হুইল চেয়ার রাগবির স্কিলে ভর করে ফুড ডেলিভারি, আত্মনির্ভর শুভাশিসই এখন অনুপ্রেরণা
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে হারিয়েছেন চলাফেরার ক্ষমতা ৷ দমিয়ে দিতে পারেনি প্রতিবন্ধকতা ৷ লড়াই করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন বাঁকুড়ার শুভাশিস মণ্ডল ৷

Published : August 1, 2025 at 9:28 PM IST
কলকাতা, 1 অগস্ট: রাগবি খেলার প্রতি ঝোঁক ছিল ছোটবেলা থেকেই ৷ তবে, সুযোগ-সুবিধা ও সর্বোপরি দারিদ্রতার কারণে কোনোদিনই রাগবি খেলার সুযোগ হয়ে ওঠেনি ৷ তার জন্য কোনও আক্ষেপ ছিল না বাঁকুড়ার গঙ্গাজলঘাঁটির বাসিন্দা শুভাশিস মণ্ডলের ৷ কিন্তু, 2018 সালে তাঁর জীবনে এক বিপর্যয় নেমে আসে ৷ জেনারেটর থেকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে চলাফেরার ক্ষমতা হারান তিনি ৷ তখন থেকেই হুইল চেয়ার হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের সঙ্গী ৷
কিন্তু, থেমে থাকার পাত্র নন শুভাশিস ৷ হুইল চেয়ারের সঙ্গে জুড়ে দেন ভালো লাগার খেলা রাগবিকে ৷ অদম্য জেদ ও কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে বর্তমানে তিনি জাতীয়স্তরে বাংলার হুইল চেয়ার রাগবি দলের খেলোয়াড় ৷ আর সেই রাগবির স্কিল ও খেলোয়াড়ি মনোভাবকে পাথেয় করে বর্তমানে একটি ফুড ডেলিভারি সংস্থার হয়ে কাজও করছেন শুভাশিস মণ্ডল ৷
28 বছরের শুভাশিস মণ্ডলের এই লড়াইয়ের কাহিনি শুনতে বেহালায় হাজির হয়েছিল ইটিভি ভারত ৷ বর্তমানে সেখানকার একটি বহুতলের নিচতলায় ঘরভাড়া নিয়ে থাকেন তিনি ৷ সঙ্গে বাবা-মা’কেও রেখেছেন ৷ হুইল চেয়ারে করে বাড়ি-বাড়ি খাবার পৌঁছে দেন ৷ আর যে অর্থ উপার্জন হয়, তাই দিয়েই তিনজনের সংসার চালাচ্ছেন হুইল চেয়ার রাগবির ন্যাশনালস খেলা শুভাশিস ৷
তাঁর এই লড়াইয়ে পাশে রয়েছেন গঙ্গাজলঘাঁটির বন্ধুরা ৷ তবে, বন্ধুরা পাশে থাকলেও, তাঁদের উপর নির্ভরশীল হতে চাননি ৷ তাই আত্মনির্ভর হতেই ফুড ডেলিভারির কাজ করছেন ৷ তার জন্য বন্ধুরাই নানাভাবে অর্থ সাহায্য করে বোল্ড নিও ফ্লাই নামে এক বিশেষ ধরনের হুইল চেয়ার কিনে দিয়েছেন ৷ তাতে করেই খাবার ডেলিভারি করেন তিনি ৷

শুভাশিস মণ্ডলের পরিবারে রয়েছেন তাঁর বাবা এবং মা ৷ তাঁর বাবা পেশায় রাজমিস্ত্রি ছিলেন ৷ বর্তমানে তিনিও একটি দুর্ঘটনার পর থেকে সেই কাজ ছেড়ে দিয়েছেন ৷ তবে, তারও অনেক আগেই দারিদ্রের সংসারে সাহায্য় করতে উচ্চমাধ্যমিকের পরেই পড়াশোনা ছেড়ে কাজে যোগ দিয়েছিলেন শুভাশিস ৷ সালটা 2018, জেনারেটর মেকানিক হিসেবে কাজ শুরু করেন ৷
কিন্তু, একদিন কাজ করতে-করতে জেনারেটর থেকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন শুভাশিস ৷ সেই ঝটকা এতটাই ছিল যে, পুরো শরীর কুঁকড়ে গিয়েছিল ৷ স্থানীয় বিষ্ণুপুর হাসপাতালে নিয়ে গেলেও, সেখানকার চিকিৎসকরা তাঁকে ফিরিয়ে দেন ৷ সেখান থেকে দুর্গাপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় শুভাশিসকে ৷ সেখানেই অস্ত্রোপচার হয় তাঁর ৷ চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, কয়েকদিনের মধ্যেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবেন তিনি ৷

কিন্তু, কয়েকমাস পরে শুভাশিসের জীবনে নেমে আসে আরও বড় অন্ধকার ৷ তিনি জানতে পারেন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার জেরে চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়েছেন ৷ তাঁর শিঁরদাড়ায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে ৷ দুর্গাপুরের ওই হাসপাতালে জানিয়ে দেয়, তাদের পক্ষে শুভাশিসকে সুস্থ করা সম্ভব নয় ৷ ঠিক হয় দক্ষিণ ভারতের একটি নামী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ৷ কিন্তু, আর্থিক কারণে তা সম্ভব হয় না ৷ এভাবে প্রায় তিনবছর হুইল চেয়ারকে আশ্রয় করে জীবন চলতে থাকে তাঁর ৷
এই সময়ে শরীরচর্চার উপর জোর দেন শুভাশিস ৷ নিজেকে মানসিকভাবে দৃঢ় করে তুলতে কসরত শুরু করেন ৷ এমনকি হুইল চেয়ার নিয়ে চলাফেরা করতেন ৷ প্রথমে পাঁচ, তারপর দশ, এভাবে দিনে 25 কিলোমিটার পথ হুইল চেয়ার নিয়ে যাতায়াত করতেন ৷ এই সময়ে তিনি পাশে পেয়েছিলেন গঙ্গাজলঘাঁটির বন্ধুদের ৷

এরপর 2021 সাল নাগাদ দক্ষিণ ভারতের ওই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যান শুভাশিস ৷ সেখানকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা শুভাশিসের শারীরিক পরীক্ষা করে জানান, মাত্র 5 শতাংশ সুযোগ রয়েছে তাঁর সুস্থ হওয়ার ৷ আর তার অধিকাংশটাই নির্ভর করছে তাঁর ইচ্ছাশক্তি এবং খেলাধুলোর কারণে ৷ এরপর রাজ্যে ফিরে আসেন তিনি ৷ এই সময়ে শুভাশিস চিকিৎসকদের পরামর্শ মতো কাউন্সেলিংয়ে ভর্তি হন ৷
সেই কাউন্সেলিং চলাকালীন শুভাশিসের সামনে খুলে যায় এক নতুন জগৎ ৷ তাঁর রাগবি খেলার প্রতি ভালোবাসার কথা বন্ধুরা জানতেন ৷ তেমনই এক বন্ধুর মাধ্যমেই হুইল চেয়ার রাগবির খোঁজ পান শুভাশিস মণ্ডল ৷ তাঁকে যোগাযোগ করিয়ে দেন ৷ সেই সূত্র ধরেই ভারতীয় হুইল চেয়ার রাগবি ফেডারেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন শুভাশিস ৷ পশ্চিমবঙ্গের হয়ে রাগবি খেলার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি ৷

তবে, চাইলেই তো আর খেলা যায় না ৷ এর জন্য শারীরিকভাবে শক্তিশারী হতে হয় ৷ সেই পরীক্ষাও দিতে হয় তাঁকে ৷ নিয়মিত শরীরচর্চার মধ্যে থাকা শুভাশিস তাই ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলা দলের হয়ে সুযোগ পান ৷ উল্লেখ্য, সরাসরি ভারতীয় হুইল চেয়ার রাগবি ফেডারেশনের মাধ্যমে বাংলা দল হুইল চেয়ার রাগবির ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেয় ৷ গতবছর অর্থাৎ, 2024 সালে বাংলার হয়ে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন তিনি ৷ পাশাপাশি, কলকাতায় আয়োজিত ম্যারাথনেও অংশ নেন ৷ সেখানেও প্রথম হয়েছেন শুভাশিস ৷
কিন্তু, এর মধ্যেই শুভাশিসের জীবনে আরেকটি ধাক্কা লাগে ৷ রাজমিস্ত্রির কাজ করতে গিয়ে আহত হন শুভাশিসের বাবা ৷ সংসারে উপার্জন প্রায় বন্ধ হয়ে যায় ৷ এই পরিস্থিতিতে বন্ধুরাই তাঁর সহায় হন আবার ৷ কিন্তু, বন্ধু বা তৃতীয় ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল হওয়া মানতে পারেননি তিনি ৷ ছয় মাস আগে কলকাতা এসে একটি নামী ফুড ডেলিভারি সংস্থায় কাজ নেন ৷ বাড়ি-বাড়ি খাবার ডেলিভারি শুরু করেন ৷

কিন্তু, একজন বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তির পক্ষে এই কাজ সহজ ছিল না ৷ তবে, এখানেই তাঁর সহায় হয় খেলোয়াড়ি মনোভাব এবং হুইল চেয়ার রাগবি খেলার স্কিল ৷ হুইল চেয়ার রাগবিতে দ্রুত গতিতে চলাচল করতে হয় ৷ সেই স্কিলকে কাজে লাগিয়ে দ্রুততার সঙ্গে খাবার ডেলিভারি করছেন হুইল চেয়ারে করে ৷ তবে, বর্তমানে তাঁর খাবার ডেলিভারির সঙ্গী বোল্ড নিও ফ্লাই হুইল চেয়ার ৷ যার দাম প্রায় এক লাখ টাকা ৷ বন্ধুদের সহযোগিতায় মোটর লাগানো তিন চাকার এই হুইল চেয়ার কাম গাড়িতে করে খাবার পৌঁছে দেন তিনি ৷
আর এতে যা উপার্জন হয় তাতে, বাড়িভাড়া, বাবা-মায়ের দেখাশোনা-সহ সব খরচ চালাচ্ছেন শুভাশিস ৷ তবে, হুইল চেয়ার রাগবি খেলা ছাড়েননি ৷ সেই খেলা চালিয়ে যেতে চান ৷ তার জন্য আরও আধুনিক মানের স্বয়ংক্রিয় হুইল চেয়ার দরকার ৷ হুইল চেয়ার রাগবি খেলায়, যা খেলোয়াড়দের মুভমেন্টে সাহায্য করে ৷ তবে, এর মূল্য প্রচুর ৷ একলাখের উপর ৷ সেই অর্থ জোগাড় করাই এখন নয়া চ্যালেঞ্জ শুভাশিস মণ্ডলের ৷

