ফেলুদার এই গল্পে নিজে চলচ্চিত্র বানাননি, বার্নপুরের দলকে থিয়েটারের অনুমতি দেন সত্যজিৎ
ফেলুদা সিরিজের 'গোঁসাইপুর সরগরম' নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি সত্যজিৎ রায় ৷ তবে বার্নপুরের নাট্যদলকে এই গল্পে থিয়েটারের অনুমতি দিয়েছিলেন তিনি ৷ তারক চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিবেদন ৷

Published : May 2, 2025 at 3:29 PM IST
আসানসোল, 2 মে: সত্যজিৎ রায়ের গল্প অবলম্বনে থিয়েটার । ফেলুদা সিরিজের এমন একটি গল্প, যা নিয়ে তিনি নিজেও ফিল্ম তৈরি করেননি । আর সেই গল্প নিয়েই রাজ্যে প্রথম থিয়েটার মঞ্চস্থ হয় বার্নপুরে । থিয়েটারের স্ক্রিপ্ট পড়ে খুশি হয়ে লিখিত অনুমতি দিয়েছিলেন লেখক স্বয়ং । 1983 সালে আসানসোলের বার্নপুরের ভারতীভবনে মঞ্চস্থ হয় 'গোঁসাইপুর সরগরম'।
সত্যজিৎ রায়ের গল্প অবলম্বনে এই থিয়েটারের স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন শিল্পাঞ্চলের বিশিষ্ট নাট্যকার ও পরিচালক প্রয়াত শিশিরশোভন চট্টোপাধ্যায় । এই ঘটনা আসানসোল শিল্পাঞ্চলের নাট্যচর্চার ইতিহাসে উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে রয়ে গিয়েছে । প্রবাদপ্রতিম চিত্র পরিচালকের 104তম জন্মদিনে ইতিহাসের পাতা উলটে দেখল ইটিভি ভারত ।
কী ছিল প্রেক্ষাপট ?
1976 সালে প্রকাশ পায় সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা গল্পের সিরিজ গোঁসাইপুর সরগরম । বইটি প্রকাশ পাওয়ার পরই হইচই শুরু হয়ে যায় । প্রতিটি ফেলুদা সিরিজের মতোই এই গল্পের বইও হয়ে যায় সুপারহিট । তবে গোঁসাইপুর সরগরম নিয়ে সত্যজিৎ রায় নিজে কোনও চলচিত্র নির্মাণ করেননি । যদিও পরবর্তী কালে 1996 সালে সত্যজিতের পুত্র সন্দীপ রায় টিভি চলচিত্র হিসেবে 'গোঁসাইপুর সরগরম' নির্মাণ করেন । কিন্তু তার অনেক আগেই এই গল্প নিয়ে ইতিহাস রচিত হয়েছিল আসানসোলে । সত্যজিৎ রায়ের গল্প অবলম্বনে সেখানে প্রথম নাটক তৈরি হয় ।

1983 সালে সেই স্ক্রিপ্ট পড়ার পর খুশি হয়ে স্বয়ং সত্যজিৎ রায় নিজে লিখিত অনুমতি দিয়েছিলেন বার্নপুরের নাট্যদল দিশারীকে । সত্যজিৎ রায়ের অনুমতি পেয়ে বার্নপুরে তিনবার সফল ভাবে মঞ্চস্থ হয় 'গোঁসাইপুর সরগরম'। প্রতিবারই হাউসফুল । শুধু তাই নয়, দিশারীর কর্মকর্তাদের দাবি, সেই খবর পেয়ে গল্পের স্রষ্টা বলেছিলেন, কলকাতায় যদি এই নাটক মঞ্চস্থ হয়, তিনি নিজে রিহার্সাল দেখবেন, মঞ্চস্থ হওয়ার দিন উপস্থিত থাকবেন, এমনকি এই থিয়েটারের মিউজিক তিনি নিজে তৈরি করবেন । যদিও তা আর হয়ে ওঠেনি ।
সত্যজিৎ রায়ের কাছে অনুমতি নিতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা
দিশারী নাট্য সংস্থার তৎকালীন নাট্যকার ও পরিচালক শিশিরশোভন চট্টোপাধ্যায় গোঁসাইপুর সরগরম গল্প অবলম্বনে নাটকের স্ক্রিপ্ট লেখার পর চরিত্রায়নও করে ফেলেছিলেন । কিন্তু অনুমতি না-পেলে তো নাটক মঞ্চস্থ করা যায় না । সেজন্য লাগবে সত্যজিতের অনুমতি । আর সেই অসাধ্য সাধন করেছিলেন দিশারীর নাট্যকর্মী তরুণকান্তি ভট্টাচার্য । 'গোঁসাইপুর সরগরম' নাটকে তিনি জটায়ুর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন । তিনি সাহস ক'রে নাটকের স্ক্রিপ্ট নিয়ে সোজা ছুটেছিলেন সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে ৷ সেদিনের অভিজ্ঞতা ইটিভি ভারতের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন তরুণকান্তি ভট্টাচার্য ।

তিনি বলেন, "আমি তাঁর বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিলাম । গিয়ে দরজায় নক করতে এক প্রবীণ মানুষ বেরিয়ে এলেন । আমার কাছে জানতে চাইলেন, আমি কোথা থেকে এসেছি । আমি জানালাম, বার্নপুরের দিশারী নাট্যসংস্থা থেকে আসছি । এরপর উনি বাড়ির ভিতর ঢুকে গিয়ে আবার বেরিয়ে এসে বললেন, আপনাকে উনি ডাকছেন । আমি গিয়ে ওঁর সামনে হতবাক, সেই দীর্ঘদেহী । বজ্রকন্ঠ । আমি প্রণাম করি তাঁকে । তারপর আমাদের ইচ্ছের কথা জানাই । উনি স্ক্রিপ্ট চেয়ে নেন । পড়ার পর বলেন, খুব ভালো হয়েছে এবং কাগজের প্যাড নিয়ে খসখস করে লিখে আমাদের নাটকটি মঞ্চস্থ করার অনুমতি দেন ।"

তবে এখানেই শেষ নয়, নাটকটি মঞ্চে দেখতেও চেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায় । তরুণকান্তি ভট্টাচার্য জানান, "আমাকে সত্যজিৎবাবু বলেন, 'এই নাটক তোমরা কলকাতায় মঞ্চস্থ করলে আমাকে খবর দিও । আমি রিহার্সাল দেখতে যাব । নাটকটিও মঞ্চে দেখব । শুধু তাই নয়, কলকাতায় যদি এই নাটক তোমরা মঞ্চস্থ করো সেই নাটকের মিউজিক আমি করব ।' এ আমাদের কাছে বিরাট পাওয়া ছিল । কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ আমরা সেই নাটক কলকাতায় মঞ্চস্থ করতে পারিনি । আর তাই তাঁকে সেই নাটক দেখাতে আমরা অক্ষম থেকে গিয়েছি । এ আমাদের জীবনের বড় খেদ রয়ে গিয়েছে ।"
মুখোমুখি থিয়েটারের ফেলুদা
সিনেমায়, টিভিতে বারবারই ফেলুদার মুখ বদলেছে । তবে বাঙালিদের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় 'ফেলুদা' সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং তারপরে সব্যসাচী চক্রবর্তী । তবে এই বাংলায় থিয়েটারের 'ফেলুদা' বার্নপুরের দিশারী নাট্যসংস্থার তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় । তিনিই রাজ্যে প্রথম ফেলুদার ভূমিকায় মঞ্চে অভিনয় করেন ।

ইটিভি ভারতের মুখোমুখি হয়ে থিয়েটারের 'ফেলুদা' তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "এ আমার জীবনের এক বিরাট অভিজ্ঞতা । শিশিরশোভন বাবু না-থাকলে আমার এই ফেলুদার ভূমিকায় অভিনয় করা হত না । আর সেই নাটক মঞ্চস্থ করা মানে এক বিরাট হইহই ব্যাপার । আমরা মঞ্চের উপরে দোতলা সেট করেছিলাম । বিরাট দোতলা বাড়ি, বাগান সেটের মধ্যে ছিল । ওই সেটে একতলা এবং দোতলায় দুই জায়গাতেই অভিনয় হচ্ছিল । যা এখনকার সময়ে হয়তো অনেকটাই সহজ ৷ কিন্তু 1983 সালে সেই সেট তৈরি করা যথেষ্ট পরিশ্রমের বিষয় ও ব্যয়সাপেক্ষ ছিল । ইস্কোর ভারতী ভবনেই আমরা প্রথম এই শো করি 1983 সালের জুন মাসে । কিন্তু সেই শো হাউস ফুল হয়ে যায় । মানুষজন বসতে জায়গা পাননি । হলের ভেতরে যত মানুষ ছিল, হলের বাইরেও তত মানুষ । তখন দাবি ওঠে দ্বিতীয় শো করার । আমরা ভারতী ভবনের বাইরে বড় মঞ্চে এই থিয়েটার আবার দ্বিতীয়বার মঞ্চস্থ করি । সে এক বিরাট সেট তৈরি করা হয় । পরবর্তীকালে তৃতীয়বারও এই থিয়েটার অভিনীত হয় ভারতী ভবনে বঙ্গ সংস্কৃতি উৎসবে ।
এখন আবার এই থিয়েটার ?
এক সময় এই থিয়েটার গোটা শিল্পাঞ্চল-সহ জেলাতে তোলপাড় তুলেছিল । কিন্তু থিয়েটারের সেই সোনালি দিন আর বোধহয় ফিরিয়ে আনা যাবে না বলেই আক্ষেপ করেছেন গোঁসাইপুর সরগরম থিয়েটারে তোপসের ভূমিকায় অভিনয় করা অভিনেতা এবং বর্তমান দিশারী নাট্যসংস্থার সভাপতি সমীর দত্ত ।
ইটিভি ভারতকে সমীর দত্ত জানিয়েছেন, "গোঁসাইপুর সরগরম নাটকে অভিনয় করা আমাদের কাছে স্বপ্নের মতো ছিল । এত বড় কাজ আমরা কখনও করিনি । এক বিরাট মাপের পেশাদারী কাজ হয়েছিল । কিন্তু সেই কাজ এখন আর সম্ভব নয় । বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে যাঁরা নাটক করতে আসছেন, তার বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই প্রাইভেট সংস্থার হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে রাতে রিহার্সাল দিতে আসেন । কতটুকুই বা তাঁরা সময় পান থিয়েটারের জন্য ! থিয়েটার তো পেশা হয়ে উঠতে পারেনি এই শিল্পাঞ্চলের থিয়েটার কর্মীদের কাছে । তাই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে যাওয়া থিয়েটার পাগল মানুষদের জন্যই আজও এটা যেটুকু টিকে আছে । কিন্তু বড় কাজ করতে আমাদের ভয় হয় । সেই ডেডিকেশন, সেই একনিষ্ঠতা আর হয়তো মফস্বলের থিয়েটারে পাওয়া যাবে না । তাই আক্ষেপ হয়, ওই ধরনের বড় কাজ আমরা আর করতে পারব না ।"

