45-এ মেয়ের সঙ্গে BA পাশ মায়ের! আগরপাড়ার সঙ্গীতাই এখন 'অনুপ্রেরণা'
মণীন্দ্রচন্দ্র কলেজের ছাত্রী সঙ্গীতা পেয়েছেন 75 শতাংশ নম্বর ৷ স্নাতকোত্তর সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন নিয়ে পড়তে চান তিনি ৷

Published : August 30, 2025 at 5:57 PM IST
আগরপাড়া (উত্তর 24 পরগনা), 30 অগস্ট: পড়াশোনা হোক কিংবা স্বপ্ন দেখা ! তার যে কোনও বয়স হয় না, তা প্রমাণ করে দেখালেন উত্তর 24 পরগনার আগরপাড়ার বাসিন্দা সঙ্গীতা দে । 45 বছর বয়সে মেয়ে সহেলীর সঙ্গে বিএ পাশ করে এই গৃহবধূ যেন 'অনুপ্রেরণা' হয়ে উঠলেন অন্যদের কাছেও । তাও আবার 75 শতাংশ নম্বর পেয়ে । সঙ্গীতার পরের লক্ষ্য সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন নিয়ে পড়াশোনা করে স্নাতকোত্তর হওয়া । সেই লক্ষ্যে তিনি এগোতে চান মেয়ের সঙ্গেই ।
একসময় সঙ্গীতার স্নাতক হওয়ার স্বপ্ন ছিল । কিন্তু সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় । মাঝপথে বিয়ে হওয়ার পর আর পড়াশোনা করা হয়ে ওঠেনি । সন্তান এবং সংসারের বোঝা সামলাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন । তবে, স্বপ্ন দেখা ছাড়েননি তিনি । ছোট মেয়ে সহেলী একটু বড় হতেই আবারও পড়াশোনা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন মা সঙ্গীতা ।

2019 সালে রবীন্দ্র মুক্ত বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন । পরের ধাপ উচ্চমাধ্যমিক দেওয়ার জন্য তিনি নতুন করে স্কুলেও ভর্তি হন । ছোট মেয়ে সহেলীও তখন একাদশ শ্রেণীতে । যদিও মা-মেয়ের স্কুল ছিল আলাদা। মা সঙ্গীতা পড়তেন বেলঘরিয়ার নন্দননগর আদর্শ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে । আর মেয়ে সহেলী পড়তেন বেলঘরিয়া মহাকালী গার্লস হাইস্কুলে । 2022 সালে মেয়ের সঙ্গেই উচ্চমাধ্যমিক দেন সঙ্গীতা । মা পান 438 নম্বর । মেয়ে 397 ।
এর পরেই স্নাতক হওয়ার লক্ষ্যে মা-মেয়ে দু'জনেই ভর্তি হয়ে যান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ শ্যামবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র কলেজে । সেখানে একে একে ছ'টি সেমিস্টারের গণ্ডি পেরিয়ে একসঙ্গে বিএ পাশ করেছেন মা ও মেয়ে । সপ্তাহ খানেক আগে চূড়ান্ত সেমিস্টারের ফলপ্রকাশ হয়েছে । তাতে দেখা গিয়েছে স্নাতক হয়েছেন দু'জনেই । এবার মেয়ে পেয়েছেন 80 শতাংশ নম্বর । মা 75 শতাংশ !

তবে সংসারের সবকিছু সামলে এতটা পথ এগোনো সঙ্গীতার পক্ষে খুব একটা সহজ ছিল না । বিশেষ করে আগরপাড়া থেকে প্রতিদিন শ্যামবাজারের কলেজে গিয়ে ক্লাস করা মোটেই সহজ ছিল না তাঁর কাছে । ভোরে উঠে পরিবারের সকলের জন্য রান্না করা, তার পর পাড়ার পাঁচ জন শিশুকে পড়ানো, কলেজের জন্য তৈরি হওয়া । তার পর নাকেমুখে কিছু গুঁজেই ছুট, গত তিন বছর ধরে এটাই ছিল সঙ্গীতার রোজকার রুটিন । তার উপর সংসার চালাতে টুকটাক সেলাইয়ের কাজও করতে হতো ।
এসবের পাশাপাশি গান এবং নাটকের প্রতিও আগ্রহ রয়েছে তাঁর । গান যেমন শেখেন, তেমনই একটি নাটকের দলেও যুক্ত রয়েছেন এই গৃহবধূ । বছর 45-র সঙ্গীতার কথায়, "দীর্ঘদিনের স্বপ্ন আজ পূরণ হল । স্নাতকস্তরের শংসাপত্র হাতে পেয়ে কী আনন্দ সেটা বলে বোঝানো যাবে না । এরপর আমার ইচ্ছা রয়েছে এমএ করার । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলে সেখান থেকেই স্নাতকোত্তর করব । সেই সঙ্গে চাকরি করে স্বামীর পাশেও দাঁড়াতে চাই ।"

এদিকে, মায়ের স্নাতক হওয়া এবং পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ দেখে রীতিমতো আনন্দে আত্মহারা মেয়ে সহেলী-ও । বছর একুশের এই তরুণী বলেন, "টানা তিন বছর মায়ের সঙ্গে কলেজে এক বেঞ্চে পাশাপাশি বসতাম । কখনও মনে হয়নি বয়সের ব্যবধান রয়েছে আমাদের দু'জনের মধ্যে । কলেজ শেষে বন্ধুদের সঙ্গে চুটিয়ে গল্পও করেছি । কখনও মা বাধা দেয়নি । মা সত্যিই অনুপ্রেরণা সকলের কাছে ।"
অন্যদিকে, স্নাতকের পর এবার মেয়ের সঙ্গে উচ্চশিক্ষাও করার ইচ্ছা রয়েছে সঙ্গীতার । তাঁর স্বামী পেশায় গাড়িচালক স্বপন দে বরাবরই মা-মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে সমর্থন জুগিয়ে গিয়েছেন । যা নিঃসন্দেহে অভাবনীয় বলেই মনে করছেন পাড়া-প্রতিবেশীরা ।

