অপ্রতুল রেক-কর্মী, তিল ধারণের জায়গা নেই মেট্রোয়; সমস্যা মিটবে কবে ?
তিন মেট্রো লাইনের উদ্বোধনের পর থেকেই রেকর্ডসংখ্যক ভিড়। কলকাতা মেট্রোর তরফে বলা হয়েছে, এতগুলি রুট খুলেছে বটে কিন্তু রেক কোথায় ? মোটরম্যানই বা কোথায় ?

Published : August 30, 2025 at 9:58 PM IST
কলকাতা, 30 অগস্ট: গত 22 অগস্ট কলকাতা মেট্রোয় নেটওয়ার্কের গ্রিন লাইন দ্বিতীয় তথা ফাইনাল ফেজে বাণিজ্যিক পরিষেবা চালু হয়েছে। সেদিন থেকেই গ্রিন লাইনের টিকিট কাউন্টারে লক্ষণীয় যাত্রী ভিড় দেখা গেল। গত 22 তারিখের পর থেকেই মেট্রোয় এক লাফে হুহু করে বেড়েছে যাত্রী সংখ্যা। তাই এই রুটে আরামে সফর করা এখন অতীত।
গত 22 অগস্ট প্রধানমন্ত্রী কলকাতা মেট্রোর যেই তিনটি রুট উদ্বোধন করে গেছেন সেগুলির মধ্যে শিয়ালদহ এসপ্ল্যানেড শাখা (গ্রিন লাইন) ওই একই দিনে যাত্রী পরিষেবা চালু হয়ে যায়। এরপর 25 অগস্ট থেকে বাকি দুটি লাইন অর্থাৎ বেলেঘাটা হেমন্ত মুখোপাধ্যায় শাখা (অরেঞ্জ লাইন) এবং নোয়াপাড়া জয়হীন বিমানবন্দর শাখা (ইয়েলো লাইন) পরিষেবা চালু হয়।
চলতি বছরের 15 মার্চ গ্রিন লাইনের এসপ্ল্যানেড-হাওড়া ময়দান রুটের উদ্বোধনের করে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর তার ঠিক পরের দিন অর্থাৎ 16 মার্চ এই রুটে পরিষেবা চালু হয়। প্রথম দিনেই রেকর্ডও সংখ্যক যাত্রী ভিড় হয়েছিল। নিরাপত্তা রক্ষীদের ভিড় সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছিল৷ সমাজ মাধ্যমে যে গ্রিন লাইনের স্টেশনগুলি বা ট্রেনের ভিতরে যেই ছবি বা ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে, তাতে রেকের ভেতরে তিল ধরনের জায়গা নেই বলেই চোখে পড়তে। আবার ট্রেনে ওঠার জন্য প্লাটফর্মে যাত্রীদের লম্বা লাইন। জানা যাচ্ছে যে, এই পুরো 16 কিলোমিটার পথ চালু হয়ে যাওয়ার পর এক লাফে যাত্রি সংখ্য বেড়েছে প্রায় 40 শতাংশ।
দেখা যাচ্ছে যে টিকিট কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন এড়াবার জন্য ভিড় সামাল দিতে বারে বারেই অ্যাপের মাধ্যমে টিকিট কাটার কথা যেমন বলা হচ্ছে তেমনই যাত্রীদের কাছে আবেদন করা হচ্ছে যাতে তাঁরা যেন জোর করে কামরায় প্রবেশ করার চেষ্টা না করে পরবর্তী ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করেন৷ কারণ যতক্ষণ মেট্রোর প্রতিটি কোচের গেট বন্ধ না হচ্ছে ততক্ষণ মেট্রো ছাড়ার সিগন্যাল দেওয়া যাচ্ছে না।

যেদিন গ্রিন লাইনের প্রথম ফেজ চালু হয়েছিল 16 মার্চ ওই দিনেও এই একই ছবি ধরা পড়েছিল। বলাই বাহুল্য যে রাতারাতি অন্যান্য রুটের চেয়ে যেমন অনেক বেশি ভিড় হচ্ছে এই রুটে তেমনই লক্ষী লাভ হয়েছে মেট্রো কতৃপক্ষের। ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রোর সঙ্গে যুক্ত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আধিকারিক জানিয়েছেন যে বর্তমানে এই রুটে যা ভিড় হচ্ছে তা এক রকম প্রত্যাশিত ছিল। এই রুটটি পুরোপুরিভাবে খুলে যাওয়ার দিন গুনছিলেন যাত্রীরা।
তবে ইস্ট ওয়েস্ট এবং নর্থ সাউথ রুটে এই ভিড় আশঙ্কা করেই আইএনটিটিইউসি অনুমোদিত মেট্রো রেলওয়ে প্রগতিশীল শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের পক্ষ থেকে অনেক আগেই কর্তৃপক্ষকে রেক ও মেট্রো কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে জানিয়ে চিঠি দিয়েছিল।

আইএনটিটিইউসি অনুমোদিত মেট্রো রেলওয়ে প্রগতিশীল শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের। সম্পূর্ণ গ্রিন লাইন চালু হয়ে যাওয়ার ফলে যে রাতারাতি এত ভিড় বেড়ে যাবে এটা যেমন প্রত্যাশিত ছিল, তেমনই মেট্রোয় আর আরামে সফর করা যাবে না সেটা তো যাত্রীদের কাছেও অপ্রত্যাশিত ছিল। যাত্রী সংখ্যা এবং পরিষেবার সংখ্যা বাড়ানো হলেও বাড়ানো হচ্ছে না রেক বা কর্মীর সংখ্যা। পরিষেবা বজায় রাখার জন্য অপ্রতুল সংখ্যক কর্মী ও রেক দিয়েই কাজ চালানো হচ্ছে। আরও বেশি সংখ্যক রেক পাওয়া গেলে দিনের বাস্তব সময় 8 মিনিটের ওয়েটিং টাইমকে যদি 5 মিনিটে নামিয়ে নিয়ে আসা যায় তবেই কিছুটা হলেও হালকা হবে যাত্রী-ভিড়।

- এই ভিড় প্রসঙ্গে হাওড়া ময়দান থেকে কলকাতার অফিস পাড়ার নিত্যযাত্রী বিনোদ রাঠৌর ইটিভি ভারতকে বলেন, "সকালের সফিস টাইমে আর বিকেলে অফিস ফেরত টাইমে সবচেয়ে ভিড় হচ্ছে এসপ্ল্যানেডে। একদিন তো প্রায় 30-35 মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে কয়েকটা মেট্রো ছেড়ে তবে ট্রেনে ওঠা গেল।"
- রবীন্দ্রসদন মেট্রোর কাছে কলকাতা মেট্রোর আর এক নিত্যযাত্রী পড়ুয়া দীগন্ত চক্রবর্তী বলেন, "মেট্রোতে এখন যা ভিড় হচ্ছে প্রায় প্রতিটা স্টেশনে, তাতে রীতিমতো ধাক্কাধাক্কি করে ট্রেনে উঠতে-নামতে হচ্ছে। বিকেল পাঁচটা থেকেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠছে। আমি তো ভাবছি এর পর থেকে মেট্রো ছেড়ে বাসেই যাতায়াত করব।"
- নিত্যযাত্রী না হলেও রবীন্দ্র সরোবরে মেট্রোর টিকিট কাউন্টারের সমানে লম্বা লাইন দেখে চমকে গিয়েছেন শাশ্বতী। তিনি বলেন, "টিকিটের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়ালে বেশ কয়েকটা মেট্রো চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।"
গত 22 অগস্ট থেকেই ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রো রুটে এখন মোট 186টি পরিষেবা পাওয়া যাচ্ছে যার মধ্যে 93টি হাওড়া ময়দান এর দিক থেকে ছাড়ছে এবং 93 টি সল্টলেক সেক্টর ফাইভ এর দিক থেকে ছাড়ছে। দুদিক থেকেই প্রতি 8 মিনিট অন্তর পাওয়া যাচ্ছে একটি মেট্রো। অর্থাৎ, ব্যস্ত সময় প্রতি আট মিনিট অন্তর পাওয়া যাবে একটি মেট্রো। এরপর এই সময় যাত্রীদের কিছুটা কম থাকবে সেই সময় 12 মিনিট অন্তর মিলবে একটি মেট্রো এবং যখন একেবারেই ভির কম থাকবে সেই সময় প্রতি 15 মিনিট অন্তর মেট্রো পাওয়া যাবে।
মেট্রো কর্তৃপক্ষ সূত্রে খবর যে, মেট্রোতে সময়ের যে ব্যবধান দেওয়া হয়েছে সেই সময় মেনেই ট্রেন চলছে। বর্তমানে এই রুটে মোট 14টি রেক পরিষেবার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে দশটি রেক পরিষেবা দেয় এবং চারটি রেককে রিজার্ভে রাখা হয়। প্রসঙ্গত, আরও তিনটি রেক পেয়েছে ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রো, যেগুলি বর্তমানে কারশেডে রাখা রয়েছে। কারণ, নতুন রেক আসার পর একাধিক পরীক্ষা নিরীক্ষা চলে। তারপর ওই রেকগুলি যাত্রী পরিষেবার জন্য একেবারে প্রস্তুত হলে তবে সেগুলিকে পরিষেবায় নামানো হয়।
জানা যাচ্ছে, পুজোর আগে হয়েতো দুটি রেককে পরিষেবায় নামানো হতে পারে। কর্তৃপক্ষ এ-ও জানিয়েছে যে অন্তত 20টি রেক যদি প্রতিদিনের পরিষেবায় ব্যবহার করা যায় তবেই 8 মিনিটের এই ব্যবধানকে 5 মিনিটে নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পরে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলকাতা মেট্রো রেলের আরেক আধিকারিক যদিও স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছেন, ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রোয় যা ভিড় হচ্ছে তাতে মেট্রো করিডোরে ওই ভিড় সামাল দিতে কোনও সমস্যা হচ্ছে না। পাশাপাশি তিনি আরও জানিয়েছেন যে, বর্তমানে এই রুটে যা রেক রয়েছে তাতে পরিষেবা দিতে অসুবিধাও হচ্ছে না।
মেট্রো দুর্ভোগ প্রসঙ্গে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের বক্তব্য

ফিরহাদ হাকিম বলেন, "শুধু মেট্রো নয়, রেলের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে কাজ করা হয়েছিল ৷ বিজেপি আসার পরে সব মন্ত্রক অকেজো হয়ে আছে। আলাদা বাজেট আর নেই। সবটাই শেষ হয়ে গিয়েছে। রেলের অবস্থা খুব খারাপ। আরশোলা ঘুরে বেড়ায় ট্রেনে। আর এই মেট্রোয় এখন সেফটি সিকিউরিটি নেই। রেলে এত বড় বড় দুর্ঘটনা আগে কোনওদিন হয়নি। এখন বেসরকারিকরণের দিকে ঝোঁক বেশি।"

