দীর্ঘদিন বন্ধ নিয়োগ, প্রয়োজনের তুলনায় কম চালক সংখ্যা; কেমন চলছে কলকাতা মেট্রো ?
বহুদিন হল কর্মী নিয়োগ নেই ৷ প্রয়োজন আরও 180 জন চালকের ৷ নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক প্রশ্নের মুখে কলকাতা মেট্রো ৷ ক্ষোভ বাড়ছে কর্মীদের মধ্যেও ৷

Published : March 23, 2025 at 6:56 PM IST
|Updated : March 23, 2025 at 7:33 PM IST
কলকাতা, 23 মার্চ: একের পর এক সম্প্রসারণ হচ্ছে কলকাতা মেট্রোয়। নেওয়া হচ্ছে পরিষেবাকে আরও বেশি করে যাত্রীবান্ধব করে তোলার একাধিক উদ্যোগ । তবে বাইরের চাকচিক্য বাড়লেও পরিকাঠামোর অভাবে ভুগছে মেট্রো। চালক-সঙ্কট থেকে শুরু করে একজন স্টেশন সুপারভাইজারের উপর দুটি করে স্টেশনের দায়িত্ব এবং অতিসম্প্রতি ট্রাফিক বিভাগে রাত্রিকালীন ভাতা বন্ধ করে নতুন রস্টার চালু- মেট্রোরেলকে যাত্রীবন্ধব করতে গিয়ে আখেরে যাত্রীদের নিরাপত্তাই অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে না তো ? চতুর্দিকে ঘোরাফেরা করছে এমন সব প্রশ্ন ।
সমস্যার ইতিবৃত্ত
ইতিমধ্যেই চালু হয়েছে একাধিক লাইন। পুরোদমে চলছে গ্রিন লাইন 1 ও গ্রিন লাইন 2-কে যুক্ত করার কাজ । প্রায় প্রস্তুত ইয়েলো লাইনও । তবে পরিষেবা বজায় রাখার জন্য মেট্রোর কর্মী বিশেষ করে যাঁদের হাতে যাত্রী সুরক্ষা ভার সেই চালকের সংখ্যা অপ্রতুল। অন্যদিকে, প্রথম থেকে নিয়ম ছিল, একটি স্টেশনের দায়িত্বে থাকবেন একজন করে সুপারভাইজার। কর্মীরসংখ্যা কমায় এখন দুটি স্টেশনের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে একজন সুপারভাইজারকে। এর ফলে যেমন বেড়েছে কাজের চাপ তেমনই কর্মীদের মধ্যে মেট্রো কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভও বেড়েছে।
নয়া সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশ্ন
এরই মধ্যে কর্তৃপক্ষ আরও একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবার থেকে ট্রাফিক বিভাগে রাত্রিকালীন ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং পুরনো রস্টার পরিবর্তন করে বিকেল চারটে থেকে রাত 12টা পর্যন্ত রস্টার চালু হবে । আগামী মাস থেকেই এই রস্টার চালু হয়ে যেতে পারে বলে খবর।
ভারতীয় রেলের আর কোথাও এই ধরনের রস্টার নেই । সাধারণত কলকাতা মেট্রোয় তিন শিফটে কাজ হয়। প্রথম শিফট সকাল 6টা থেকে দুপুর 2টো পর্যন্ত চলে। পরের শিফট চলে দুপুর 2টো থেকে রাত 10টা পর্যন্ত। তার পরের শিফট রাত 10টায় শুরু হয়ে শেষ হয় ভোর 6টার সময় । অর্থাৎ, প্রতি শিফটে মোট আট ঘণ্টা করে কাজ হয়। শিফট শেষ করে মেট্রোকর্মীরা বিশেষ করে মহিলা কর্মীরা কীভাবে বাড়ি ফিরবেন তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনও মাথাব্যথাই নেই বলে অভিযোগ । স্বাভাবিকভাবেই এসব নিয়ে কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে ।
বন্ধ নিয়োগ
আসলে বিষয়টি হল, মেট্রোয় বিপুল সংখ্যায় শুন্য পদ রয়েছে এবং সেখানে কর্মী নেওয়ার প্রক্রিয়াও বন্ধ । নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মী জানান, আগের তুলনায় কাজের চাপ বেড়েছে অনেক গুণ । মানসিক এবং শারীরিক চাপের মধ্যে কাজ করছেন কর্মীরা । চালকদের ক্ষেত্রে গাড়ি চালানোয় মনোনিবেশ করতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে । বিষয়টি মেট্রোর অভ্যন্তরীণ হলেও এর সঙ্গে সরাসরিভাবে যুক্ত রয়েছে যাত্রী পরিষেবা এবং যাত্রী সুরক্ষা ।
অন্যদিকে, দিনে দিনে মেট্রো শাখা-প্রশাখা বিস্তার করছে । এমতাবস্থায় ব্লু লাইন থেকেই এদিক ওদিক করে চালক নিয়ে গাড়ি চালানো হচ্ছে । বর্তমানে কলকাতা মেট্রো নেটওয়ার্কের জন্য আরও 180 জন চালক লাগবে। সম্প্রতি মেট্রো কর্তৃপক্ষ ট্রেন অপারেটর নিয়োগ করবে জানিয়ে একটি বিজ্ঞাপন দেয় । সেখানে বলা হয়েছিল, পাঁচ বছরের জন্য বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে টেন্ডার দিয়ে ট্রেন অপারেটর নিয়োগ করা হবে । কিন্তু এর কয়েকদিনের মধ্যে সংগঠনগুলির চাপে সেই বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করা হয়। এই ব্যবস্থা দেশের আর অন্য কোনও রেল বিভাগে নেই ।
শ্রমিক সংগঠনের মত
সম্প্রতি 19 মার্চ রেল বোর্ড আরও একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জানায়, দেশের অন্য রেল বিভাগের পাশাপাশি পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব রেল এবং কলকাতা মেট্রোয় অ্যাসিস্ট্যান্ট লোকো পাইলট নেওয়া হবে। এই বিষয়ে আইএনটিটিইউসি অনুমোদিত মেট্রো রেলওয়ে প্রগতিশীল শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সহ-সভাপতি শুভাশিস সেনগুপ্ত জানান, মেট্রো প্রশাসন নিজেদের ইচ্ছামতো নিয়ম তৈরি করছে। তার সঙ্গে বাস্তবের কোনও যোগাযোগ নেই । টেন্ডার দিয়ে বেসরকারি সংস্থার থেকে লোক নিয়োগ করার অর্থ বেসরকারিকরণের দিকে কলকাতা মেট্রোকে এগিয়ে দেওয়া ।
তিনি আরও জানান, সম্প্রতি একটি নির্দেশিকা জারি করে বলা হয়েছে দেশের অন্য রেলের পাশাপাশি পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব এবং কলকাতা মেট্রোয় অ্যাসিস্ট্যান্ট লোকো পাইলট নিয়োগ করা হবে । তবে এই বিজ্ঞপ্তির উপরে কোনও ভরসা করা যাচ্ছে না ৷ বিজ্ঞপ্তিটি যদি একটু খুঁটিয়ে পড়া যায় তাহলে দেখা যাবে যে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব রেল থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট লোকো পাইলটদের কলকাতা মেট্রোয় পাঠানো হবে । কারণ 2012 সাল থেকে রেল বোর্ড কলকাতা মেট্রোয় সরাসরি নিয়োগ বাতিল করে দিয়েছে । চালক সঙ্কট কিছুটা ঠেকা দিতেই ব্লু লাইন থেকে চালক নিয়ে অন্য সম্প্রসারিত অংশগুলিতে কাজ চালানো হচ্ছে ।
নিয়োগ প্রক্রিয়া জটিল, সময়ও লাগবে বিস্তর
নিয়োগ প্রক্রিয়া যেহেতু ঘুরপথে হবে তাই রেল রিক্রুটমেন্ট বোর্ড (RRB) কবে পরীক্ষা নেবে, কবে নিয়োগ হবে এবং কবেই বা তারা রেল থেকে প্রশিক্ষণ পেয়ে এখানে আসবেন তা স্পষ্ট নয়। তারপর আবার এখানে এসে আর এক পর্যায়ে প্রশিক্ষণ হবে। সবটাই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে এবং এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া ।
এই বিষয় সাউথ ইস্টার্ন রেলওয়ে মজদুর ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শুভাশিস বাগচী জানান, আরআরবি নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করে প্রতিটি জোনে নতুন কর্মীদের পাঠায় । স্বাভাবিকভাবেই যোগ্য ব্যক্তিদের নিজেদের জোনে রাখতে চাইবে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব রেল । এছাড়াও কলকাতা মেট্রো যেহেতু কলকাতাতেই চলে তাই ইচ্ছুক ব্যক্তিদের মধ্যে থেকে বিবেচনা করা হবে ।
অর্থাৎ, খুব শিগগিরি যে কলকাতা মেট্রোয় চালক এবং কর্মী সঙ্কট মিটছে না তা বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না । তাই কলকাতা মেট্রো নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ করা হলেও যাত্রী সুরক্ষার মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক বিষয়টি নিয়ে কি তাহলে একেবারেই উদাসীন কর্তৃপক্ষ ? উঠছে প্রশ্ন ।

