ETV Bharat / state

প্রতিবাদের কাছে 'মানবিকতা'য় হার মানল উৎসব ! রানুচ্ছায়ার বার্তায় ঝুঁকল মোহরকুঞ্জ

এক প্রতিবাদে সামিল হতে নিজেদের উৎসব-অনুষ্ঠান বন্ধ রাখলেন শিল্পীরা ৷ অ্য়াকাডেমির রানুচ্ছায়া মঞ্চে বিরল সন্ধ্যার সাক্ষী থাকল উপস্থিত জনতা ৷

Rally Demanding Justice for RG Kar Victim in Kolkata
আরজি করের নির্যাতিতার ন্যায় বিচারের দাবিতে মিছিল (ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : March 9, 2025 at 10:33 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

কলকাতা, 9 মার্চ: প্রতিবাদের কাছে হার মানল উৎসব ৷ মানবিকতার কারণেই হার মেনে বিচারের দাবি জোরালো করল ঐক্যবদ্ধতা। আবেদনে সাড়া দিয়ে মাথা নোয়ানোয় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল অভয়া মঞ্চও ৷ রবিবার সকালে আরজি কর হাসপাতাল থেকে যাদবপুর ইস্যুতে শাসকের বিরুদ্ধে জোড়া মিছিলে ন্যায় বিচারের দাবি ওঠে ৷

শহরের দুই প্রান্ত থেকে দু'টি বড় মিছিল মেশে রবীন্দ্র সদনের সামনে রানুচ্ছায়া মঞ্চে ৷ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি থেকে সেলিব্রিটি, রাজনীতিকদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে আওয়াজ ওঠে ন্যায় বিচারের ৷ সাত মাস পেরোলেও কেন চিকিৎসক তরুণী ন্যায় বিচার পেলেন না- সেই প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা ৷ একই ভাবে, শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর গাড়ির নীচে আহত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র ইন্দ্রানুজের ন্যায় বিচারের দাবিতে স্লোগান উঠেছে ৷ কেন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুকে গ্রেফতার করা হবে না ?

রানুচ্ছায়ার বার্তায় ঝুঁকল মোহরকুঞ্জ (ইটিভি ভারত)

সন্ধ্যে তখন ছ'টা ৷ রবীন্দ্র সদনের রানুচ্ছায়া মঞ্চের উল্টোদিকে মোহর কুঞ্জে কলকাতা ফোটোগ্রাফি চর্চার উদ্যোগে নৃত্যানুষ্ঠান ও বসন্ত উৎসবে চলছিল ৷ সেখানে বক্স জোরেই বাজছিল ৷ এদিকে জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টর্স ও অভয়া মঞ্চের ডাকে একটি মিছিল দক্ষিণ কলকাতার হাজরা এবং অন্যটি ধর্মতলা থেকে শুরু হয়ে রানুচ্ছায়া মঞ্চে মিশে যায় ৷

এদিকে ফোটোগ্রাফি চর্চার অনুষ্ঠানের আওয়াজে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ইতিউতি বিরক্তির প্রকাশ ঘটে ৷ কেউ কেউ কটূক্তিও করতে থাকেন ৷ এসবের মাঝে চিকিৎসক তমোনাশ চৌধুরী মঞ্চে উঠে বলেন, "আমরা আগে সাউন্ডের ব্যবস্থা করিনি ৷ এখন করতে বাধ্য হয়েছি ৷ কারণ, আমরা আগে জানতাম না পাশে এত জোরে বক্স বাজবে ৷ তবে, তাঁদের অনুরোধ করেছি, যতক্ষণ অভয়ার বাবা-মা বক্তব্য করবেন, ততক্ষণ যেন সাউন্ড বন্ধ রাখেন ৷"

Justice for RG Kar
নাগরিক সমাজের প্রতিবাদের কারণে অনুষ্ঠান বন্ধ মোহর কুঞ্জে (ইটিভি ভারত)

এই বক্তব্যের মিনিট পাঁচেক বাদে মোহরকুঞ্জে সাউন্ড বন্ধ হয়ে যায় ৷ খোঁজ নিয়ে দেখা যায় নাগরিক সমাজের আবেদন সাড়া দিয়েছেন তাঁরা ৷ উদ্যোক্তাদের মধ্যে রনিতা দত্ত ইটিভি ভারতকে বলেন, "আমি বা আমরা মানবিক জীব ৷ আমাদের মধ্যে মানবিকতা আছে ৷ আমিও সঠিক বিচার চাই ৷ আমি মা ৷ মেয়েও ৷ ফলে, তাঁদের অনুরোধে মিনিট দশেক নাচ বন্ধ রাখা যায় ৷" এতে খুশি হয়ে পরে চিকিৎসক তমোনাশ চৌধুরী ইটিভি ভারতকে বলেন, "আমরা তাঁদের ধন্যবাদ জানাই ৷ তাঁরা আমাদের আবেদনে সাড়া দিয়েছেন, এটাই আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততা ৷ প্রত্যেক মা/মেয়েই চাইবেন এই ধরনের ঘটনার সঠিক বিচার হোক ৷ কিন্তু, দুঃখের বিষয় আমাদের রাজ্যের মহিলা মুখ্যমন্ত্রী সেই বিষয়টা বুঝলেন না ৷"

এদিকে আজকের মিছিলে সিনিয়র ও জুনিয়র চিকিৎসক, মেডিক্যাল-সহ বিভিন্ন পেশা, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী ও যুবসমাজ, কার্যত সর্বস্তরের মানুষজন, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি জগতের ব্যক্তিত্ব, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মী- সবাই অংশ নেন ৷ তাঁদের অধিকাংশই আভিযোগের সুরে বলেন, "আরজি করের ঘটনার সাত মাস পরেও বিচার হয়নি ৷ শাস্তি হয়নি প্রকৃত দোষীদের ৷ কলকাতা পুলিশের মতো সিবিআই তদন্তের গড়িমসি করছে ৷"

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটনায় বামফ্রন্টের তরফে গতকালই বিমান বসু বলেছেন, "শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষাজগত কলুষিত হয়েছে ৷ দুটোই শাসক দল কলুষিত করেছে ৷ দোষীদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে ৷" মিছিল থেকে সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেন, "যুগ যুগ ধরে মানুষ প্রতিবাদ করে আসছে ৷ ন্যায় বিচারের দাবি আদায়ে পথে নেমেছে ৷ নামছেনও ৷ সাতমাস আগে বিজেপি-তৃণমূল আলাদা ছিল ৷ এখন তাঁরা এক হয়ে গিয়েছে ৷ এক হয়ে হিন্দু-মুসলিম করে ভোট করতে চেয়েছে ৷ সেখানে দাঁড়িয়ে মানুষ ন্যায়ের দাবিতে লড়াই করছে ৷"

যুবনেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় বলেন, "সরকার বিচার চাইছে না ৷ যে যার উপর পারছে দোষারোপ করছে ৷ যারা কালপ্রিটকে ধরতে চাইছে না, তাঁরা সব একদিকে ৷ আর ন্যায় বিচার চাওয়ার মানুষগুলো একদিকে ৷ যতই চেষ্টা করুক ইস্যু ঘোরাতে পারবে না ৷ পুলিশের ক্ষমতা হলে ব্রাত্য বসুকে গ্রেফতার করত ৷ ক্ষমতায় যাঁরা আছেন তাঁদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর দম পুলিশের নেই।"

জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টর্স, পশ্চিমবঙ্গ ও অভয়া মঞ্চ এবং অ্যাসোসিয়েশন অব হেলথ সার্ভিস ডক্টর্স, পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিরা এদিনের মিছিলে অংশ নেন ৷ তাঁদের বক্তব্য, "আজ নৃশংস হতাকাণ্ডের সাত মাস পূর্ণ হচ্ছে ৷ অভয়া এখনও বিচার পাননি ৷ সবটাই ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে ৷ একই ভাবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষামন্ত্রীর ঔদ্ধত্য ও দম্ভের শিকার পড়ুয়ারা ৷ সেখানে তাঁর গাড়ির তলায় চাপা পড়লেন সেখানকারই পড়ুয়ারা ৷ সব ক্ষেত্রেই প্রশাসন নির্বিকার ৷ অথচ, প্রতিবাদে উত্তাল গোটা রাজ্য।"

অ্যাসোসিয়েশন অব হেলথ সার্ভিস ডক্টর্স-এর সাধারণ সম্পাদক চিকিৎসক উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "শাসকের প্রত্যক্ষ মদতে রাজ্যজুড়ে ভয়ের রাজনীতি অব্যাহত ৷ গত কয়েক বছরে গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই পচে গলে গিয়েছে ৷ চারদিকে জাল জুয়াচুরির রাজত্ব ৷ ভেজাল ওষুধের রমরমা ৷ প্রতিবাদ করলেই প্রতিহিংসা ৷"

জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টর্সের তরফে ডাঃ পুণ্যব্রত গুণ বলেন, "9 অগস্ট এবং তারপর ধারাবাহিকভাবে আমরা বাংলার মেয়েকে, মেয়েদেরকে বাঁচাতে পারিনি ৷ যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরা কোনওক্রমে প্রাণে বেঁচেছে ৷ আমরা আর কাউকে হারাতে চাই না ৷ শাসকের ঔদ্ধত্য আর দম্ভ তাদের মনে করায় তারা খুন করতে পারে, অপরাধীদের আড়াল করতে পারে, সন্দেহজনক ওষুধের দায় এড়াতে পারে ৷ শিক্ষামন্ত্রী নিজে শিক্ষক হয়েও ছাত্রছাত্রীদের গাড়ির চাকায় পিষে ফেলতে পারে এবং চূড়ান্ত দাম্ভিক প্রশাসন প্রতিটি ক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যবস্থাগ্রহণ দূরের কথা, অপরাধের উৎসমুখ থেকে প্রমাণ লোপাট করে প্রতিটি ঘটনাকে লঘু করা ও ধামাচাপা দিতে পারে ৷"

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "একজন শিক্ষামন্ত্রীর ঔদ্ধত্য আর দম্ভ কোন জায়গায় যেতে পারে, তা আমরা যাদবপুরে দেখলাম ৷ আমরা রাস্তায় ছিলাম, আছি এবং ন্যায় বিচার না পাওয়া পর্যন্ত থাকব ৷"