মাধ্যমে সনাতনী বালকরা গায়ত্রী মন্ত্র ধারণ করে দীক্ষিত হয় ৷ কিন্তু এবার মালদায় এভাবে দীক্ষিত হয়েছে এক কন্যা ৷ শুক্রবার ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেছে সে ৷ তার পরিবারের দাবি, মালদা তো বটেই, গোটা উত্তরবঙ্গে এক কন্যার উপনয়নের ঘটনা প্রথম ঘটল ৷

thread ceremony
ন’বছরের মধুপর্ণা সিদ্ধান্ত (নিজস্ব ছবি)

দীক্ষিত কন্যা ন'বছরের মধুপর্ণা সিদ্ধান্ত মালদা শহরের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ৷ বাবা মনোজকুমার সিদ্ধান্ত পেশায় ব্যবসায়ী ৷ মা পায়েল সিদ্ধান্ত বাড়ির কাজকর্ম সামলান ৷ শহরের ঘোড়াপির ঘোষপাড়ায় তাঁদের বাড়ি ৷ মধুপর্ণারা দু'বোন ৷ সে ছোট ৷ দিদি মধুশ্রী কলকাতায় পড়াশোনা করে ৷ শুক্রবার গায়ত্রী মন্ত্রী উচ্চারণ করে দীক্ষিত হয়েছে মধুপর্ণা ৷

মধুপর্ণার বাবা মনোজকুমার সিদ্ধান্ত বলেন, "আমার যখন দুটো মেয়ে হল, সবার মুখেই শুনেছি মেয়ে হওয়া ঠিক নয় ৷ সমাজের এই চিন্তাধারা বদলানোর জন্য আমার প্রথম পদক্ষেপ, মালদা তথা উত্তরবঙ্গে আমিই প্রথম মেয়ের পৈতে দিচ্ছি ৷ সেই অনুষ্ঠান চলছে ৷ এখনও রিসেপশন বাকি আছে ৷"

thread ceremony
চিন্তাধারা বদল করতে মেয়ের পৈতে অনুষ্ঠান করলেন বাবা মা (নিজস্ব ছবি)

তাঁর কথায়, "আগে মেয়েদের পৈতে হত ৷ কিন্তু পরবর্তী সময়ে মেয়েদের দমন করার জন্যই হোক বা অন্য কোনও কারণ, মেয়েদের বসিয়ে দেওয়া হয়েছে ৷ আমি মানুষের এই চিন্তাধারা বদল করতে চাই ৷ ভেবেছিলাম, দুই মেয়ের পৈতেই একসঙ্গে দেব ৷ কিন্তু বড় মেয়ে লজ্জা পাচ্ছে ৷ আসলে এখন ও বড় হয়ে গিয়েছে ৷ তাই হয়তো এই লজ্জা ৷ তাই ছোট মেয়ের পৈতে দিয়েছি ৷ ও আগেই ঠাকুরের জপ করত ৷ এখন আরও ভালোভাবে করবে ৷ সমাজের প্রতি আমার বার্তা, মেয়েদেরও সামাজিকভাবে উঁচু জায়গায় রাখা হোক ৷ ছেলে আর মেয়ে, দুটোই সমান ৷"

thread ceremony
ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করল মধুপর্ণা সিদ্ধান্ত (নিজস্ব ছবি)

মধুপর্ণার মা পায়েলের বক্তব্য, "মেয়ে এখন ছোট ৷ পৈতের সঠিক অর্থ জানে না ৷ ওকে বড়দের বোঝাতে হবে ৷ ঠাকুরের পূজার্চনা কিংবা দীক্ষা সম্পর্কে ওর সাত বছর বয়স থেকেই অভিজ্ঞতা রয়েছে ৷ গতকাল ওর পৈতে হয়ে গিয়েছে ৷ এখন আচার্যগুরু এবং যিনি তাকে পৈতে দিয়েছেন, তিনি ওকে পৈতে সম্পর্কে বোঝাবেন ৷"

তিনি বলেন, "বৈদিক যুগে ছেলে ও মেয়ে, দু'জনেরই পৈতে হত ৷ মেয়েদের দমিয়ে রাখতে একসময় তাদের পড়াশোনা, পৈতে, বাইরে বেরোনো সবকিছুই বন্ধ করা হয়েছিল ৷ সমাজের চাপেই সেসব বন্ধ হয়েছিল ৷ এখন মেয়েদের সবকিছুই আবার করানো হচ্ছে ৷ তাহলে পৈতে কেন বাদ যাবে ৷ এটাও করানো উচিত ৷ ও ছোট থাকাকালীনই আমরা ওকে পৈতে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম ৷ এতদিন সঠিক বয়স না হওয়ায় কিছু করা হয়নি ৷ এবার সেটাই করা হল ৷ ও যদি চায় তবে ভবিষ্যতে পুরোহিতের পেশাও গ্রহণ করতে পারে ৷ আমাদের কোনও আপত্তি নেই ৷"

মধুপর্ণা বলে, "পড়াশোনা ইংরেজিতে হলেও সংস্কৃত মন্ত্রে পুজো করতে পারব ৷ শিখে নিতে হবে ৷ এই ক'দিন বাড়িতে অনেক অনুষ্ঠান হয়েছে ৷ পুজো হয়েছে ৷ হলদি, জল সাঁঝা, পৈতে, যজ্ঞ সবই হয়েছে ৷ খুব আনন্দ হয়েছে ৷ বন্ধুরা এসেছিল ৷ ওদের সঙ্গে আনন্দ করেছি ৷"

thread ceremony
ধুমধাম করে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীর পৈতে (নিজস্ব ছবি)

বাচ্চা মেয়েটির পৈতের যাবতীয় ব্যবস্থা করেছেন সিদ্ধান্ত পরিবারের পুরোহিত সদানন্দ বাগচি ৷ তিনি জানান, ব্রাহ্মণের ব্রহ্মজ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক ৷ বৈদিক যুগে নারী ও পুরুষের কোনও ভেদাভেদ ছিল না ৷ প্রত্যেকেই ব্রহ্মজ্ঞান অর্জন করার অধিকারী ছিলেন ৷ বর্তমানে সমাজের জন্যই হোক কিংবা মুষ্টিমেয় কিছু ব্রাহ্মণের বাধ্যবাধকতা, মহিলাদের উপনয়ন কিংবা ব্রহ্মজ্ঞান অর্জন, শিক্ষা বন্ধ করে তাঁদের পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে ৷ ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গে এর আগে মহিলাদের উপনয়ন হয়েছে ৷ মালদা তথা উত্তরবঙ্গে সিদ্ধান্ত পরিবারেই প্রথম কোনও মেয়ের উপনয়ন হল ৷

তিনি বলেন, "যে কোনও কিছু প্রথম কাউকে না কাউকে আরম্ভ করতে হয় ৷ সেটা মালদা তথা উত্তরবঙ্গে সিদ্ধান্ত পরিবারই শুরু করল ৷ আমি সনাতনি সমস্ত জনসাধারণকে অনুরোধ করব, প্রত্যেকের ব্রহ্মজ্ঞান অর্জন করা উচিত ৷ বেদের শিক্ষা সবার নেওয়া উচিত ৷ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্রের ভেদাভেদ না রেখেই এই কাজ করা উচিত ৷ শাস্ত্র বলে, যিনি ব্রহ্মজ্ঞানে জ্ঞানী তিনিই ব্রাহ্মণ ৷ কোথাও বলা হয়নি ব্রাহ্মণের সন্তানরাই শুধুমাত্র যজ্ঞ উপবীত নেবেন বা ব্রহ্মজ্ঞান অর্জন করবেন ৷ তাই আমি চাইব, প্রত্যেকেই ব্রহ্মজ্ঞান অর্জনে এগিয়ে আসুক ৷ ব্রহ্মজ্ঞান অর্জন প্রত্যেকের অধিকার ৷"