হাঁটু-জলে 'হতশ্রী' রাস্তা ! অসুস্থ প্রৌঢ়াকে ডুলিতে চাপিয়ে হাসপাতালের পথে পরিজনেরা
এই ঘটনায় বিজেপির কটাক্ষ, তৃণমূলের উন্নয়ন চলেছে খাটিয়ায় চেপে । অন্যদিকে শাসকদলের বিধায়কের দাবি, বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যম বাড়াবাড়ি করেছে ৷

Published : July 31, 2025 at 2:10 PM IST
হিঙ্গলগঞ্জ, 31 জুলাই: কাদা ভর্তি মাটির রাস্তায় হাঁটু সমান জল । তার উপর দিয়েই অসুস্থ প্রৌঢ়াকে ডুলিতে চাপিয়ে কাঁধে করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন পরিজনেরা । এবার রোগী-দুর্ভোগের এমনই ছবিই ধরা পড়ল উত্তর 24 পরগনা জেলায় হিঙ্গলগঞ্জের গোবিন্দকাটি পঞ্চায়েত এলাকায় ।
যদিও ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি ইটিভি ভারত ৷ তবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে ৷ সেই ভিডিয়োতে রোগীর পরিজনদের এ-ও বলতে শোনা যাচ্ছে, 'আমরা কী ভোট দিই না ! প্রতি বছরই এই অবস্থা । ভোট না দেওয়াই ভালো ।' তবে এই ঘটনায় স্থানীয় তৃণমূল বিধায়ক দেবেশ মণ্ডলের দাবি, বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যম বাড়াবাড়ি করেছে ৷
হিঙ্গলগঞ্জের গোবিন্দকাটি পঞ্চায়েতের মালিকান ঘুমটি এলাকা । ফি বছর বর্ষায় সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এই এলাকার গ্রামের কাঁচা রাস্তা জলে ডুবে যায় । কাদা-মাটির প্যাচপ্যাচে রাস্তা দিয়েই যাতায়াত করতে হয় বাসিন্দাদের । সেই সময় দুর্ভোগের শেষ থাকে না । যার ব্যতিক্রম ঘটেনি এই বছরও । গত কয়েকদিনের নিম্নচাপের বৃষ্টিতে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে গোটা এলাকা । রাস্তা বলে কিছু নেই সেখানে । কাদা-জলে ভরা রাস্তা আরও বেহাল হয়ে পড়েছে । সেই রাস্তা দিয়ে রোগী নিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, কোনও মানুষও সুস্থভাবে যেতে পারবে না । রাস্তার এমনই ভয়াবহ অবস্থা ৷

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মালিকান ঘুমটি থেকে গোবিন্দকাটি অঞ্চল পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার রাস্তা দীর্ঘদিন ধরেই বেহাল ৷ শেষ কবে রাস্তার সংস্কার হয়েছে তা মনে করতে পারছেন না গ্রামের বাসিন্দারা । বেহাল রাস্তা সংস্কারের বিষয়ে বারবার স্থানীয় বিধায়কের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে । তার পরেও সেই রাস্তা সংস্কার হয়নি বলে অভিযোগ । বাসিন্দাদের কথায়, প্রতি বছর বর্ষার সময় এই দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাঁদের । কেউ অসুস্থ হলেই তখন দুর্দশা আরও বাড়ে । রোগীকে সেই সময় ডুলিতে চাপিয়ে নিয়ে যেতে হয় হাসপাতালে । এটাই যেন ভবিতব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

এদিকে, বেহাল রাস্তার জেরে দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয় ছোট ছোট শিশুদেরও । স্কুলে যেতে হলে ব্যাগে অতিরিক্ত পোশাক নিয়ে যেতে হয় তাঁদের । কারণ, কাদা-জল পেরিয়ে স্কুল পর্যন্ত যেতে না যেতেই পড়ুয়াদের পোশাক নোংরায় ভরে যায় । তখন ব্যাগে নিয়ে আসা পোশাক পালটাতে হয় স্কুলে এসে । বেহাল রাস্তা চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ায় আপাতত সেখান দিয়ে যাতায়াত করার জন্য বাঁশের পাটাতন তৈরি করেছেন গ্রামবাসীরা নিজেরাই । সেই অস্থায়ী পাটাতনই এখন ভরসা গ্রামের বাসিন্দাদের ।
এই বিষয়ে সিরাজুল গাজী নামে এক গ্রামবাসী বলেন, "রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে কোনও গাড়ি ঢোকে না । এক সময়ে বিধায়ক দেবেশ মণ্ডল গোবিন্দকাটি পঞ্চায়েতের প্রধান ছিলেন । সেই সময় তাঁকে ফুল-মালা দিয়ে বরণ করে এনেছিলাম এখানে । তিনি প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন রাস্তা করে দেবেন । কিন্তু বিধায়ক হয়ে যাওয়ার পরেও দেবেশ মণ্ডল সেই প্রতিশ্রুতি রাখেননি । উনি নিজেও ভালো করে জানেন রাস্তার কী বেহাল দশা ৷ আজকেও একজন রোগীকে ডুলিতে চাপিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে । আমরা চাই দ্রুত এই রাস্তার সংস্কার হোক । যাতে আর কাউকে এই ভোগান্তি না পোহাতে হয় ।"

এদিকে, এই ঘটনায় গ্রামবাসীদের পাশে দাঁড়িয়ে সরাসরি তৃণমূল বিধায়ককে দুষেছেন বিজেপির রাজ্য মুখপাত্র দীপঙ্কর সরকার । তিনি বলেন, "হিঙ্গলগঞ্জের এই ঘটনা আমাদের কাছে লজ্জার । বিধায়ক নিজে একসময় পঞ্চায়েত প্রধান ছিলেন ওই এলাকার । তাঁর এলাকার রাস্তারই এই বেহাল দশা । শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে ব্যাগে অতিরিক্ত জামা নিয়ে । যতটুকু আমরা শুনেছি প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা সঙ্গীন । তৃণমূল কী উন্নয়ন করছে তা হিঙ্গলগঞ্জের ঘটনাতেই স্পষ্ট । তৃণমূলের উন্নয়ন চলেছে খাটিয়ায় চেপে ।"

যদিও রাস্তার বেহাল অবস্থা সংবাদমাধ্যমের 'তৈরি করা ছবি' বলে দাবি করেছেন হিঙ্গলগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক দেবেশ মণ্ডল । তাঁর কথায়, "রাস্তার সংস্কার হচ্ছে না, এটা ঠিক নয় । বাম আমলে গ্রামীণ রাস্তাগুলোর ভগ্নদশা ছিল । তার থেকে এখন অনেক কাজ হয়েছে । আরও রাস্তার কাজ চলছে । যেখানকার ছবি দেখানো হচ্ছে সেখানকার রাস্তার সংস্কারের কাজও চলছে । এটা আমি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলতে পারি । তবে যে কোনও কাজ করতে গেলে একটু সময় লাগে । গোবিন্দকাটি অঞ্চলে এমন কোনও রাস্তা নেই, যেখান দিয়ে মানুষ হাঁটতে পারবে না । এসব রংবাজমাধ্যমের তৈরি করা গল্প । মানুষকে খেপিয়ে, লেলিয়ে দেওয়া ছাড়া সংবাদমাধ্যমের আর কোনও কাজ নেই । চোখ দিয়ে দেখলেই ঠিক রাস্তার উন্নয়ন দেখতে পাবেন ।"
এর আগে এমনই লজ্জার ছবি উঠে এসেছিল পশ্চিম মেদিনীপুর এবং মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে । সেখানে কখনও রোগীকে ডুলি, আবার কখনও খাটিয়ার উপর ভরসা করতে দেখা গিয়েছিল ৷ এবার সেই ছবিরই কার্যত পুনরাবৃত্তি ঘটল উত্তর 24 পরগনায় ৷

