বর্ধমানের রাজাকে অমাবস্যায় পূর্ণিমার চাঁদ দর্শন করান দুর্লভা কালীর সাধক গোকূলানন্দ ব্রহ্মচারী
প্রাচীন প্রথা মেনে দেবীর পুজোর পর ভোগ দেওয়া হয় শিয়ালকে ৷ ডাকাত কালী নামেও পরিচিত বর্ধমানের দুর্লভা কালী ৷

Published : October 13, 2025 at 7:04 AM IST
বর্ধমান, 13 অক্টোবর: সাড়ে তিনশো বছরের বেশি সময় আগে তৎকালীন বর্ধমান রাজ্যের লাকুর্ডির জঙ্গলে তপস্যা শুরু করেছিলেন গোকূলানন্দ ব্রহ্মচারী নামে এক সাধক ৷ কথিত আছে, সেই সময় তিনি কালী মায়ের স্বপ্নাদেশ পান ৷ যেখানে দেবী তাঁকে নির্দেশ দেন, পাশের পুুকুরে একটি পাথরে তাঁর বাস এবং সেই পাথরটি জল থেকে তুলে তাকে প্রতিষ্ঠা করতে ৷ সেই মতো তালপাতার ছাউনি তৈরি করে সেই শিলাকে তুলে এনে কালী রূপে পুজো শুরু করেছিলেন সাধক গোকূলানন্দ ব্রহ্মচারী ৷
এই শিলা রূপী কালী, দেবী দুর্লভা কালী নামে পরিচিত ৷ বলা হয় সাধক গোকূলানন্দ ব্রহ্মচারী অনেক তপস্যা ও সাধনার পর দেবীর দর্শন পেয়েছিলেন ৷ তাই লাকুর্ডির প্রাচীন এই মন্দিরে দেবী দুর্লভা কালী রূপে পূজিতা হন ৷ শিলারূপী দুর্লভা কালীর আরাধনার পাশাপাশি, বর্তমানে একটি কালী মূর্তির পুজো করা হয় এই মন্দিরে ৷ লাকুর্ডির জঙ্গলে দেবী দুর্লভার মন্দির প্রতিষ্ঠা হওয়ার পিছনেও রয়েছে এক কাহিনি ৷
বলা হয়, বর্ধমানের রাজা তেজচাঁদ খবর পান লাকুর্ডির জঙ্গলে এক সাধক একটি তালপাতার ছাউনিতে শিলা রূপী দেবী কালীর পুজো করছেন ৷ সেই খবর পেয়ে, রাজা এক অমাবস্যায় দিনের বেলা সেখানে যান ৷ সেই সময় সাধক নেশায় ডুবে ছিলেন ৷ রাজা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি জঙ্গলে কেন সেই শিলা মূর্তির পুজো করছেন ৷ তখন রাজাকে তিনি সমস্তটা বলেন ৷ সেই শুনে রাজা সাধকের কাছে সেদিনের তিথি জানতে চেয়েছিলেন ৷ নেশার ঘোরে সাধক বলে বসেন, পূর্ণিমা তিথি ৷ তা শুনে অবাক হন রাজা ৷ তিনি সাধক গোকূলানন্দ ব্রহ্মচারীকে বলেন, রাতে তিনি জঙ্গলে আসবেন ৷ সেই সময় তাঁকে পূর্ণিমার চাঁদ দেখাতে হবে ৷ সাধক রাজিও হয়ে যান ৷

এরপর নেশা কাটতেই সাধক বুঝতে পারেন ভুল করে তিনি অমাবস্যার বদলে রাজাকে পূর্ণিমা তিথি বলেছেন ৷ কিন্তু, রাতে রাজাকে চাঁদ কীভাবে দেখাবেন তিনি ? সেই সময় দেবীর দুর্লভার সামনে প্রার্থনা শুরু করেন সাধক গোকূলানন্দ ব্রহ্মচারী ৷ এরপর রাতে রাজা তেজচাঁদ জঙ্গলে এলে সেই অমাবস্যায় পূর্ণিমার চাঁদ দেখিয়েছিলেন সাধক ৷ সেই অলৌকিক দৃশ্য দেখে মোহিত হয়ে পড়েন রাজা ৷ তিনি মনস্থির করেন, মন্দিরের জন্য জমিদান করবেন ৷ সেই মতো লাকুর্ডির জঙ্গল-সহ বিস্তীর্ণ এলাকা ওই মন্দিরের জন্য দান করেন তিনি ৷
তালপাতার ছাউনির বদলে, সেখানে তৈরি হয় দেবী দুর্লভা কালীর স্থায়ী মন্দির ৷ যার পুজোর দায়িত্বে ছিলেন সাধক গোকূলানন্দ ব্রহ্মচারী ৷ সেই সময় থেকে দেবী দুর্লভা কালীর তন্ত্র মতে পুজো হয়ে আসছে ৷ একসময় নিয়মিত পাঁঠা বলি দেওয়া হতো সেখানে ৷ আর দেবীকে কাহন ও শোল মাছ পোড়া দিয়ে ভোগ দেওয়া হয় প্রতি অমাবস্যায় ৷ কালীপুজোর দিনেও তিনবার দেবীকে কাহন ও শোল মাছ পোড়া দিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয় ৷

দুর্লভা কালীপুজোর একটি পুরনো রীতি আজও পালন করা হয় ৷ বর্ধমান শহর লাগোয়া লাকুর্ডির জঙ্গলে আগের মতো এখনও অনেক শিয়াল আছে ৷ প্রথা অনুযায়ী, সকালে ও রাতে ভোগের রান্না থেকে কিছুটা অন্ন দেবীকে নিবেদনের আগে তুলে রাখা হয় ৷ সেই তুলে রাখা অন্ন পুজোর পর মন্দিরের পিছনের জঙ্গলে গিয়ে রেখে আসা হয় একটি পাত্রে ৷ কথিত অনুযায়ী, সেই অন্ন শিয়াল এসে খেয়ে যায় ৷
দুর্লভা কালী 'ডাকাত কালী' নামেও প্রসিদ্ধ ৷ বলা হয়, সেই সময় লাকুর্ডির জঙ্গলের ডাকাতরা এই কালীমন্দিরে এসে পুজো দিত ডাকাতির আগে ৷ আবার ডাকাতি করে এসে এখানেই লুঠ করা জিনিসপত্র ভাগ করত ডাকাতরা ৷ এমন আজও বর্ধমান শহরে ডাকাতির আগে দুষ্কৃতীরা এই মন্দিরে এসে পুজো দিয়ে যায় বলে দাবি স্থানীয়দের ৷

এ নিয়ে মন্দিরের পুরোহিত সুকুমার ভট্টাচার্য বলেন, "সাধক গোকূলানন্দ ব্রহ্মচারী অনেক কষ্টের পর দেবীর দর্শন পেয়েছিলেন ৷ তাই এখানে দেবীর নাম হয়েছে দুর্লভা ৷ অর্থাৎ, তাঁকে লাভ করতে হলে কষ্ট করতে হয় ৷ সাধক গোকূলানন্দ ব্রহ্মচারী বর্ধমানের রাজাকে এক অমাবস্যার রাতে পূর্ণিমার চাঁদ দেখিয়েছিলেন ৷ সেই আশ্চর্য দৃশ্য দেখে রাজা মোহিত হয়ে পড়েন ৷ তিনি তারপর মন্দিরের জন্য প্রচুর জমিদান করেন ৷ পুরনো রীতি মেনে আজও আমরা দেবীকে নিবেদনের আগে, রান্না হওয়া ভোগ শিয়ালের জন্য তুলে রাখি দু’বেলা ৷ পুজোর শেষে মন্দিরের পিছনের জঙ্গলে সেই ভোগ শিয়ালকে দেওয়া হয় ৷"

