মাধ্যমিকে জেলার সেরা ছাত্রীর রেজাল্ট পড়ে থাকল স্কুলেই, থৈবীর ছবি জড়িয়ে হাহাকার পরিবারের
তীব্র জ্বর নিয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয় থৈবী ৷ পরীক্ষা শেষে ধরা পড়ে জন্ডিস ৷ যার জেরে পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায় লিভার ৷

Published : May 2, 2025 at 6:05 PM IST
আসানসোল, 2 মে: দিনটা অন্যরকম হতে পারত ৷ আনন্দ, উচ্ছ্বাস, মিষ্টিমুখ ! কিন্তু, তা পালটে গেছে বুক ফাটা কান্নায় ৷ মাধ্যমিকে 674 নম্বর পেয়েছে আসানসোল উমারানি গড়াই মহিলা কল্যাণ স্কুলের ছাত্রী থৈবী মুখোপাধ্যায় ৷ শুধু ওই স্কুলের সেরা নয়, পশ্চিম বর্ধমান জেলায় ছাত্রীদের মধ্যে সম্ভাব্য সেরা ৷
কিন্তু, রেজাল্ট নিতে স্কুলে আসেনি থৈবী ৷ আর আসবেও না কোনদিন ৷ জানবেও না কেমন রেজাল্ট হয়েছিল তার ৷ কারণ, গত 16 এপ্রিল লিভার ফেলিওর হয়ে মৃত্যু হয়েছে আসানসোলের মেধাবী এই ছাত্রীর ৷ থৈবীর রেজাল্ট শুনেই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তার বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, এমনকি স্কুলের শিক্ষিকারা ৷ তার জন্য কাঁদছে গোটা আসানসোল শহর ৷
আসানসোলের ইসমাইল এলাকার বাসিন্দা ছিল থৈবী মুখোপাধ্যায় ৷ শহরের নামী সরকারি স্কুল উমারানি গড়াই মহিলা কল্যাণ স্কুলের মেধাবী ছাত্রী ছিল সে ৷ জীবনে কখনও ক্লাসে দ্বিতীয় হয়নি থৈবী ৷ জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষাতেও স্কুল টপার হয়েছে । তবে, এই রেজাল্ট আসার আগেই ছুটি নিয়ে চলে গিয়েছে সকলের প্রিয় থৈবী ৷

মাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই জন্ডিসে আক্রান্ত হয় সে ৷ দু’দিন আগেই প্রচণ্ড জ্বর আসে ৷ প্রথমে বোঝা যায়নি ৷ অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে পরীক্ষা দিতে যায় মনের জোরে ৷ কিন্তু, পরীক্ষা কেন্দ্রে ঠিকমতো লিখতে পারছিল না ৷ শিক্ষিকারা জানাচ্ছেন, বারবার মাথা নুইয়ে এলিয়ে পড়ছিল সে ৷ তবুও মনের জোরে আবার লেখা শুরু করেছে ৷
মাধ্যমিক শেষ হতেই শারীরিক পরীক্ষায় ধরা পড়ে লিভারে সমস্যা থৈবীর ৷ তড়িঘড়ি তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হায়দরাবাদে ৷ সেখানে গিয়ে তার বাবা-মা জানতে পারেন লিভার পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে থৈবীর ৷ তাকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করা ৷ খরচ প্রায় কোটি টাকা ৷ থৈবির বাবা বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় পেশায় হোমিওপ্যাথি ডাক্তার ৷ মা পিউ মুখোপাধ্যায় গৃহবধূ ৷ কীভাবে হবে চিকিৎসা ! মাথায় হাত পড়ে গিয়েছিল তাঁদের ৷ সেই সময় এগিয়ে এসেছিল গোটা আসানসোল শহর ৷ প্রায় 45 লক্ষ টাকা অনুদান উঠে আসে থৈবীর চিকিৎসার জন্য ৷ সবাই লড়েছিল থৈবীকে বাঁচাতে ৷

কিন্তু, চিকিৎসা চলাকালীন হায়দরাবাদে শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় থৈবীর ৷ তাকে বিশেষ হেলিকপ্টারে চেন্নাইয়ে ভেলোর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় ৷ কিন্তু, শেষ রক্ষা হয়নি ৷ গত 16 এপ্রিল সব লড়াই শেষ হয়ে যায় থৈবীর ৷ তার চলে যাওয়ায় শহরের বুকে যেন বজ্রাঘাত নেমে আসে ৷ তা-ও অনেকেই শোক কাটিয়ে উঠেছিলেন ৷ কিন্তু, মাধ্যমিকে থৈবীর ফলাফল সেই মন খারাপ আরও বাড়িয়ে দিল ৷
থৈবী মাধ্যমিকে 96.29 শতাংশ নম্বর পেয়ে স্কুলে প্রথম হয়েছে ৷ জেলায় ছাত্রীদের মধ্যে সম্ভাব্য সেরা ৷ আর তাই মেধাবী থৈবীর এই অসাধারণ রেজাল্ট দেখে কাঁদছে তার স্কুল, পরিবার, শহর ৷ মাধ্যমিকে থৈবীর প্রাপ্ত নম্বর 674 ৷ রেজাল্ট শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন থৈবীর দাদু, ঠাকুমা ৷ বাবা-মা এই পরিস্থিতি সহ্য করতে পারবেন না-বলে আসানসোলেই নেই ৷
থৈবীর দাদু বাসন্তীদাস মুখোপাধ্যায় বলেন, "বাংলা খুব ভালোবাসত ৷ আমি বলেছিলাম দাদুভাই কত পাবে বাংলায় ৷ আমাকে বলেছিল 96 পাবোই ৷ ওই পরীক্ষা দিয়েই খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল ৷ আমি রেজাল্ট দেখতে যাইনি ৷ ছেলেকে ফোন করেছিলাম ৷ বলল, আর রেজাল্ট দেখে কী হবে ?" বাংলাতে থৈবীর প্রাপ্ত নম্বর 99 ৷ জানে না পরিবারের লোকেরা ৷ বাকি বিষয়গুলির মধ্যে ইংরেজিতে 92, অংকে 98, ভৌতবিজ্ঞানে 97, জীবন বিজ্ঞানে 98, ইতিহাসে 95 ও ভূগোলে 95 নম্বর পেয়েছে সে ৷

স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা পাপড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "সুস্থ অবস্থায় থৈবী পরীক্ষা দিতে পারলে হয়তো রাজ্যে টপ হতে পারতো ৷ এই রেজাল্ট দেখে মন খারাপ হতো হয়তো ওর ৷ কিন্তু, আমাদের মনে হচ্ছে পরীক্ষাটাই চাপ হয়ে গেল ওর কাছে ৷ ওই অসুস্থ অবস্থায় যদি পরীক্ষা না-দিত, বিশ্রাম নিত, তাহলে থৈবী আমাদের মধ্যেই থাকত ৷"
শুক্রবার রেজাল্ট বেরনোর পর থৈবীর বাড়ি গিয়ে দেখা গেল হাহাকার করছেন ঠাকুমা ৷ ছবি মাথায় ঠুকে কাঁদছেন ৷ বিড়বিড় করে ঠাকুমা সবিতা মুখোপাধ্যায় বললেন, "আঁকা, গান সবেই পারদর্শী ছিল থৈবী ৷ জীবনে কখনও কোনও পরীক্ষায় হেরে যায়নি ও ৷ শুধু এইবার...'' কথাটা শেষ করতে পারলেন না ৷ থৈবীর বাঁধানো ছবির কাঁচে টপটপ করে পড়ছে চোখের জল ৷ সে দৃশ্য যে সহ্য করা যায় না !

