ETV Bharat / state

এবার ইংরেজবাজার ব্লকে শুরু গঙ্গা ভাঙন, আতঙ্ক ছড়াচ্ছে পুরো মালদায়

স্থানীয় মিলকি গ্রাম পঞ্চায়েতের খাসকোল গ্রামে শুরু হয়েছে গঙ্গার ভাঙন৷ আতঙ্কিত স্থানীয় মানুষ৷

Ganga Erosion in Malda
এবার ইংরেজবাজার ব্লকে শুরু গঙ্গা ভাঙন (নিজস্ব ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : October 10, 2025 at 9:21 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

মালদা, 10 অক্টোবর: আশঙ্কা ছিলই৷ এবার সেই আশঙ্কাই সত্যি হতে চলেছে৷ কালিয়াচকের দু’টি ব্লক, রতুয়া, মানিকচকের পর এবার ভয়ঙ্করী গঙ্গার নজর পড়েছে জেলা সদর ইংরেজবাজার ব্লকে৷ দিন তিনেক ধরে সেখানকার মিলকি গ্রাম পঞ্চায়েতের নদী সংলগ্ন খাসকোল গ্রামে চলছে গঙ্গার ভাঙন৷ তলিয়ে যাচ্ছে কৃষিজমি৷ নদীতীরের বসতির দিকে ধেয়ে আসছে আগ্রাসী গঙ্গা৷ কখন যে ঘরবাড়ি নদীতে তলিয়ে যাবে, বুঝতে পারছেন না কেউ৷

পরিস্থিতি বুঝে রাত জাগতে শুরু করেছেন নদীপাড়ের মানুষজন৷ তবে সৌভাগ্যের কথা, গত 24 ঘণ্টায় সেখানে নতুন করে আর ভাঙন হয়নি৷ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে এসেছেন জেলা সেচ দফতরের কর্তারা৷

স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, মঙ্গলবার থেকে পাড় কাটতে শুরু করেছে গঙ্গা৷ তাঁরা আগেই আশঙ্কা করেছিলেন, মানিকচকের ভূতনি চরের পর এবার এই গ্রাম গঙ্গার বিষ নজরে পড়বে৷ সেই আশঙ্কা সত্যি হয়েছে৷ গঙ্গার প্রথম ছোবল পড়েছে রবিদাস পাড়ায়৷ এখানে চারটি পাড়া রয়েছে৷ রবিদাস পাড়া ছাড়াও রয়েছে চৌধুরী পাড়া, কাশীটোলা ও সামসুদ্দিন পাড়া৷ সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে চারশো বাড়ি৷

খবর পেয়ে মঙ্গলবারই প্রশাসন বালি-মাটির বস্তা ফেলে ভাঙন আটকানোর চেষ্টা করে৷ কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়৷ এখন নদীতে প্রচুর জল৷ বালি-মাটির বস্তা মুহূর্তে স্রোতে ভেসে যায়৷ তারপর ভাঙন রোধে আর নতুন করে কোনও পদক্ষেপ করেনি সেচ দফতর৷ সেই অবসরে প্রায় 5-7 বিঘা জমি নদীতে তলিয়ে গিয়েছে৷ নদীর ধারে পাকা বৈশাখী কালীমন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল৷ হঠাৎ ভাঙন শুরু হওয়ায় সেই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে৷ তবে বৃহস্পতিবার থেকে নতুন করে আর ভাঙন হয়নি, এটাই রক্ষে৷

খাসকোল গ্রামের প্রায় সবাই ভাঙন উদ্বাস্তু৷ আগে অন্য জায়গায় ঘর ছিল তাঁদের৷ ভাঙনে সবকিছু নদীতে চলে গিয়েছে৷ সর্বস্ব হারিয়ে তাঁরা এই গ্রামে ফের নদীতীরেই আস্তানা বানিয়েছেন৷ কিন্তু এখানেও যে তাঁদের সেই পুরনো ছবি দেখতে হবে, সেটা অনেকেই ভাবেননি৷ রবিদাস পাড়ার সোনাবানু বিবি বলছেন, “ভীষণ আতঙ্কে আছি৷ গঙ্গার ভয়ে রাতে ঘুম হয় না৷ কখন যে বাড়িঘর গঙ্গা গিলে নেবে জানি না৷ আমাদের অন্য কোথাও বাড়িঘর নেই৷ জায়গা-জমিও নেই৷ যা ছিল, আগেই গঙ্গায় চলে গিয়েছে৷ এখন আমাদের আর কিছু নেই৷’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘ভাঙনের আতঙ্ক সবসময় তাড়া করে বেড়াচ্ছে৷ বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে নিজেরা রাত জাগছি৷ নদী কোথায় পাড় কাটল, সারা রাত ধরে ঘুরে ঘুরে দেখছি৷ গ্রামের সবাই রাত জাগছে৷ কালীমন্দিরের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে৷ নদীর ধারে একটা বটগাছ ছিল৷ সেখানে জামাইষষ্ঠী, দুর্গাপুজো-সহ বিভিন্ন পুজো হচ্ছিল৷ অত বড় গাছটা নদীতে পড়ে গিয়েছে৷ আমার ভিতরটা কেঁদেই চলেছে৷”

আরেক বাসিন্দা গীতা রবিদাস বলেন, “আর আমরা দেখতে পারছি না৷ ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঘরে বসে থাকছি৷ মাঝেমধ্যেই ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসছি৷ গঙ্গা নতুন করে কোথায় কাটল, তা দেখতে যাচ্ছি৷ এই পরিস্থিতিতে ঘরের জিনিসপত্র নিয়ে অন্য কোথাও যে চলে যাব, তারও উপায় নেই৷ কোথাও আমাদের জায়গা-জমি নেই৷ এখানে প্রায় 500 বাড়ি রয়েছে৷ সবার একই দশা৷ ভাঙনের জন্য গ্রামের মন্দিরটার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে৷ তবে এখনও সেখানে পুজো হচ্ছে৷ গঙ্গা যদি আরও ভিতরে ঢুকে আসে তবে মন্দির নির্মাণের খরচ জলে যাবে৷ তাই কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে৷ বটগাছটা তো চলেই গিয়েছে৷”

সেচ দফতরের আশঙ্কা, মানিকচকের কামালতিপুর গ্রামে গঙ্গা পাড় কাটতে কাটতে অনেকটা ভিতরে ঢুকে এসেছে৷ সেখানে ইংরেজি U আকৃতির রূপ পেয়েছে নদী৷ সেখানে স্রোত ঢুকে পাড়ে ধাক্কা খেয়ে বিপরীতমুখী স্রোত সৃষ্টি করছে৷ এতেই তৈরি হচ্ছে ঘুর্ণি৷ এই ঘুর্ণিপাক যখন পাড়ে ধাক্কা মারছে, তখন ভাঙন শুরু হচ্ছে৷ এই ভাঙন শুধু খাসকোল নয়, চলে যেতে পারে কালিয়াচক 2 নম্বর ব্লকের মোথাবাড়ি পর্যন্ত৷

খাসকোল গ্রামের পঞ্চায়েত সদস্য রবি শেখ বলেন, “এই মুহূর্তে রবিদাস পাড়ায় নদী থেকে রিং বাঁধের দূরত্ব প্রায় 200 মিটার৷ এখনই ভাঙন রোধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এবারই বাঁধ ঠেকে যেতে পারে নদী৷ গোটা বিষয়টি আমি প্রশাসনকে জানিয়েছি৷ প্রশাসন থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, দ্রুত পদক্ষেপ করা হবে৷ আপাতত প্রশাসনের ভরসাতেই রয়েছে সবাই৷”

ভাঙনের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন জেলা সেচ দফতরের এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার শুভঙ্কর গুড়িয়া৷ তিনি অবশ্য সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কোনও কথা বলতে চাননি৷ তবে সেচ দফতরের এক কর্তা বলেন, “মানিকচকের কামালতিপুর থেকে ইংরেজবাজারের খাসকোল পর্যন্ত ভাঙন রোধের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে৷ গঙ্গার জলস্তর কমলে সমীক্ষার কাজ করা হবে৷ সেই রিপোর্ট রাজ্যে পাঠানো হবে৷ আমরা পরিস্থিতির উপর নজর রাখছি৷ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে৷”

এদিকে শুক্রবার থেকে গঙ্গার জলস্তর আবার বাড়তে শুরু করেছে৷ এদিন সকাল আটটায় নদীর জলস্তর ছিল 24.32 মিটার৷ বিপদসীমা 24.69 মিটার থেকে 37 সেন্টিমিটার নীচে৷ সেচ দফতরের অনুমান, আরও দু’একদিন জলস্তর বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে৷ তারপর থেকে জল নামতে শুরু করবে৷ তখন নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে৷

আরও পড়ুন -

  1. গঙ্গার ভাঙন এবার কালিয়াচক-3 ব্লকে, মাথায় বৃষ্টি নিয়ে শেষ সম্বল বাঁচাতে ব্যস্ত বিহারিটোলা
  2. 2 দশক পর ফিরল পুরনো আতঙ্ক, জমি-বাড়ি গিলছে গঙ্গা
  3. সামশেরগঞ্জে ফের গঙ্গা ভাঙন, নদীগর্ভে তলিয়ে গেল একাধিক বাড়ি