ETV Bharat / state

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিপাকে উত্তরের পর্যটন, ক্ষতি প্রায় কয়েকশো কোটি

কোথাও তছনছ হয়ে গিয়েছে পর্যটনস্থল-হোটেল-রিসর্ট৷ কোথাও জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে সেতু, ভেঙে গিয়েছে বাঁধ৷ নতুন করে পরিকাঠামো তৈরি ছাড়া উপায় নেই৷

NORTH BENGAL FLOODS
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত উত্তরবঙ্গ (নিজস্ব ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : October 10, 2025 at 4:09 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

জলপাইগুড়ি, 9 অক্টোবর: উৎসবের মরশুমে পর্যটকদের কোলাহলে মুখর হয়ে থাকে পাহাড় থেকে ডুয়ার্স৷ এবারও শুরুটা সেভাবেই হয়েছিল৷ কিন্তু তাল কাটল ভয়াবহ বন্যা৷ যার জেরে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উত্তরবঙ্গের পর্যটন শিল্প৷

অনেক পর্যটক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে পড়ে মাঝপথে ফিরে এসেছেন৷ অনেকে আবার বুকিং বাতিল করেছেন৷ কিন্তু সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পর্যটন স্থল থেকে হোটেল-রির্সট-হোম স্টেগুলির অবস্থা৷ বন্যার জলের তোড়ে সেগুলি একেবারে প্রায় তছনছ হয়ে গিয়েছে৷ ক্ষতির পরিমাণ 500 থেকে 600 কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলেই আশঙ্কা করছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা৷

NORTH BENGAL FLOODS
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত উত্তরবঙ্গ (নিজস্ব ছবি)

এই পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজছেন পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সকলে৷ নতুন করে পরিকাঠামো তৈরি ও প্রশাসনিক সহযোগিতাই উত্তরের পর্যটন শিল্পের ‘পুনর্জন্ম’-এর একমাত্র উপায় বলেই মনে করছেন পর্যটন ব্য়বসায়ীরা৷

বৃষ্টি, ধস ও বন্যার জেরে গত শনিবার রাত থেকে পাহাড় ও ডুয়ার্সের পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হয়ে রয়েছে৷ দার্জিলিং জেলার মিরিক, বিজনবাড়ি, দুধিয়া, শুখিয়াপোকরি এবং জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার জেলার শিশামারা-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে৷ ভুটান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি নদীর বাঁধ ভেঙে বিপর্যস্ত জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান কেন্দ্রিক শিশামারা পর্যটন কেন্দ্র। পাহাড়ি নদীর বালি পাথরে চাপা পড়ে গিয়েছে। অনেক হোটেল, রিসর্ট, হোম স্টে বন্যার জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে। কোথাও কোথাও ভেঙেও গিয়েছে৷

NORTH BENGAL FLOODS
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত উত্তরবঙ্গ (নিজস্ব ছবি)

বিশেষ করে শিশামারায় নদীর তীরবর্তী এলাকায় যে রিসর্টগুলি ছিল, সেগুলি বাঁধ ভেঙে আসা জলের তোড়ে একেবারে তছনছ হয়ে গিয়েছে৷ ফলে সেগুলি সম্পূর্ণ ভেঙে নতুন করে তৈরি করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই৷ পর্যটন ব্যবসায়ী মিঠুন সরকার বলেন, ‘‘শিশামারা আজকের দিনে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। কিন্তু বন্যার ফলে আমাদের পর্যটন স্থলের বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। আমাদের শিশামারা অত্যন্ত আকর্ষণীয় ট্রি হাউজ বন্যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একদিনের বন্যায় শিশামারা নদীর ভাঙন এমন ভাবে এগিয়ে এসেছে যে রিসর্ট ভেঙে ফেলতে হচ্ছে। রিসর্টগুলি বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে চলে এসেছে।’’

মিঠুন সরকার জানালেন, বন্যার দিন রিসর্টে 40 জন পর্যটক ছিলেন। স্থানীয় প্রশাসন, বিধায়ক, স্থানীয় বাসিন্দা, সবাই মিলে পর্যটকদের উদ্ধার করে নিয়ে যায়। তাই পর্যটকদের সুরক্ষাই তাঁদের কাছে প্রধান কর্তব্য৷ সেই কারণে প্রায় 300 বুকিং বাতিল করে দেওয়া হয়েছে৷ অনেকে এই পরিস্থিতির মধ্যেও আসতে চাইছেন৷ কিন্তু তাঁদেরও অনুরোধ করে বুকিং বাতিল করা হয়েছে৷

NORTH BENGAL FLOODS
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত উত্তরবঙ্গ (নিজস্ব ছবি)

তবে ক্ষতি শুধু হোটেল-রিসর্ট বা হোম স্টে-র হয়নি৷ ক্ষতি হয়েছে সাধারণ পরিকাঠামোরও৷ দার্জিলিং ও সিকিমের একাধিক রাস্তাঘাট বিপন্ন। একাধিক সেতু জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে। জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের হলং বাংলো যাওয়ার রাস্তায় কাঠের সেতু জলের তোড়ে উড়ে গিয়েছে। পাশাপাশি অনেক জায়গায় বাঁধ ভেঙেছে৷ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে৷ সেগুলি দ্রুত মেরামত করা প্রয়োজন বলেই মনে করেন মিঠুন সরকার৷

NORTH BENGAL FLOODS
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত উত্তরবঙ্গ (নিজস্ব ছবি)

শিশামারার পর্যটন ব্যবসায়ী চন্দন ঘোষ বলেন, ‘‘এখানকার পরিস্থিতি খুব খারাপ। বাঁধ খুব তাড়াতাড়ি বানানো প্রয়োজন। রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে গিয়েছে। শিশামারার এই বাঁধটা না-হলে আশপাশে সব গ্রামের মানুষ অনিশ্চয়তা অবস্থার মধ্যে আছে। ভুটান থেকে জল ছাড়া হলে এই গ্রামটা আর থাকবে না। গ্রাম বাঁচলে, আমরা বাঁচব। গ্রাম বাঁচলে, পর্যটন বাঁচবে।’’

NORTH BENGAL FLOODS
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত উত্তরবঙ্গ (নিজস্ব ছবি)

বিশেষ করে ধাক্কা খেল গ্রামের অর্থনীতিও৷ পর্যটন ব্যবসায়ী মিঠুন সরকারের বক্তব্য, ‘‘পর্যটনকে কেন্দ্র করে যাদের রুটিরুজি সেই কয়েকটা গ্রামের অর্থনীতি মার খেল। পর্যটনকে কেন্দ্র করে শিশামারার প্রচুর টোটো চালক, দোকান, রিসর্টের কর্মীরা আজ কর্মহীন হয়ে পড়লেন। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, সেই দিকে আমরা তাকিয়ে আছি।’’

NORTH BENGAL FLOODS
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত উত্তরবঙ্গ (নিজস্ব ছবি)

তিনি আরও বলেন, ‘‘জুন মাস থেকে জঙ্গল বন্ধ ছিল। জঙ্গল খোলার পর পর্যটকরা পুজোর আগে থেকে আসা শুরু করেছিলেন। এখন সব বুকিং বাতিল করতে হচ্ছে। পর্যটকরা আসতে ভয় পাচ্ছেন। পর্যটকদের ওপরই এলাকার মানুষের অর্থনীতি নির্ভর করে। ফলে বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল।’’

NORTH BENGAL FLOODS
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত উত্তরবঙ্গ (নিজস্ব ছবি)

আলিপুরদুয়ারের বিধায়ক সুমন কাঞ্জিলাল বলেন, ‘‘বন্যার ফলে আমাদের আলিপুরদুয়ারের পর্যটনের ক্ষেত্রে বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। ভুটানের নদীর তাণ্ডবলীলা চলেছে। হাজার হাজার কাঠের গুঁড়ি ভুটান থেকে নেমে আসায় বাঁধ তছনছ হয়ে গিয়েছে। কীভাবে নদীকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, এই প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ, গ্রাম যদি নদীর গ্রাসে চলে যায়৷ তাহলে কোথায় যাবে গ্রামের মানুষ, কোথায় থাকবে পর্যটন।’’

NORTH BENGAL FLOODS
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত উত্তরবঙ্গ (নিজস্ব ছবি)

রাজ্য সরকারের পর্যটন বিভাগের ইকোট্যুরিজম কমিটির চেয়ারম্যান রাজ বসু বলেন, ‘‘এই বন্যায় পাহাড় ও সমতলে বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও সঠিক বলা যাবে না। তবে কয়েকশো কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। ক্ষয়ক্ষতির হিসেবে করার চেষ্টা চলছে। রাজ্য সরকারের সঙ্গে কথা হয়েছে। কীভাবে পর্যটনস্থলগুলোকে আগের মতো স্বাভাবিক করা যায়, সেই বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে। আগে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলোকে ঠিক করতে হবে। কারণ, গ্রামের মানুষও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত।’’

NORTH BENGAL FLOODS
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত উত্তরবঙ্গ (নিজস্ব ছবি)

তিনি আরও বলেন, ‘‘গ্রামের মানুষগুলোকে কীভাবে স্বাভাবিক জীবন দেওয়া যায়, সেই চেষ্টা করছি। সরকারের সঙ্গে কথা বলে যাতে তাদের স্কুল, রাস্তাঘাট, সবরকমের সাহায্য দেওয়া যায়, সেটার কথা বলা হয়েছে৷ কারণ, গ্রাম বাঁচলে পর্যটন বাঁচবে। গ্রামের মানুষের দুঃখে থাকলে কখনোই পর্যটন ভালো হবে না। শিশামারা বাঁধটি বালির বস্তা দিয়ে মেরামত করা হচ্ছে। নদীর জল না-কমলে কাজটাও করা যাচ্ছে না।’’

NORTH BENGAL FLOODS
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত উত্তরবঙ্গ (নিজস্ব ছবি)

ডুয়ার্স ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ফোরামের সম্পাদক দিব্যেন্দু দেব বলেন, ‘‘বন্যার ফলে অনেক বুকিং বাতিল হয়েছে। আমরা পর্যটকদের আশ্বস্ত করছি, পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। সব আপনারা খোঁজ নিয়ে নিশ্চিন্তে ডুয়ার্সে আসতে পারেন। বন্যার ফলে বুকিং বাতিল, পাহাড়ি নদীর হড়পা বন্যার ফলে প্রচুর রিসর্ট, হোম স্টে-র ক্ষতি হয়েছে। পাহাড়-সমতল মিলে এই মুহূর্তে কয়েকশো কোটি টাকা ক্ষতি হয়ে গেল। প্রপার্টি ধ্বংস হয়ে যাওয়াটা একজন পর্যটন ব্যবসায়ীর কাছে অপূরণীয় ক্ষতি। এর সঙ্গে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত।’’

NORTH BENGAL FLOODS
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত উত্তরবঙ্গ (নিজস্ব ছবি)

কালিম্পং জেলার পর্যটন ব্যবসায়ী স্বরূপ মিত্র বলেন, ‘‘আমাদের প্রচুর বুকিং বাতিল হচ্ছে। আবার কেউ কেউ ডিসেম্বর মাসে রিসিডউল করছেন। আমাদের বিরাট ক্ষতি হল।’’

আরও পড়ুন -

  1. বন্যা পরিস্থিতি সামলে ছন্দে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান, শুরু জিপসি সাফারি
  2. ফের ধস পাহাড়ের রাস্তায়, বন্ধ হয়ে গেল সিকিম যাওয়ার 10 নম্বর জাতীয় সড়ক
  3. বিপর্যস্ত পাহাড়ে সরকারি সম্পত্তির ক্ষতির পরিমাণ 10 কোটির বেশি