পুষ্টিতে ভরপুর মিড-ডে মিল, সুন্দরবনের স্কুলে কিচেন গার্ডেনে মজেছে পড়ুয়ারা
স্কুলের জমিতেই মিড-ডে মিলের জোগান ! পাতে পড়ছে টাটকা সবজি থেকে পুকুরের মাছ ৷ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পেয়ে খুশি সুন্দরবনের স্কুল পড়ুয়ারা।

Published : July 31, 2025 at 5:46 PM IST
হিঙ্গলগঞ্জ, 31 জুলাই: মিড-ডে মিলের গুণগত মান নিয়ে মাঝেমধ্যেই বিতর্ক দেখা দেয় ৷ নানা অপ্রীতিকর ঘটনায় জর্জরিত হতে হয় রাজ্যের বিভিন্ন স্কুলকে ৷ ঠিক তখন ভিন্ন ছবি উঠে এল উত্তর 24 পরগনার সুন্দরবনের এক স্কুলে ৷ স্কুলের জমিতে মিড-ডে মিলের জোগান তৈরি করে দিশা দেখাচ্ছে কনকনগর সৃষ্টিধর ইনস্টিটিউশন ৷
জৈব পদ্ধতিতে স্কুলের জমিতেই চাষ করা হচ্ছে সবজি থেকে পুকুরের মাছ ৷ সেই টাটকা সবজি দিয়েই প্রতিদিন চলছে মিড-ডে মিলের রান্না। মিড-ডে মিলে স্বাস্থ্য সম্মত খাবার পেয়ে খুশি পড়ুয়ারাও ৷ এতে স্কুলে বাড়ছে তাদের উপস্থিতি।
হিঙ্গলগঞ্জ ব্লকের সান্ডেলেরবিল গ্রাম পঞ্চায়েতের এলাকায় রয়েছে শিশুমিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত এই বিদ্যালয়টি ৷ 1943 সালে স্কুলটি স্থাপিত হলেও সরকারি অনুমোদন মেলে 1948 সালে। তারপর থেকে ধীরে ধীরে এই স্কুলের সুনামও বেড়েছে । বেড়েছে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও। উচ্চমাধ্যমিকে উন্নত হওয়া এই স্কুলে বর্তমানে পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। শুধু পঠন-পাঠন নয় ! পড়ুয়াদের গুণগত মানেও সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে সুন্দরবন এলাকার কনকনগর সৃষ্টিধর ইনস্টিটিউশন।
সেই কারণে প্রায় দু'বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা স্কুলের নিজস্ব জমিতেই চলছে সবজি চাষের ব্যাপক কর্মকাণ্ড। স্কুল লাগোয়া পুকুরে হচ্ছে মাছ চাষও।তবে, সবজি কিংবা মাছ চাষে কোনও কীটনাশক সার ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে এখানে হয়ে থাকে সবজি এবং মাছ চাষ। যা ব্যবহার করা হয় স্কুলের মিড-ডি মিলে। শুধু সবজি-মাছ চাষ করাই নয়! স্কুলের ফাঁকা জমিতে লাগানো হয়েছে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, নারকেল, পেয়ারা ও সবেদা-সহ বহু ফলের গাছও। শিক্ষকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সবজি ও মাছ চাষের পরিচর্যা করে আসছেন পড়ুয়ারাও। এমনকী, স্কুলের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজেও নিযুক্ত রয়েছেন তাঁরা।
এদিকে, স্কুলে সৌহার্দ্যের পরিবেশ বজায় রাখতে ইকো-ফ্রেন্ডলি মিড-ডে মিল ডাইনিং হলও তৈরি হয়েছে। যেখানে ছাত্রছাত্রীরা একসঙ্গে বসে মিড-ডে মিল খেয়ে থাকে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ পড়ুয়ারা নিজেরাই নিজেদের থালা ধুয়ে তারপর সারিবদ্ধভাবে খেতে বসেন মিড-ডে মিল। যা শিক্ষণীয় অন্যদের কাছেও।

এই বিষয়ে অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়া শবনম জমাদার বলেন, "আমাদের স্কুলে অর্গানিক কিচেন গার্ডেন রয়েছে। যেখানে কোনও কীটনাশক কিংবা রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ জৈব সার প্রয়োগ করেই এখানে শাকসবজি এবং মাছ উৎপাদন হয়ে থাকে। যা দিয়েই মিড-ডে মিলের রান্না হয়। এটা কেবল প্রধান শিক্ষকের প্রচেষ্টাতেই সম্ভব হয়েছে।"
একই সুর শোনা গিয়েছে দেবপ্রিয়া বাইন নামে নবম শ্রেণির এক পড়ুয়ার গলাতেও। তাঁর কথায়, "বাজারে যে সমস্ত শাকসবজি বিক্রি হচ্ছে তাতে প্রচুর পরিমাণ কীটনাশক সার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যাতে সেই শাকসবজিতে পোকামাকড় না লাগে। কিন্তু, আমাদের এখানে কোনও কীটনাশক সার প্রয়োগ করা হয় না। সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে আমরা সবজি ও মাছ চাষ করে থাকি। সেই কাজে আমরাও হাত লাগাই। এরকম একটা স্কুল পেয়ে আমরা ভীষণ খুশি। বিশেষ করে প্রধান শিক্ষকের অবদানের কথা না বললে ভুল হবে। তার প্রচেষ্টাতেই স্কুলে এত উন্নতি।"
এ নিয়ে মিড-ডে মিলের রাঁধুনি আরতি মণ্ডল বলেন, "বাজারে শাকসবজির দাম অত্যধিক। তাই স্কুলের উৎপাদিত সবজি এবং মাছ দিয়েই মিড-ডে মিলের রান্না হয় এখানে। টাটকা জিনিস দিয়ে একদিকে যেমন রান্না ভালো হচ্ছে । অন্যদিকে সেই খাবার খেয়ে পড়ুয়াদের শরীর-স্বাস্থ্যও ঠিক থাকছে।পড়ুয়াদের পাতে স্বাস্থ্য সম্মত খাবার তুলে দিতে পেরে আমরাও খুশি।"
অন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক পুলক রায়চৌধুরী বলেন, "মিড-ডে মিলে পড়ুয়াদের খাবারই নয়। এর সঙ্গে তাঁদের স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার বিষয়টিও জড়িয়ে রয়েছে । এটা এতটাই সংবেদনশীল পড়ুয়ারা যে খাবার পাচ্ছে তা যেমন স্বাস্থ্য সম্মত হতে হবে। তেমনই আবার তার গুণগত মানও ঠিক রাখতে হবে। বাজার থেকে সবজি কিনতে গেলে অনেক টাকা লাগে। তাই শিক্ষকরা সকলে মিলে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্কুলের পড়ে থাকা জমিতে সবজি চাষ করে তা মিড-ডে মিলের রান্নায় ব্যবহার করা হবে। স্কুল লাগোয়া পুকুরে আমাদের মাছও চাষ হয়। যা দিয়ে আমরা বছরে চার থেকে পাঁচ বার পড়ুয়াদের হাতে মাছ তুলে দিই। মিড-ডে মিল নিয়ে যেখানে এত বিতর্ক সেখানে আমরা হাসিমুখে মিড-ডে মিল পরিচালনা করে থাকি।উদ্দেশ্য একটাই স্বাস্থ্য সম্মত খাবার তুলে দিয়ে পড়ুয়াদের বুদ্ধি এবং মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটানো। সেই কাজে আমরা অনেকটাই সফল হতে পেরেছি।"

