ETV Bharat / state

অন্ধকার সরিয়ে অযোধ্যার প্রত্যন্ত গ্রামে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছেন আদিবাসী গৃহবধূ মালতী

পুরুলিয়ার জিলিং সেরেন গ্রাম ৷ সেই গ্রামে অবৈতনিক পাঠশালা খুলেছেন আদিবাসী গৃহবধূ মালতী মুর্মু ৷

FREE COACHING CENTRE
অন্ধকার সরিয়ে অযোধ্যার প্রত্যন্ত গ্রামে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছেন আদিবাসী গৃহবধূ মালতী (নিজস্ব ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : July 12, 2025 at 6:59 PM IST

8 Min Read
Choose ETV Bharat

পুরুলিয়া, 12 জুলাই: ‘আমি জামবনির শিবু কুইরির বিটি সাঁঝলি’, দেবব্রত সিংহের লেখা সেই ‘তেজ’ কবিতাটি নিশ্চয় মনে আছে সবার । প্রত্যন্ত গ্রামের এক মেয়ের শিক্ষার জন্য লড়াইয়ের গল্প, 'তেজ' ফুটে উঠেছিল দেবব্রতবাবুর কবিতায় । এবার প্রত্যন্ত গ্রামে অশিক্ষার অন্ধকার দূর করে শিক্ষার আলো নিয়ে আসার কঠিন পণ বা বলা চলে সেই 'তেজ' দেখা গেল এক আদিবাসী গৃহবধূর মধ্যে ।

পাহাড়ে ঘেরা পুরুলিয়ার অযোধ্যায় জিলিং সেরেন গ্রামের গৃহবধূ মালতী মুর্মু গ্রামের শিশুদের শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসতে পাঁচ বছর ধরে চালিয়ে আসছেন একটি অবৈতনিক বিদ্যালয় । প্রচুর বাধার মুখে পড়েও, কষ্টসাধ্য করে এই স্কুল চালিয়ে আসছেন তিনি । আগামীতে মালতীর স্বপ্ন এই শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ুক গ্রাম থেকে গ্রামে । এগিয়ে আসছেন গ্রামবাসীরা । মালতী চাইছেন সরকার বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি এগিয়ে আসুক এই মহৎ কাজে ।

জিলিং সেরেন গ্রামের গৃহবধূ মালতী

পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠলেও এই অযোধ্যা পাহাড়ের বুকে ছোট ছোট এমন অনেক গ্রাম আছে, যেখানে আজও উন্নয়নের ছিঁটেফোঁটাও পৌঁছায়নি । তেমনিই একটি পিছিয়ে পড়া গ্রাম জিলিং সেরেন । এই গ্রামের নাম কখনোই বাংলার মানুষ সেভাবে শোনেননি । কিন্তু এই গ্রামের এক গৃহবধূর জন্য এই ছোট্ট প্রত্যন্ত গ্রামটি এখন শিরোনামে ।

অযোধ্যা পাহাড়ের হিলটপ থেকে প্রায় 25 কিমি দূরে এই জিলিং সেরেন গ্রাম । সেখানেই 2019 সালে মালতী মুর্মু গৃহবধূ হয়ে এসেছিলেন । আর এসেই অনুভব করেছিলেন গ্রামে শিক্ষার আলো এখনও সেই ভাবে পৌঁছায়নি । আর সেখান থেকেই জেদ বাড়ে মালতীর । নিজের বাড়িতেই শুরু করেন অবৈতনিক শিক্ষাকেন্দ্র ।

কোভিড কালে স্কুল ছুটদের শিক্ষায় ফেরাতে মালতীর লড়াই

জিলিং সেরেন গ্রামের অদূরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল । জঙ্গলের পথ দিয়ে হেঁটে সেই স্কুলে পড়তে যেত ছাত্রছাত্রীরা । বেশীরভাগই প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী । যদিও পরিবারগুলির এবং শিশুদের পাঠ নেওয়ার তেমন উৎসাহ ছিল না । অন্যদিকে 2020 সালে কোভিডের কারণে স্কুল বন্ধ হয়ে যায় । সেই সময় অনলাইন ক্লাস চালু হলেও আদিবাসী গরিব বাসিন্দাদের কাছে সেই 'অনলাইন শিক্ষা' শুধুই যেন প্রহসন ।

যাঁরা কাঠ কুড়িয়ে, দিনমজুরি করে দিন চালান, তাঁদের আবার স্মার্ট ফোন ৷ স্বভাবতই স্কুল বন্ধ হতেই শিশু, কিশোরদের পড়াশুনো বন্ধ হয়ে যায় । মালতী মুর্মু অনুভব করেন, এ এক কঠিন সময় । শিশুদের পড়ার অভ্যেস চলে গেলে আর তাদের স্কুলে ফেরানো যাবে না । নিজে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছিলেন মালতী মুর্মু । আর তাই শিক্ষা যে কত প্রয়োজনীয় তা অনুভব করেই এই প্রজন্মকে শিক্ষিত করতেই হবে, এমন জেদ চেপে বসে তাঁর মধ্যে । শুরু করেন নিজের বাড়িতেই পাঠকেন্দ্র ।

Free Coaching Centre
জিলিং সেরেন গ্রামের অবৈতনিক পাঠশালায় পড়াচ্ছেন মালতী মুর্মু৷ (নিজস্ব ছবি)

কঠিন ছিল গ্রামবাসী ও নিজের পরিবারকে বোঝানো

মালতী মুর্মু জানিয়েছেন, শুরুর দিকে সাড়া পাননি তেমন । গ্রামবাসীদের ধারণা ছিল, কী হবে পড়াশুনো করে । কিন্তু মালতী ছাড়ার পাত্রী ছিলেন না । বাড়ি বাড়ি গিয়ে গ্রামবাসীদের বোঝাতে শুরু করেন । অন্যদিকে নিজের পরিবারেও তেমন সম্মতি ছিল না । একই সঙ্গে দু’টি লড়াই চলতে থাকে । তবু নিজের জেদে নিজের বাড়িতেই পাড়ার কয়েকজন শিশুকে নিয়ে কার্যত জোর করেই পড়াতে শুরু করেন মালতী । মালতীর জেদ দেখে তাঁর স্বামী বাঙ্কা মুর্মুও এগিয়ে আসেন । গ্রামবাসীরাও বুঝতে পারেন । মালতী মুর্মুর পাঠকেন্দ্র বাড়তে থাকে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা । এখন সেই ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা 45 জন ।

ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে স্কুল

মালতীর পড়ানোর কৌশলে আদিবাসী গ্রামের শিশু কিশোররা উৎসাহিত হতে শুরু করে । ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে দেখে সচেতন গ্রামবাসীরা এগিয়ে আসেন । প্রথমে একটি কাঁচা ঝুপড়ি তৈরি হয় । পরে গ্রামবাসীদের সাহায্যেই গড়ে ওঠে মালতীর অবৈতনিক পাঠ কেন্দ্র । তবে বিরাট কিছু পরিকাঠামো নেই আজও । ছোট টালির ঘরে দু’টি ক্লাস রুম । একটা করে ব্ল্যাক বোর্ড । আজও বেঞ্চ নেই সেখানে । চট পেতে শিশু কিশোররা মালতীর কাছে পাঠ নেয় ।

Free Coaching Centre
জিলিং সেরেন গ্রামের অবৈতনিক পাঠশালায় পড়াচ্ছেন মালতী মুর্মু৷ (নিজস্ব ছবি)

মালতী মুর্মু বলেন, "এখন প্রথম শ্রেণী থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পাঠ দেওয়া হয় । প্রথম প্রথম শুধু আদিবাসী সাঁওতালি ভাষায় পড়াতাম । এখন ছাত্রছাত্রী বাংলা ও ইংরাজি ভাষায় পড়ানো হয় । স্কুলছুটরাও স্কুলে ফিরে গিয়েছে । এখন পাঠকেন্দ্রে তারা আসে অতিরিক্ত কোচিং নিতে ।’’

সিলেবাসের বাইরেও মালতী ছাত্রছাত্রীদের আরও নানা বিষয়ে শিক্ষা দেন । তাদের কুসংস্কার দূর করে বিজ্ঞান চেতনায় নিয়ে আসছেন । যেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসছেন শিশু কিশোরদের ।

এখন পাশে পেয়েছেন স্বামীকে

জিলিং সেরেন গ্রামের পুত্রবধূ মালতী মুর্মু। তাঁর দুই সন্তান। ছোট শিশুটি মাত্র দু’মাস বয়সের । অনেক সময় কোলে শিশুকে নিয়েই পাঠ দিতে হয় মালতীকে । মালতীর এই কঠিন জেদ দেখে এখন তাঁর স্বামী বাঙ্কা মুর্মুও তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন । স্ত্রীর এই উদ্যোগে এখন গর্বিত বাঙ্কা মুর্মু ।

বাঙ্কা মুর্মু বলেন, "এই জীবন কাহিনি বড় কঠিন । আমি 2020 সালে যখন মালতীকে বিয়ে করে গ্রামে নিয়ে আসি, তখন গ্রামে শিক্ষার বেহাল অবস্থা ছিল । শিক্ষা যদি না থাকে তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম এগিয়ে যাবে কী করে ? আমাদের এখান থেকে ঝালদা প্রায় 18 কিলোমিটার । বাঘমুন্ডি 25 কিলোমিটার । সেখানে হাইস্কুল আছে । অতদূরে গিয়ে ভালোভাবে শিক্ষা নেওয়া প্রায় অসম্ভব ।’’

Free Coaching Centre
জিলিং সেরেন গ্রামের অবৈতনিক পাঠশালায় পড়াচ্ছেন মালতী মুর্মু৷ (নিজস্ব ছবি)

তিনি আরও বলেন, ‘‘এখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও পড়াশুনো ভালো করে হয় না । মাস্টারমশাইরাও পালা করে আসেন । তাই পড়াশুনো হয় না । এছাড়াও লকডাউনে সেই স্কুলও বন্ধ হয়ে যায় । তাই আমার স্ত্রী স্কুল শুরু করে । গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় স্কুলের দেওয়াল গড়ে উঠেছে । আমিও যথাসাধ্য সহযোগিতা করছি ।"

বাঙ্কা মুর্মুর আক্ষেপ, "প্রথম প্রথম অনেক এনজিও এসেছিল সহযোগিতা করতে । কিন্তু তাঁরা হাত গুটিয়ে চলে গিয়েছে । সবাই মালতীকে সহযোগিতা করলে, সরকার এগিয়ে এলে মালতী আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারবে ।"

কী বলছেন মালতী মুর্মু নিজে

গোটা রাজ্যের কাছেই এখন অনুপ্রেরণার মুখ হয়ে উঠেছেন মালতী ৷ কিন্তু তাঁর এই লড়াই এত সহজ বা সাবলীল ছিল না । কীভাবে করতে পারলেন ? উত্তরে গ্রামের গৃহবধূ মালতীর মুখে ফুটে উঠল অনাবিল হাসি ।

মালতী মুর্মু বলেন, "আমি যখন এই গ্রামে এলাম দেখলাম শিশু-কিশোররা শিক্ষায় খুব কাঁচা । তখন 2020 সাল থেকে আমি বিনাপয়সায় শিক্ষাদান করা শুরু করি । প্রথমে নিজের বাড়িতে, পরে ঝুপড়ি করে পড়াতে শুরু করেছিলাম । পরে গ্রামবাসীদের কাছে সহযোগিতা চাই । তারাও সহযোগিতা করেন । তখনই এই পাঠকেন্দ্রটি গড়ে তুলি । আমি চাই আশপাশের গ্রামের ছাত্রছাত্রীরাও আসুক । এই শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ুক ।’’

কী বলছেন গ্রামবাসীরা ?

জিলিং সেরেন গ্রামে শিক্ষার আলো এনেছেন মালতী । প্রথম প্রথম গ্রামবাসীরা সচেতন না হলেও এখন তারা খুব খুশি । তাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরা পড়াশুনো করছে ।

গ্রামবাসী মিনতি সোরেন, সুনীতা মান্ডিরা বলেন, "গ্রামে একটা প্রাইমারি স্কুল আছে । সেটিও লকডাউনে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । আমাদের বাড়ির ছেলেমেয়েদের পড়াশুনোও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । তখনই মালতী এগিয়ে আসে । ও নিজে শিক্ষিতা । গ্রামের শিশু-কিশোরদের জন্য শিক্ষার হাল ধরেছে মালতী । আমরা সবাই ওর পাশে আছি ।"

পাশে থাকবেন সমাজসেবী ও শিক্ষাবিদরা

মালতি মুর্মুর স্বামী বাঙ্কা মুর্মু যতই আক্ষেপ করুন যে সমাজসেবীরা তাদের পাশে নেই ৷ কিন্তু মালতীর স্কুলের কথা জানতে পেরে শনিবারই অযোধ্যার জিলিং সেরেন গ্রামে গিয়ে মালতীর পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আসানসোলের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী চন্দ্রশেখর কুণ্ডু ।

অযোধ্যা থেকে চন্দ্রশেখর কুণ্ডু ইটিভি ভারতকে বলেন, "অযোধ্যা পাহাড়ের বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামে আমার 'বইটই-হইচই' স্কুল চলে । শুধু অযোধ্যা নয়, অযোধ্যার পাশাপাশি আসানসোলে, জয়চণ্ডী এবং অন্যান্য প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এই স্কুল বা পাঠকেন্দ্র চলে আসছে । মালতী মুর্মু নিজে চেয়েছিলেন আমি তাঁর পাশে থাকি । সেই মতো আমি মালতি মুর্মুর সঙ্গে দেখা করেছি । বর্তমানে শিক্ষা অন্য গতিতে চলছে ।’’

এখন স্মার্ট ক্লাসরুম গড়ে উঠছে । গ্রামের ছেলেমেয়েরা সেই শিক্ষা পাবে না কেন ? তাই মালতি মুর্মু সাধারণ যে পাঠকেন্দ্র চালাচ্ছেন, তার পাশাপাশি তাঁর পাঠকেন্দ্রকে আরও কী করে উন্নত করা যায় এবং গ্রামের ছেলে মেয়েদের সেই স্মার্ট শিক্ষা কীভাবে দেওয়া যায় সেই চেষ্টাই আমি করব ।’’

আরও পড়ুন -

  1. গেরুয়া বসন সন্ন্যাসীর গলায় স্টেথোস্কোপ, পুরুলিয়াবাসীর ভরসা 'ডাক্তার মহারাজ' ! ডিগ্রি জানেন ?
  2. বিনা পয়সার পাঠশালা, শিক্ষার আলো জ্বলছে গাইঘাটায়
  3. পেটের জ্বালায় সরকার পোষিত স্কুল কার্যত শিশু শ্রমিকের উৎপাদনস্থল! ভয়াবহ ছবি মালদা শহরে