অপঘাতে মৃত 108টি নরমুণ্ডে কালীপুজো, নেপথ্যে হাড়হিম করা কাহিনি
108টি নরমুণ্ডে অধিষ্ঠিত মা করুণাময়ী ৷ শ্যামাকালী পুজোর দিন ভিড়ে ঠাসা থাকে মন্দির ৷ শুভজিৎ দাস ইটিভি ভারতে তুলে ধরলেন পুজোর নেপথ্যের গল্প-কাহিনি ৷

Published : October 13, 2025 at 5:44 PM IST
মন্দিরবাজার, 13 অক্টোবর: আদিগঙ্গার পাড়ে ক'য়েকশো বছরের প্রাচীন মন্দিরবাজার দক্ষিণের বিষ্ণুপুর শ্মশান। এই শ্মশানেই আগে ভিড় জমাতেন তান্ত্রিক ও সাধকরা। শবসাধনায় বসতেন অনেকেই। এখনও শ্মশানে ঢুকলে গা-ছমছমে পরিবেশ ৷ স্থানীয়দের বিশ্বাস, তান্ত্রিকদের সাধনার জোরে আজও রাতের অন্ধকারে জেগে ওঠে শ্মশান। ঘোরাফেরা করে 'অপঘাতে মৃতদের আত্মা'। ইটিভি ভারত তুলে ধরল 108টি নরমুণ্ডে অধিষ্ঠিত মা করুণাময়ীর পুজোর ইতিহাস ৷
প্রায় 300 বছর আগের কথা। প্রাচীন মন্দিরবাজারের দক্ষিণ বিষ্ণুপুর শ্মশান লাগোয়া জঙ্গলে তান্ত্রিক মণিলাল চক্রবর্তী শুরু করেন কালীপুজো। স্বপ্নাদেশ পেয়ে টালির চালের মন্দির বানিয়ে দেবীর আরাধনা শুরু করেছিলেন তিনি।
যদিও তখন বছরে একবারই পুজো হত। পরে স্বপ্নে মা কালী নিত্যপুজোর ইচ্ছেপ্রকাশ করলে পাকাপাকিভাবে মায়ের মন্দির গড়ে তোলা হয়। তখন 108টি নরমুণ্ড উৎসর্গ করে এই মন্দির বানানো হয়, সামনে ছিল পঞ্চমুণ্ডির আসন।
ডাকিনী-যোগিনীর উদ্দেশে ভোগ নিবেদন
এখনও মন্দিরে ঢুকলে দেবীর পিছনে দেখা যায় 108টি নরমুণ্ড। তারপর থেকেই পূজিত হয়ে আসছেন করুণাময়ী কালী। এখন 108টি জবাফুল নিবেদন করা হয় করুণাময়ী কালীকে। কালীপুজোর দিন আজও হাজারে হাজারে মানুষ আসেন এই মূর্তি দর্শন করতে। তন্ত্র মতে পুজো হয় এখানে। এক সময় নরমুণ্ড উৎসর্গ করা হলেও আজ বলিপ্রথা নিষিদ্ধ এই পুজোয়। কালীপুজোর দিন কাঁচা মাংস, ছোলা, মদ নিবেদন করা হয় ডাকিনী-যোগিনীকে। দেবীর বাহন শিয়ালের উদ্দেশেও ভোগ দেওয়া হয়।

কালো মাটির বাঁকে-বাঁকে জীবন্ত ইতিহাস
তবে স্থানীয়দের বিশ্বাস, কালীপুজোর রাতে আজও শ্মশান জাগানোর খেলায় মেতে ওঠেন সেবায়েতরা। আজ থেকে শত শত বছর আগে এই শ্মশানে চলত শবসাধনা। এমনকী নরমুণ্ড নিবেদন করে দেবীর উপাসনার কথাও শোনা যায়। এখন সে সবের চল না-থাকলেও, কালীপুজোর রাতে আজও বিষ্ণুপুর শ্মশানে ঢুকলে গা-ছমছম করে, অস্বস্তিবোধ করেন অনেকেই । কালো মাটির বাঁকে-বাঁকে আজও জীবন্ত ইতিহাস। পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে প্রাচীনত্বের শিকড় ।

দীপাবলির রাতে জেগে থাকে পুরো বিষ্ণুপুর
আদি গঙ্গার পাড়ে অদ্ভূত এক আলো-আবছায়ার মিশেল, যা দীপাবলির রাতে জাগিয়ে রাখে পুরো বিষ্ণুপুরকে ৷ তন্ত্রসাধনা ও শবসাধনা এখন কল্পকথা হয়ে গেলেও, এই একটি রাতই আজও সাবেকিয়ানার সঙ্গে বেঁধে রেখেছে এলাকার মানুষকে। পুজোর প্রতিষ্ঠাতা মণিলাল মারা গিয়েছেন অনেক আগেই। তাঁর মৃত্যুর পর ভাই ফণীভূষণ চক্রবর্তী সেবায়েত হিসাবে নিযুক্ত হন। এখন মণিলালের ছেলে শ্যামল চক্রবর্তী মন্দিরের সেবায়েতের দায়িত্বে রয়েছেন। সত্তরোর্ধ্ব শ্যামল চক্রবর্তী এখানে প্রধান সেবায়েত।

সেবায়েতের বক্তব্য
তিনি বলেন, "বাবার মৃত্যুর পর কাকা ফণীভূষণ চক্রবর্তীর কাছে তন্ত্রের শিক্ষা নিতে থাকি। তাঁর হাত ধরেই গুপ্তবিদ্যা নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু। পরে করুণাময়ী মন্দিরে নিত্য পুজো শুরু করি।"

মনস্কামনার জন্য ভক্তরা ঢিল বাঁধেন
কালীপুজোর আগে এই মুহূর্তে তুমুল ব্যস্ততা চক্রবর্তীদের। দালানে নতুন রং'য়ের প্রলেপ পড়ে গিয়েছে। ঝাড়পোছ করে সাজানো হচ্ছে নরমুণ্ডগুলি।পুজোর দিন দূরদূরান্ত থেকে বহু ভক্ত আসেন এই পুজো দেখতে। মনস্কামনার জন্য মন্দিরের সামনে একাধিক ঢিল বেঁধে রাখেন ভক্তরা। তবে এক সময় এই মন্দিরে আসতে ভক্তরা ভয় পেতেন। চারিদিকে গা-ছমছমে ভাব, অন্ধকার জঙ্গল। এখন অবশ্য অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে এর। রয়েছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বসার জায়গা ও আলো। কিছুটা হলেও আধুনিক হয়েছে মন্দির চত্বর।

