ETV Bharat / state

যুগের সঙ্গে বদলাচ্ছে ইন্দ্রজাল, খুঁটিনাটি জানতে ম্যাজিকের কারখানায় ইটিভি ভারত

যুগ বদলাচ্ছে ৷ তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে ইন্দ্রজালের ভাবনা ৷ তার সাজ-সরঞ্জাম ৷ এই খুঁটিনাটি জানতেই ম্যাজিকের কারখানায় ইটিভি ভারত ৷

ETV BHARAT
ম্যাজিকের কারিগর সৌম্য দেব (নিজস্ব চিত্র)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : August 13, 2025 at 8:29 PM IST

7 Min Read
Choose ETV Bharat

আসানসোল, 13 অগস্ট: 'হিলি-গিলি হোকাস-ফোকাস', 'অ্যাবড়া কে ড্যাবড়া'! শব্দগুলোর সঙ্গে ছোটবেলার নস্টালজিয়া জড়িয়ে আছে । শহরের মাঠে তাঁবু খাটিয়ে কিংবা প্রেক্ষাগৃহে হয় ইন্দ্রজাল জাদুর শো। চোখের নিমেষেই রুমাল হয়ে যায় বেড়াল ৷ সবই আসলে জাদুকরের ভেল্কি ৷ জাদু ছড়ি বা মন্ত্র-তন্ত্র নয়, সবটাই তিনি করেন বিশেষভাবে তৈরি ম্যাজিক প্রপস দিয়ে ৷ কেমন হয় সেই ইনস্ট্রুমেন্ট ? তারই সুলুকসন্ধানে আসানসোলে ম্যাজিকের কারখানায় হানা দিয়েছে ইটিভি ভারত ৷ সেখানে ম্যাজিকের কারিগর সৌম্য দেব বললেন, এই শিল্পে সোনালি দিন না-থাকলেও এর জৌলুস ধরে রাখতে নয়া মোড়কে হচ্ছে ম্যাজিক পরিবেশন ৷ বদল এসেছে জাদুর সরঞ্জামেও ৷

সৌম্য দেবের ম্যাজিক কারখানা

1980 সাল থেকে নিজে ম্যাজিক দেখাচ্ছেন জাদুকর সৌম্য দেব ৷ তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তো বটেই, এমনকি বিদেশেও ম্যাজিকের শো করে এসেছেন । বিভিন্ন রাজ্যে আজও তাঁর ম্যাজিকের নাম-ডাক রয়েছে । তবে শুধু ম্যাজিক দেখানোই নয় । 2000 সাল থেকে ম্যাজিকের ইন্সট্রুমেন্ট তৈরি করেন সৌম্য দেব । নতুন নতুন ম্যাজিকের আবিষ্কার থেকে শুরু করে অন্যান্য ম্যাজিশিয়ানদের চাহিদা মতো সমস্ত ম্যাজিকের যন্ত্রপাতি বানিয়ে দেন তিনি । ভারতের বহু বিখ্যাত ম্যাজিশিয়ান সৌম্য দেবের কাছে ম্যাজিকের যন্ত্র কিনেছেন । বর্তমানে প্রায় তিন হাজার ম্যাজিশিয়ান সৌম্য দেবের কাছে ম্যাজিকের এই যন্ত্রপাতি কেনেন ।

ম্যাজিকের কারখানায় ইটিভি ভারত (নিজস্ব ভিডিয়ো)

কীভাবে তৈরি হয় ম্যাজিকের যন্ত্র ?

জাদুকর সৌম্য দেব জানিয়েছেন, "বিভিন্ন ম্যাজিশিয়ানদের বিভিন্ন রকমের ডিমান্ড থাকে । কখনও আমরা নতুন ম্যাজিক আবিষ্কার করে সেই ইন্সট্রুমেন্ট বিক্রি করি । আবার কখনও বিভিন্ন ম্যাজিশিয়ান তাঁদের ইচ্ছেমতো ম্যাজিকের ইন্সট্রুমেন্টের অর্ডার করেন । অনেকেই আবার বিদেশি ম্যাজিকের অনুকরণে ম্যাজিকের ইন্সট্রুমেন্ট বানাতে বলেন । আমরা সেই মতো ইন্সট্রুমেন্ট তৈরি করে দিই ।"

তিনি আরও জানান, "আমার ম্যাজিকের কারখানায় কাঠের ইন্সট্রুমেন্ট বেশি তৈরি হয় । এছাড়াও বেশকিছু ক্ষেত্রে কাগজ ও ধাতব ইন্সট্রুমেন্টের অর্ডার আসে । আমরা অর্ডার অনুযায়ী ইন্সট্রুমেন্ট তৈরি করে দিই । তবে ম্যাজিক বিষয়টি পুরোটাই গোপনীয় । সেই কারণে ইন্সট্রুমেন্ট তৈরি করতে হয় খুব গোপনভাবেই । আমার ম্যাজিকের কারখানায় যাঁরা কাজ করেন, তাঁদেরকে আমরাই হাতে-কলমে শিখিয়ে নিই । তাঁরা যাতে বাইরে বিষয়টিকে খোলসা না-করে দেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পরেই আমরা ম্যাজিকের কারখানায় কর্মী নিয়োগ করি ।"

কী রকম দাম ম্যাজিক ইনস্ট্রুমেন্টের ?

জাদুকর সৌম্য দেবের ম্যাজিকের কারখানায় প্রায় 350 রকমের ম্যাজিকের ইন্সট্রুমেন্ট তৈরি হয় । যার দাম নানান রকমের ৷ ইটিভি ভারতের মুখোমুখি হয়ে সৌম্য দেব জানালেন, "কুড়ি টাকা থেকে দু লক্ষ টাকা পর্যন্ত ম্যাজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টের দাম হতে পারে । স্কুল শোয়ের ম্যাজিক ইন্সট্রুমেন্ট কিংবা কোনও ছোটখাটো পার্টিতে যে ম্যাজিক ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহার করা হয়, তার দাম কম থাকে । আবার স্টেজ শোয়ে যে সমস্ত বড় বড় ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহার করা হয়, তার দাম বেশি থাকে । বর্তমান সময়কালে অনেকেই ইলেকট্রনিক্স গেজেট দেওয়া ম্যাজিক ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহার করতে চাইছেন । সে ক্ষেত্রে দাম অনেকটাই বেড়ে যায় ।"

ETV BHARAT
ম্যাজিকের সরঞ্জাম তৈরি করেন জাদুকর সৌম্য দেব (নিজস্ব চিত্র)

তিনি আরও জানান, "প্রতিদিনই ম্যাজিকের ইন্সট্রুমেন্ট আপডেট হচ্ছে । সেই কারণে দামেরও ওঠা কমা হয় । তবে স্পেশাল যে সমস্ত ইন্সট্রুমেন্ট অর্ডার দিয়ে বানানো হয়, তার দাম সবসময়ই বেশি হয় । কারণ সে ক্ষেত্রে যিনি স্পেশাল ইন্সট্রুমেন্ট বানাচ্ছেন, তার গোপনীয়তা বজায় রাখতে হয় । অন্যান্য ম্যাজিশিয়ান যাতে সেই ট্রিকস না জানতে পারেন, সে বিষয়ে আমরা তাঁকে নিশ্চিত করে তবেই সেই ইন্সট্রুমেন্ট বানাই । কারণ সেটি তাঁর এক্সক্লুসিভ ইন্সট্রুমেন্ট ।"

ম্যাজিক শিল্প কি হারিয়ে যাচ্ছে ?

বর্তমান সময়ে শহরের কিংবা শহরতলিতে সেই ভাবে বড় ম্যাজিকের শো দেখা যায় না । বড় বড় বিখ্যাত যে সমস্ত ম্যাজিশিয়ানরা রয়েছেন, তাঁরাও ম্যাজিক শো থেকে অনেকটাই দূরে চলে গিয়েছেন । ফলে শহরে আর জুনিয়র পিসি সরকারের মতো বড় ম্যাজিশিয়ানরা ম্যাজিক দেখাতে আসেন না । কিন্তু তা বলে কি ম্যাজিক শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে ? সৌম্য দেব বলছেন, 'ম্যাজিক শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে' এই কথাটি ঠিক নয় ।

জাদুকরের কথায়, "ম্যাজিক শিল্প রয়েছে সগৌরবেই । সারা ভারতে পাঁচ হাজারেরও বেশি ম্যাজিশিয়ান আছেন, যাঁরা নিয়মিত শো করছেন । তবে বর্তমান সময়ে বাজেট অন্যরকম হয়ে গিয়েছে । ফলে বড় শো খুব কম হচ্ছে । বড় বড় ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে এসে এখন আর শো হয় না বললেই চলে । বড় বড় ইন্সট্রুমেন্টের চাহিদাও কমেছে । এখন শো খুব ছোট হয় এবং খুব স্মার্ট শো হয় । বিভিন্ন হোটেলে পার্টিতে কিংবা ছোটখাটো ইভেন্টে প্রচুর ম্যাজিকের শো হচ্ছে । কিন্তু সেখানকার ম্যাজিক একেবারেই অন্যরকম । বলা চলে, ম্যাজিকের রূপ পরিবর্তন হয়েছে ।

মোবাইল ম্যাজিকের সর্বনাশ করছে

মোবাইল আসার পর থেকেই ম্যাজিকের জনপ্রিয়তা খানিকটা কমতে শুরু করেছে । অন্যান্য লাইভ শো যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেভাবেই ম্যাজিকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মোবাইলের কারণে । মানুষের মোবাইল আসক্তি মানুষকে লাইভ গানের শো কিংবা ম্যাজিকের শো থেকে দূরে নিয়ে চলে যাচ্ছে বলে জাদুকর সৌম্য দেবের ধারণা । মানুষ এখন আর ব্যস্ততার সময় থেকে সময় চুরি করে টিকিট কেটে কোনও বড় ম্যাজিকের শো দেখতে যায় না । বরং তাঁর ফ্রি সময়ে মোবাইলের সঙ্গে কাটিয়ে নেয় । আর এই কারনেই বড় শোয়ের জনপ্রিয়তা কমেছে বলে সৌম্য দেবের ধারণা ।

ট্রিকস লিক হয়ে যাচ্ছে মোবাইলে

মোবাইল আসায় আরো একটি সর্বনাশ হয়েছে ম্যাজিক শিল্পের । তা হচ্ছে ম্যাজিকের বিভিন্ন ট্রিক মোবাইলের মাধ্যমে লিক হয়ে যাচ্ছে । সাধারণ মানুষ সেই ট্রিক জেনে ফেলছে, যার কারণে ম্যাজিকের থেকে মানুষের উৎসাহ হারাচ্ছে । কারণ ম্যাজিকের কৌশল জেনে ফেললেই সেই ম্যাজিক দেখার আর কোনও আনন্দ থাকে না । এক্ষেত্রে অবশ্য বেশকিছু ম্যাজিশিয়ানই দায়ী বলে দাবি করেছেন সৌম্য দেব ।

তাঁর দাবি, "বেশকিছু ব্যর্থ ম্যাজিশিয়ান আছেন, যাঁরা জীবনে কিছু করে উঠতে পারেননি, তাঁরাই এই ম্যাজিকের ট্রিকগুলোকে ভিডিয়ো বানিয়ে মোবাইলে প্রকাশ করে দিচ্ছে । যার ফলে সাধারণ মানুষের কাছে খুব সহজেই ম্যাজিক ট্রিক ধরা পড়ে যাচ্ছে । আর ম্যাজিকের কৌশল ধরা পড়ে গেলেই সেই ম্যাজিক দেখার কোনও উৎসাহ থাকে না মানুষের । কারণ মানুষ সেখানে আনন্দ পায় না । এটা এক প্রকার নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার মতো বিষয় । আর সেই কারণেই বিভিন্ন ম্যাজিশিয়ানকে নতুন নতুন ট্রিকস বের করতে হচ্ছে । প্রতিদিন আপডেট থাকতে হচ্ছে ।

ম্যাজিক থাকবেই

অন্য আর পাঁচটা প্রায়োগিক শিল্পের মতো ম্যাজিক শিল্পও আগামী দিনে থাকবে, এমনটাই দাবি জাদুকর সৌম্য দেবের । তবে আগে ম্যাজিশিয়ানদের সাধারণ মানুষ একটু অন্যরকম ভাবত । এখন ম্যাজিশিয়ানদেরও সাধারণ মানুষ ভাবা শুরু করেছে সবাই । ফলে ম্যাজিশিয়ানকেও সাধারণ মানুষ হিসেবেই ম্যাজিক শিল্পকে প্রতিষ্ঠা করতে হচ্ছে সবার সামনে । ম্যাজিক দেখানোর কৌশল পরিবর্তন হয়েছে । ম্যাজিকের ইন্সট্রুমেন্ট পরিবর্তন হয়েছে । ম্যাজিকের রূপ পরিবর্তন হয়েছে ।

সৌম্য দেবের কথায়, "ম্যাজিক থাকবেই । ম্যাজিক যতদিন আপডেট হতে থাকবে, ততদিন এই শিল্প বেঁচে থাকবে । মানুষ ম্যাজিক দেখে আনন্দ পান এবং ম্যাজিক উপভোগ করেন । তবে প্রয়োজন নতুন বুদ্ধিমত্তার, নতুন মেধার । যতদিন ভালো মেধা ম্যাজিক নিয়ে ভাববে, ততদিন ম্যাজিক শিল্প বেঁচে থাকবে ।"