হাওড়ার বুকে অভিশপ্ত নীলকুঠির ইতিহাস, সংরক্ষণের দাবিতে সরব স্থানীয়রা
ইংরেজ শাসনের সময় বাংলায় নীলচাষের কথা সকলেরেই কমবেশি জানা ৷ নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ আজও বহু ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

Published : March 7, 2025 at 8:45 PM IST
হাওড়া, 7 মার্চ: ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে হাওড়ার অভিশপ্ত নীলকুঠি। এক সময়ের ব্রিটিশ শাসনের নির্মম অত্যাচারের নিদর্শন বহন করছে নীলকুঠি। হাওড়ার ডোমজুড়ের নোনা কুণ্ডু এলাকা কিংবা আমতার রসপুর ও কলিকাতা গ্রাম-সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে নীলচাষের নিষ্ঠুরতার নানা চিহ্ন। তবে কালের নিয়মে আজ সেই ইতিহাস বিস্মৃতপ্রায়। খোলা আকাশের নীচে পড়ে থেকে ধ্বংস হচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য ৷
ইতিহাসের সাক্ষী নীলকুঠি
নীলচাষের ইতিহাস বাংলার কৃষকদের যন্ত্রণার এক নীরব দলিল। সে সময় বাংলার উর্বর জমিতে কৃষকদের দিয়ে জোর করে নীল চাষ কারনো হত। তাঁদের ফসলি জমি কেড়ে নিয়ে নীলকর সাহেবরা চাপিয়ে দিত নীল চাষের ভয়াবহ যন্ত্রণা। সেই দুর্বিষহ অবস্থার কথা তুলে ধরেছিলেন সাংবাদিক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় আর নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র ৷
ডোমজুড়ের নোনা কুন্ডু এলাকার নীলকুঠি আজও সেই ইতিহাস বহন করে। জানা যায়, ওই এলাকার জনৈক চণ্ডীচরণ ঘোষ ছিলেন নীল চাষের গোমস্তা। বংশ পরম্পরায় ঘোষ পরিবার সেই ইতিহাসের অংশীদার। সেই নীল সংগ্রহ করে ইংল্যান্ডে পাঠানো হত জলপথে। ভাঙা ইট, ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামো আর পরিত্যক্ত পুকুর আজও সেই নিষ্ঠুর অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়। অন্যদিকে, আমতার রসপুর ও কলিকাতা গ্রামে রয়েছে আরেকটি নীলকুঠি।
এখানেও একসময় নীল চাষের জন্য কৃষকদের উপর চালানো হত অকথ্য অত্যাচার। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা আজও কথায়-গল্পে সেই সময়ের ইতিহাস তুলে ধরেন। কলিকাতা গ্রামের ভাঙা নীলকুঠির পাশেই রয়েছে চৌবাচ্চা আকৃতির জলাধার এবং তার পাশেই 'নীল পুকুর'। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নীলকুঠি আজ ধ্বংসের মুখে। নদী বাঁধের উন্নয়নের সময় কুঠির একাংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। ফলে স্থানীয় মানুষজন নীলকুঠি সংরক্ষণের দাবিতে সরব হয়েছেন।

রসপুর পঞ্চায়েতের উপপ্রধান জয়ন্ত পল্ল্যে জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তাঁরা আশাবাদী এটি সংরক্ষিত হবে। এলাকার বাসিন্দা জগন্নাথ কালার বলেন, "আমরা আমাদের শৈশব থেকে শুনে এসেছি এটাই নীলকুঠি। এখানে পুকুর ও ঘাট রয়েছে। এই বাড়ির অবস্থা খুব খারাপ, ধুলো জমেছে। আমি জানি না এটি কত পুরোনো। আমার বাবা বলেছিলেন, তিনি এখান থেকে টাকা পেয়েছেন, কিন্তু আমি কিছু শুনিনি। এখানে আগে নীল চাষ হত, এখন অবস্থা খারাপ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময় এখানে খাল ছিল। খাল দিয়েই নৌকা করে মালপত্র যেত। সরস্বতী নদীতে গিয়ে মিশতো সেই খাল।"
নীলচাষের ভয়াবহ ইতিহাস আগামী প্রজন্মকে জানাতে এবং ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থে এলাকাবাসী সরকারি উদ্যোগে এই স্থাপত্য সংরক্ষণের দাবিতে সরব হয়েছেন। স্থানীয় মানুষের দাবি, নতুন প্রজন্ম যেন শুধু বইয়ের পাতায় নয়, স্বচক্ষে এই ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখতে পায়। ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতাতেই নয়, দাঁড়িয়ে থাকে ইঁট, পাথর আর জনপদে। সেই ইতিহাস রক্ষায় প্রশাসনের তৎপরতা আজ সময়ের দাবি। হাওড়ার অভিশপ্ত নীলকুঠিরা যেন আর হারিয়ে না-যায় কালের অতলে, এটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।

