বোনের মাধ্যমিক দিতে এল দিদি, কারও হাতে মোবাইল, কারও নেই অ্যাডমিট! দেওয়া হল না পরীক্ষা
হুগলির গরলগাছা বালিকা বিদ্যালয়ে বোনের হয়ে পরীক্ষা দিতে এল দিদি ৷ এদিকে, তিন পড়ুয়ার অ্যাডমিটই আসেনি বনগাঁয় ৷ তাই তারা এবছর পরীক্ষা দিতে পারল না৷

Published : February 10, 2025 at 7:50 PM IST
কলকাতা/হুগলি/বনগাঁ, 10 ফেব্রুয়ারি: মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রথম দিনে বিভিন্ন জায়গায় ধরা পড়ল একাধিক ঘটনা ৷ একদিকে হুগলিতে বোনের হয়ে পরীক্ষা দিতে কেন্দ্রে এল দিদি ৷ তার জেরে পরীক্ষা বাতিল হয়েছে ৷ আলিপুরদুয়ার ও হাওড়াতেও দু'জনের পরীক্ষা বাতিল হয়েছে ৷ অন্যদিকে, বনগাঁয় অ্যাডমিট না-আসায় পরীক্ষা দিতে পারল না তিন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ৷
চণ্ডীতলার ঘটনা: ছাত্রীর মাধ্যমিক পরীক্ষা বাতিলের ঘটনা ঘটেছে হুগলির চণ্ডীতলার গরলগাছা বালিকা বিদ্যালয়ে । মাধ্যমিকের পরীক্ষার্থী সকালে স্কুলে পরীক্ষা দিতে আসে । পরীক্ষার হলে অ্যাডমিট কার্ডের ছবি দেখে সন্দেহ হয় পর্যবেক্ষকদের । দেখা যায়, পরীক্ষার্থীর জায়গায় অন্য একজন ছাত্রী পরীক্ষা দিচ্ছে । মুখের অমিল থাকায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই বেরিয়ে আসে আসল সত্য । মাধ্যমিক পরীক্ষার ইমারজেন্সি রেসপন্স টিম ঘটনাস্থলে আসে । জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারে, পরীক্ষার্থীর হয়ে দিদি এসেছে পরীক্ষা দিতে । এরপরই খবর দেওয়া চণ্ডীতলা থানায় । সূত্রের খবর, পরীক্ষার্থীর দিদিকে আটক করেছে চণ্ডীতলা থানার পুলিশ ।
রেসপন্স টিমের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক কৌশিক শীল বলেন, "গরলগাছা গার্লস হাইস্কুলে পরীক্ষা ছিল কুমিরমোড়া আরকেএন হাইস্কুলের ছাত্রীদের । সেখানেই এক ছাত্রীর হয়ে তার দিদি পরীক্ষা দিতে ঢুকে পড়ে । ইনভিজিলেটর যিনি ছিলেন তিনি অ্যাডমিট কার্ড মেলাতে গিয়ে দেখেন, ছবির সঙ্গে মুখের মিল নেই । তখনই তাকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, পরীক্ষার্থীর হয়ে তার দিদি পরীক্ষা দিতে এসেছে । তারপর যা যা করার করা হয়েছে, পুলিশকে জানানো হয়, শিক্ষা দফতর এবং মধ্যশিক্ষা পর্ষদের আধিকারিকদের জানানো হয় ৷ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে । খুব তাড়াতাড়ি বিষয়টাকে ধরা গিয়েছে । পুলিশ আটক করে এবং যা আইনানুগ ব্যবস্থা আছে সেটা নেওয়া হবে ।"
হাওড়া-আলিপুরদুয়ারের ঘটনা: আরও দুজনের পরীক্ষা প্রথম দিনেই বাতিল করেছে মধ্যশিক্ষা পর্ষদ । তার মধ্যে একটি ঘটনা আলিপুরদুয়ারে নিউটাউন গার্লস স্কুলের ৷ পরীক্ষা চলাকালীন একঘণ্টার মধ্যেই পড়ুয়ার কাছ থেকে মোবাইল ফোন পান পর্যবেক্ষক । হাওড়াতেও বালি শান্তিরাম বিদ্যালয় থেকে স্মার্টওয়াচের জন্য ধরা পড়ে একজন । সবমিলিয়ে প্রথম দিনে মোট তিনজনের এবছরের জন্য পরীক্ষা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মধ্যশিক্ষা পর্ষদ ।
বনগাঁর ঘটনা: জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষায় বড় ধাক্কা খেল বনগাঁর তিন মাধ্যমিক পড়ুয়া । সমস্ত রকম প্রস্তুতি নিয়েও পরীক্ষার দিনে হতাশ হয়ে বাড়িতে বসে থাকতে হল তাদের । মাধ্যমিক পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড না আসায় তারা পরীক্ষায় বসতে পারল না । স্কুলের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ তুলছে ওই তিন পরিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা । তবে সেই অভিযোগ মানতে চাইছেন না স্কুল কর্তৃপক্ষ ।
জানা গিয়েছে, উত্তর 24 পরগনার বাগদা ব্লকের রানিহাটি উচ্চ বিদ্যালয়ের দুই ছাত্র শুভজিৎ খাঁ ও দীপ মণ্ডল এবছর পরীক্ষায় বসতে পারেনি । অন্যদিকে বনগাঁর নিউ বনগাঁ গার্লস স্কুলের ছাত্রী সঞ্চিতা বিশ্বাসও পরীক্ষায় বসতে পারেনি । তাদের দাবি, মাধ্যমিকের টেস্ট পরীক্ষা পাশ করে তারা আর পাঁচজন পড়ুয়ার মতো স্কুলে অ্যাডমিট কার্ডের জন্য নথিপত্র জমা দিয়েছিল । কিন্তু বাকিদের অ্যাডমিট কার্ড এলেও তাদের অ্যাডমিট কার্ড আসেনি । বিষয়টি স্কুলে জানানোর পর স্কুলের পক্ষ থেকে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল পরীক্ষার আগে তাদের অ্যাডমিট কার্ড চলে আসবে । শনিবার তারা স্কুলে অ্যাডমিট কার্ড এসেছে কি না তা খোঁজ নিতে গেলে স্কুলের শিক্ষকেরা জানিয়ে দেন, তাদের অ্যাডমিট কার্ড আসেনি । এবছর তারা পরীক্ষা দিতে পারবে না । পরের বছরের জন্য তারা প্রস্তুতি নিক ।
শুভজিৎ ও দীপ বলে, "অ্যাডমিট কার্ড না আসায় স্কুলের পক্ষ থেকে তাদের অভিভাবককে স্কুলে দেখা করতে বলা হয়েছিল । এছাড়াও তাদের কাছে 16 হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল । কিন্তু তারা দিতে পারেনি । তবে শিক্ষকদের কথা মতো তারা নতুন করে আবার আধার কার্ড ও জন্মের শংসাপত্র জমা দিয়েছিল । তার পরেও তাদের অ্যাডমিট কার্ড আসেনি ।" ওই দুই ছাত্রের দাবি, "স্কুলের কথা মতো সমস্ত কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরেও স্কুলের শিক্ষকদের গাফিলতির কারণে পরীক্ষা দিতে পারলাম না । পুরো একটা বছর নষ্ট হয়ে গেল ।" একই অভিযোগ তুলেছেন তাদের অভিভাবকেরা ।

এদিকে সঞ্চিতা বলে, "সকল বন্ধুরা পরীক্ষা দিচ্ছে । কিন্তু আমি দিতে পারলাম না, রাত জেগে ভালো প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, খুব খারাপ লাগছে । শিক্ষক শিক্ষিকা-সহ অনেকে বলছেন মন খারাপ করিস না, ভালো ভাবে পরের বছরের জন্য প্রস্তুতি নে । দেখবি খুব ভালো রেজাল্ট হবে ।"
গাফিলতি যে হয়েছে তা কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন নিউ বনগাঁ গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সোমা সরকার । তবে সেই দায় তিনি ঠেলেছেন মধ্যশিক্ষা পর্ষদের ঘাড়ে । তিনি বলেন, "গাফিলতি আমাদেরও কিছু ছিল, তবে আমরা শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলাম । কিন্তু বোর্ডের লোকেরা সহযোগিতা করেনি ।"
তবে গাফিলতির অভিযোগ মানতে অস্বীকার করেছেন রানিহাটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিক মধুমঙ্গল সরকার । তিনি বলেন, "শিক্ষকদের গাফিলতির কথাটা স্বীকার করতে পারছি না । কারণ আমরা অ্যাডমিট না আসার পরেই দফতরে যোগাযোগ করেছিলাম । অভিভাবকদের শুক্রবার স্কুলে আসতে বলেছিলাম । ওটিপি না আসার কারণে আমরা ওদের আবেদন জমা করতে পারিনি ।" স্কুলের তরফ থেকে টাকা চাওয়ার অভিযোগ তিনি পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন ।
উল্লেখ্য, সোমবার 55 জন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছে হাসপাতালে বসে । তাদের মধ্যে সবথেকে বেশি রয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলায় । সেখানে পরীক্ষা চলাকালীন অসুস্থ হয়ে পড়েন 6 জন পরীক্ষার্থী । তাদেরকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে । বারাসতেও পরীক্ষা চলাকালীন অসুস্থ হয়ে পড়ে পাঁচজন পরীক্ষার্থী । কলকাতার দক্ষিণে একজন পরীক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে । তাদের সকলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় । মধ্যশিক্ষা পর্ষদ সূত্রে খবর, তাদের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে অনেকটাই ভালো । পরীক্ষা দিতে কোনও অসুবিধা হয়নি ।
অন্যদিকে, পরীক্ষা শুরুর এক ঘণ্টা আগে থেকে ইনস্টাগ্রামে 2টো প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে যায় । যা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ায় । বিষয়টা নজরে আসে মধ্যশিক্ষা পর্ষদের । তবে মধ্যশিক্ষা পর্ষদ সূত্রের খবর, কলকাতা পুলিশের এবং বিধাননগর পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগ এই বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে । বিধাননগর পূর্ব থানায় দুটো বিষয়কে নিয়ে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে । যদিও এর মধ্যে একটি প্রশ্ন গত বছরের বলেই পর্ষদ সূত্রে খবর ।
অন্যদিকে প্রথম দিনেই বেশ কিছু জায়গায় ভুয়ো পরীক্ষার্থী ধরা পড়েছে । মধ্যশিক্ষা পর্ষদ সূত্রের খবর, পুঁটিয়ারী এলাকায় এক ছাত্রের বাবা ভুয়ো অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে একটি স্কুলের সামনে উপস্থিত হন । কিন্তু সেই স্কুলে কোনও পরীক্ষা হচ্ছিল না । অন্যদিকে ওই ছাত্রটি কিছু বছর আগে নিজেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে । আবার হাওড়ার মাজু এলাকাতেও এক পরীক্ষার্থী ভুয়ো অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছয় ।

