ETV Bharat / state

শিকড়ের সন্ধানে সুদূর আমেরিকা থেকে খড়দায় এলেন টেম্পরি

শিকড়ের খোঁজে মিনেসোটা থেকে 13 হাজার কিমি পেরিয়ে খড়দায় এলেন টেম্পরি ৷ স্মৃতিতে টাটকা লোকাল ট্রেন, পুলিশ স্টেশনের পাল্লাভাঙা দরজা আর ডবল ডেকার বাস ৷

ETEMPORI THOMAS STORY
স্মৃতিতে সেই দিনটা এখনও টাটকা টেম্পরি থমাসের (নিজস্ব চিত্র)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : March 19, 2025 at 10:33 AM IST

|

Updated : March 19, 2025 at 12:22 PM IST

4 Min Read
Choose ETV Bharat

ব‍্যারাকপুর, 19 মার্চ: সালটা 1977, তারিখ 14 ডিসেম্বর ৷ 48 বছর আগের ঘটনা ৷

কিন্তু স্মৃতিতে সেই দিনটা এখনও টাটকা টেম্পরি থমাসের ৷ মনে আছে সময়টাও ৷ সন্ধ্যা নামার আগে পরন্ত এক বিকেলে রান্নার জ্বালানির কাঠ জোগাড় করতে গিয়ে আচমকা পথ হারিয়ে ফেলেন টেম্পরি ৷ এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করার পর লোকাল ট্রেনে উঠে সেদিন সোজা নেমে পড়েছিলেন খড়দা স্টেশনে ৷ এরপর দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে স্টেশনেই ইতস্তত ঘোরাঘুরি করছিলেন একরত্তি মেয়েটি। যা নজর এড়ায়নি এক ব‍্যাক্তির ৷ সন্দেহ হওয়ায় সেদিন তিনি মেয়েটিকে নিয়ে আসেন খড়দা পুলিশ স্টেশনে ৷ কিন্তু, বাড়ির ঠিকানা বলতে না-পারায় ওই একরত্তি মেয়েটিকে থানার সেলেই কাটাতে হয়েছিল সেদিনের রাত ৷ সেখান থেকে প্রেসিডেন্সি জেল। কিছুদিন জেলে কাটানোর পর তাঁর ঠাঁই হয়েছিল একটি হোমে।

সেখানে এক বছর কাটিয়ে ইন্টারন্যাশনাল মিশন অফ হোমের সহায়তায় 13 হাজার কিলোমিটার দূরের মার্কিন মুলুকে পাড়ি দেওয়া ৷ তখন থেকে সেখানেই রয়েছেন 53 বছর বয়সি টেম্পরি। তাঁর পড়াশোনা, কাজকর্ম, বিয়ে-সবই আমেরিকায়। অ্যাশলি ও এস্তেল নামে দুই সন্তানও রয়েছে তাঁর। ভরা সংসার। নিশ্চিন্ত জীবনযাপন কাটাচ্ছিলেন টেম্পরি ৷ কিন্তু, জীবনে ছেদ ঘটল একটি ঘটনা ! বলা ভালো ‘আ লং ওয়ে হোম’ নামে একটি বই। অষ্ট্রেলিয়ান প্রবাসী ভারতীয় বংশোদ্ভূত সারো ব্রেইরলি'র সেই বইয়ে তুলে ধরা হয়েছে ঘরছাড়া এক কিশোরের জীবন কাহিনী। ঘরছাড়া সেই কিশোর কীভাবে সাগর পেরিয়ে সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে পৌঁছল, তারপর পথ চিনে কীভাবে ফিরে এল তাঁর জন্মদাত্রী মায়ের কাছে—এই মানবিক গল্পই লেখা হয়েছে উপন্যাসের পাতায়।

Tempori Thomas
আমেরিকা থেকে খড়দায় এলেন টেম্পরি (নিজস্ব চিত্র)

যা হুবহু মেলে মার্কিন প্রবাসী ভারতীয় বংশোদ্ভূত টেম্পরি থমাসের জীবন কাহিনীর সঙ্গেও । এরপরই স্মৃতির পাতা ওল্টাতে থাকেন ৷ ভারতেও তো একসময় তাঁর সাজানো সংসার ছিল ৷ মা-বাবা, দিদি ও দাদা সব কোথায় ? কিছু জায়গায় নাম যেমন, খড়দা, ব‍্যারাকপুর, কলকাতা অস্পষ্ট মনে আছে । তবে, স্পষ্ট মনে আছে বাবা বিড়ি কারখানায় কাজ করতেন ৷ মা লোকের বাড়িতে কাজ করতেন ৷ দাদার নাম অবশ্য মনে নেই ৷ শুধু আটকে আটকে কথা বলার ছবিগুলো স্মৃতিতে ধাক্কা মারে আবছাভাবে।

তাই, আবছা স্মৃতিগুলো তাজা করতে গত সপ্তাহে সুদূর আমেরিকার মিনেসোটা থেকে কলকাতাগামী বিমানে চড়ে বসেন টেম্পরি। প্রায় 13 হাজার কিলোমিটার বিমান যাত্রা শেষ করে শনিবার তিনি তাঁর জন্মভিটে খড়দায় আসেন শিকড়ের সন্ধানে ৷ চার দিনে পুরনো সব স্মৃতি আঁকড়ে বুধবার টেম্পরি রওনা দেবেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার উদ্দেশ্যে।

স্মৃতিরোমন্থন করে টেম্পরি বলেন, "আবছা হলেও মনে আছে মায়ের সঙ্গে ডবল ডেকার বাসে চড়ে দাদু-দিদার বাড়িতে যাওয়ার কথা। খড়দা থানার স্মৃতি এখনও টাটকা। থানার পিছনের দিকে যে দরজায় আমি বসেছিলাম, সেই দরজা এখনও রয়েছে ৷ কাছেই একটা নলকূপ ছিল, যেখানে আমি মুখ ধুয়ে ছিলাম ৷ খড়দা থানার পুরানো বিল্ডিং যেখানে একসময় ছিল, সেখানে এখন সোদপুর ট্রাফিক গার্ডের অফিস হয়েছে।" পুরোনো সব স্মৃতি যেন চোখের সামনে ভাসছে টেম্পরি থমাসের। তবে, খড়দা রেল স্টেশনের পুরনো আবছা স্মৃতি খুব একটা মনে করতে পারেননি তিনি।

কিন্তু, কিশোরের মতো টেম্পরিও কী তাঁর বাবা-মা, দিদি এবং দাদাকে খুঁজে পেলেন? সন্ধান পেলেন জন্মভিটের ? যেখানে একসময় তাঁর শৈশব কেটেছিল দিদি ও দাদার সঙ্গে ? উত্তর অবশ্য না ৷ খড়দায় এসে এবার তাঁকে খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে ৷ সন্ধান পাননি পুরোনো বাসার ৷ খোঁজ মেলেনি ফেলা আসা স্বজনেরও ৷ কিন্তু ছিন্নমূল হওয়ার যন্ত্রণা যাঁকে একবার বিঁধেছে, তিনি কী চিরকাল ঘরছাড়া হয়ে থাকতে পারেন ? তাঁকে ফিরে আসতেই হয় ৷ ফিরে আসবেন টেম্পরিও । পরের বছর ৷ নতুন স্বপ্ন বুকে নিয়ে, নতুন সংকেত স্মৃতিতে বুনে !

Last Updated : March 19, 2025 at 12:22 PM IST