বিদেশের চাকরির প্রস্তাব ফেরানো IIT পাশ 'শিক্ষকে'র গবেষণা পেল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে IIT পাশ 'শিক্ষকে'র গবেষণাপত্র ৷ গবেষণার পাশাপাশি রসায়নের উপর লিখেছেন বই ৷

Published : September 15, 2025 at 6:53 PM IST
কেশপুর, 15 সেপ্টেম্বর: পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কেশপুরের ঝেঁতলা শশীভূষণ হাইস্কুল ৷ এই স্কুলের রসায়নের শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তী ৷ আর পাঁচজন শিক্ষকের মতো রোজ স্কুলে আসেন, ছাত্রছাত্রীদের পড়ান ৷ তাঁদের পড়াশোনার সমস্যা হলে, তা দেখিয়ে দেন ৷ কিন্তু, এর বাইরেও একটি পরিচয় রয়েছে তাঁর ৷ স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি, তিনি রসায়নের একজন গবেষক ৷ 2011 সালে আইআইটি খড়গপুর থেকে পিএইচডি করেছেন গবেষক সুদীপ চক্রবর্তী ৷
কিন্তু, একজন গবেষক হয়েও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেই কাটিয়ে দিচ্ছেন ! পিএইডি ডিগ্রি প্রাপ্ত হওয়ায় অনায়াসে রাজ্যে, দেশে এমনকি বিদেশেও অধ্যাপনা করতে পারতেন তিনি ৷ কিন্তু, তা না-করে কেশপুরের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন ৷ সুযোগ যে আসেনি, তা নয় ৷ তাইওয়ান, সিঙ্গাপুরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাকরির প্রস্তাব এসেছিল ৷ কিন্তু, তা প্রত্যাখ্যান করেছেন অবলীলায় ৷ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগবে, কেন ? কারণ, সুদীপ চক্রবর্তীর আদর্শ এবং বাংলার মেধার বিকাশের ক্ষেত্রে তাঁর দায়িত্ববোধ ৷
তিনি বলেন, "19 বছর ধরে শিক্ষকতা করছি ৷ তার সঙ্গে পিএইচডি করেছি ৷ আমি 2011 সালে আইআইটি খড়গপুর থেকে পিএইচডি-র ডিগ্রি পাই ৷ সেই সময় চাইলেই রাজ্যে ও দেশের যে কোনও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি অধ্যাপনা করতে পারতাম ৷ তাও খুব সহজে ৷ এমনকি বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার কাছে পোস্ট-ডক্টরেটের সুযোগ আসে ৷ তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, সাউথ কোরিয়া থেকে আমার কাছে প্রস্তাব এসেছিল ৷"

কিন্তু, প্রশ্ন হল এই সুযোগ কেন হাতছাড়া করলেন সুদীপ চক্রবর্তী ৷ তিনি বলেন, "আমি এই পশ্চিমবঙ্গেই থেকে যাই ৷ যদি আমার কিছু দেওয়ার থাকে, তা যেন এখানকার ছেলেমেয়েরাই পায় ৷ বিশেষত ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ তৈরি করা ৷ তাদের কেরিয়ার গাইডেন্স ৷ কারণ, সব ছেলেমেয়ের মেধা তো এক হয় না ৷ কেউ খুব ভালো হয়, কেউ আবার স্বল্প মেধার হয় ৷ তারাও যাতে কেরিয়ার গড়তে পারে, তার জন্য পরামর্শ দেওয়া, বই লেখা, গবেষণা করা এই নিয়েই কাটিয়ে যাচ্ছি ৷"

এসবের মাঝেই অন্তত 20টি বই লিখেছেন গবেষক সুদীপ চক্রবর্তী ৷ রয়াসন ও ভৌত বিজ্ঞানের উপরে পাঠ্য বই লিখেছেন ৷ তেমনই সহায়িকা ও চাকরির প্রস্তুতির জন্য রসায়নের উপর বই লিখেছেন এই শিক্ষক ৷ সিবিএসই বোর্ডেও গবেষক সুদীপ চক্রবর্তীর বই পড়ানো হয় ৷ রাজ্যের প্রথমসারির একাধিক প্রকাশনা সংস্থার মাধ্যমে তাঁর লেখা বই প্রকাশিত হয়েছে ৷
এসবের পাশাপাশি, রসায়নের উপর নানা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন সুদীপ চক্রবর্তী ৷ সম্প্রতি তাঁর একটি গবেষণা আলোড়ন ফেলে দিয়েছে দেশ তথা বিশ্বে ৷ তাঁর সেই গবেষণাপত্রের বিষয় হল, ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল সেন্সিং-ন্যানো পার্টিক্যাল মডিফায়েড ইলেক্ট্রোড অফ ইথানল ৷ যে গবেষণাপত্রটি এবছর 31 মার্চ ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ রিসার্চ ইন ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে ৷ সফল এই গবেষণার জন্য তাঁকে পুরস্কৃত করা হয়েছে আন্তর্জাতিক এই সায়েন্স জার্নালের তরফে ৷
কী এই গবেষণার বিষয়
গবেষক সুদীপ চক্রবর্তী জানাচ্ছেন, এই গবেষণার বিষয় ও উদ্দেশ্য হল- মানব দেহে রক্তে মিশে থাকা অতি সামান্য পরিমাণ ইথানল বা অ্যালকোহলের মাত্রাকে পরিমাপ করা ৷ এর সাহায্যে ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল সেন্সিং পদ্ধতিতে ইথানল বা অ্যালকোহলের ন্যানো পার্টিক্যালকে চিহ্নিত করা যাবে ৷ যা সাধারণ কার্বন টেস্টিং পদ্ধতিতে সম্ভব হয় না ৷ ইটিভি ভারতকে তিনি জানিয়েছেন, যেকোনও কার্বন ডিভাইসে এই ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল সেন্সিং পদ্ধতিতে ইথানল চিহ্নিত করা যাবে ৷ এক্ষেত্রে কেবল রাসায়নিক পরীক্ষার পদ্ধতিতে মডিফিকেশন করা হয়েছে ৷

সেই নিয়েই গবেষক সুদীপ চক্রবর্তীর গবেষণাপত্রটি ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ রিসার্চ ইন ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সায়েন্সে প্রকাশিত হয় ৷ যেখানে সহজে অতিসামান্য পরিমাণে থাকা ইথানলকে কীভবে চিহ্নিত করা যাবে, তার বিস্তারিত গবেষণা তুলে ধরেছেন তিনি ৷ তবে, এই গবেষণার জন্য যে স্বীকৃতি তিনি পেয়েছেন, তার জন্যও প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে গবেষক সুদীপ চক্রবর্তীকে ৷
গবেষক বলেন, "আমি যদি কোনও বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকতাম, তাহলে আমার এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব পাওয়া অনেক সহজ হতো ৷ কিন্তু, একজন স্কুলের শিক্ষক হিসেবে এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব পেতে, আমাকে প্রমাণ দিতে হয়েছে ৷ আমার গবেষণাগুলির জন্য অনেক বেশি কোয়্যারি বা অনুসন্ধান হয় ৷ আমাকে সেগুলি পূরণ করতে হয় ঠিকঠাকভাবে ৷ তারপর গিয়ে আমার গবেষণাকে মান্যতা দেওয়া হয় ৷ ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল সেন্সিং-ন্যানো পার্টিক্যাল মডিফায়েড ইলেক্ট্রোড অফ ইথানলের জন্য আমাকে 10টি কোয়্যারি পূরণ করতে হয়েছে ৷"

উল্লেখ্য, এখনও পর্যন্ত 12টি গবেষণাপত্র লিখেছেন গবেষক সুদীপ চক্রবর্তী ৷ সেগুলি একাধিক আন্তর্জাতিক সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে ৷ তবে, খ্যাতি, সুনাম ও টাকাপয়সা নিয়ে ভাবেন না স্কুল শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তী ৷ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাঁর গবেষণা ৷ ভবিষ্য়ৎ পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে যেতে রসায়নের এমন আরও গবেষণা তিনি করতে চান ৷ সঙ্গে তাঁর ছাত্রছাত্রীরা যাতে ভবিষ্যতে সফল হতে পারে, সেই চেষ্টা চালিয়ে যাবেন ৷
তবে, রসায়নের এইসব গবেষণার জন্য ঠিকঠাক গবেষণাগারের অভাববোধ করেন সুদীপ চক্রবর্তী ৷ স্কুলের অনুপযোগী গবেষণাগারেই নিজের গবেষণার কাজগুলি করেন ৷ সীমিত পরিকাঠামোর মধ্যে থেকেও সাফল্য অর্জন করেছে তিনি ৷ তাই তাঁকে নিয়ে গর্ববোধ করেন ঝেঁতলা শশীভূষণ হাইস্কুলের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিপ্লব পাল ৷ তিনি বলেন, "আমি আর সুদীপ ছোটবেলার বন্ধুু ৷ ও আগাগোড়াই মেধাবী ৷ আমাদের স্কুলের এই সীমিত পরিকাঠামোর মধ্যেই নিজের গবেষণার কাজ করে যাচ্ছে ৷ আর তাতেই সাফল্য আসছে ৷ আন্তর্জাতিক মঞ্চে ওঁর এই স্বীকৃতি আমাদের গর্বিত করেছে ৷ ওঁ আমাদের স্কুলের এমনকি এই অঞ্চল তথা রাজ্যের গর্ব ৷"
স্কুল পরিচালন কমিটির সভাপতি নবীনচন্দ্র জানা বলেন, "শিক্ষক হিসেবে ওঁ বরাবরই একজন আদর্শ ৷ স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের পঠনপাঠনের দিকে সবসময় নজর থাকে ৷ তাঁর এই সাফল্য আমাদের গর্বিত করেছে ৷ আমরা যতটা পারি সাহায্য করি ৷ তবে, তার মধ্যেও নিজের অধ্যাবসায়ের উপর ভিত্তি করে সুদীপ স্যারের এই সাফল্য এসেছে ৷ ভবিষ্যতে আমরা যতটা পারব ওঁকে সাহায্য করব গবেষণার কাজে ৷"

